ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০১৯, ৪ আষাঢ় ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

মাতৃমৃত্যু: কবে বন্ধ হবে এই অভিশাপ?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫ জানুয়ারি ২০১৯ শনিবার, ০৮:০১ এএম
মাতৃমৃত্যু: কবে বন্ধ হবে এই অভিশাপ?

একটি শিশু জন্মেই তার মায়ের মুখ দেখবে, তার বুকের মধ্যে তার শান্তির স্থান হবে। একটি নারীও যখন মা হবে, সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে তার সমস্ত যন্ত্রণাকে বিসর্জন দেবে। এটাই তো সৃষ্টিকর্তার অমূল্য উপহার হওয়ার কথা। কিন্তু যে মা সন্তানের মুখ না দেখেই মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে মারা যায় তার মতো দুর্ভাগ্য আর কারো হয়না। আবার যে শিশু জন্মের পর তার ছোট্ট মুঠোর মধ্যে তার মায়ের আঙুলগুলোকে ধরে দেখতে পারে না, সে শিশুও দুর্ভাগ্য নিয়েই জন্মে। সারাবিশ্বে এই মাতৃমৃত্যু একটি বড় সমস্যা। এর বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান নেওয়া অবশ্যই জরুরি। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞানুযায়ী, একজন নারী গর্ভাবস্থায়, প্রসবাবস্থায় কিংবা প্রসবোত্তর ৪২ দিনের মধ্যে শারীরিক জটিলতার কারণে মারা গেলে তাকে মাতৃমৃত্যু বলা হবে। জাতিসংঘের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী,  বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর ৩,০৩,০০০ নারী গর্ভধারণকালীন সময়ে, সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে বা পরবর্তী সময়ে শারীরিক জটিলতার কারণে মৃত্যুবরণ করেন। অর্থাৎ, প্রতিবছর ৮৩০ জন নারীর মাতৃমৃত্যু ঘটছে। গড়ে ২ মিনিটে একজন নারীকে করুণ পরিণতি মেনে নিতে হচ্ছে।

শুধু সামান্য প্রতিরোধেই মাতৃমৃত্যু ঠেকানো সম্ভব। নারীরা যদি গর্ভাবস্থা ও প্রসবাবস্থায় যথার্থ যত্ন ও সুচিকিৎসা পায়, তাহলে মৃত্যুঝুঁকি অর্ধেকের নীচে চলে আসে। মূলত খিঁচুনি ও প্রসব পরবর্তী অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলেই বেশিরভাগ নারীর মৃত্যু ঘটে। পাশাপাশি জন্ডিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ আর শ্বাসকষ্টের কারণেও অনেক নারীকে অকালে মৃত্যুবরণ করতে হয়।

কোথায় ঘটছে বেশি

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মাতৃমৃত্যুর হার বেশি। বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ মাত্রমৃত্যু ঘটছে সাব-সাহারান আফ্রিকায়। আর নাইজেরিয়া ও ভারতেই বিশ্বের বাকি এক-তৃতীয়াংশ মাতৃমৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। বিশ্বের সবচেয়ে কম উন্নত দেশগুলোতে গড়ে প্রতি এক লক্ষের মধ্যে ৪৩৬ জন মায়ের মৃত্যু হয়। উন্নত দেশগুলোতে প্রতি এক লক্ষে মাতৃমৃত্যুর পরিমাণ মাত্র ১২। বিশ্বব্যাংক সর্বশেষ ২০১৫ সালে পুরো বিশ্বব্যাপী মাতৃমৃত্যুর হার নিয়ে জরিপ করে। সেই জরিপ অনুযায়ী, সিয়েরা লিওনে মাতৃমৃত্যুর হার সর্বাধিক। সেখানে প্রতি এক লক্ষের মধ্যে ১ হাজার ৩৬০ জন নারীর মাতৃমৃত্যু হয়।

বাংলাদেশের অবস্থা

বর্তমানে বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর হার ১৯৬, অর্থাৎ এক লক্ষ জীবিত শিশুর জন্ম দিতে গিয়ে ১৯৬ জন মায়ের মৃত্যু হচ্ছে। এ দেশে প্রতিদিন প্রায় ১৬ জন নারী, অর্থাৎ বছরে ৫ থেকে ৬ হাজার নারীর মাতৃমৃত্যু ঘটছে। তবে আশার কথা হলো, এ দেশের নারীদের মাঝে সচেতনতা অনেক বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০০১ সালে যেখানে মাত্র ৯ শতাংশ নারী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সন্তান প্রসব করতেন, ২০১০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৩ শতাংশে। আর ২০১৬ সালে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৪৭ শতাংশে দাঁড়ায়।

মাতৃমৃত্যুর হার কমাতে গৃহীত পদক্ষেপ

বর্তমান বিশ্বে প্রতি বছরে ৩,০৩,০০০ জন নারী মাতৃমৃত্যুর শিকার হলেও ১৯৯০ সালে তা ছিল প্রায় ৫,৩২,০০০। প্রায় ২০ বছরে মাতৃমৃত্যুর হার ৪৪ শতাংশ কমেছে। কমলেও মৃত্যুর পরিমাণ তো একেবারে কম না।

১৯৭৫ সালে মেক্সিকোতে প্রথম নারী সম্মেলনে মুখ্য আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল মাতৃমৃত্যু। এর হার কমিয়ে আনার ব্যাপারে তাগিদ দেওয়া হয়। ১৯৯৪ সালে মিশরের কায়রোতে জনসংখ্যা ও উন্নয়ন বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশ্বের ১৭৯টি দেশের সরকার একযোগে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় যে যেভাবেই হোক মাতৃমৃত্যুর হার কমানো হবে। লক্ষ্য ছিল ১৯৯০ সালের তুলনায় বিশ্বব্যাপী মাতৃমৃত্যুর হার কমিয়ে ২০১৫ সালে অর্ধেকে নামিয়ে আনা। তার বাস্তব প্রতিফলন আমরা আজও দেখতে পাইনি।

কেন এই অবস্থা?

নারীদের মাঝে গর্ভকালীন সময়ে সঠিক ওষুধ গ্রহণ, নিজের যত্ন নেওয়া, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, প্রসবের জন্য উন্নত ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছিল। এখন আরও উচ্চতর ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন। সচেতনতা বৃদ্ধির মতো প্রাথমিক ধাপগুলো পার হওয়ার পরে এখন আরও বড় ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন। স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে, বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বাড়ানো। এখনও তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে মাতৃমৃত্যু হ্রাসের চাকা কেমন যেন থেমে গেছে।

কেন মৃত্যু ঘটছে নারীদের

এর পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। যেমন- দারিদ্র্য, অসাম্য আর যৌনবিদ্বেষ। সিংহভাগ নারীই মারা যান প্রত্যন্ত, পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলোতে। সেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা এখনো পৌঁছায়নি। প্রত্যন্ত অঞ্চলে নারীরা ঘরেই চিকিৎসা নেয়, অশিক্ষিত দাইয়ের হাতে সন্তান জন্ম দিতে গেলে তাদের মধ্যে অনেকেরই যে মৃত্যু ঘটে।

প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বিষয়টিও কাজ করে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেক দূরে একেকটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকে। প্রসূতি মায়েদের আশেপাশে স্বাস্থ্যকেন্দ্র না থাকার মতোই। হঠাৎ প্রসব বেদনা উঠলে বা অসুস্থ হলে দ্রুত তাদেরকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে উচ্চমূল্যের পরিবহন ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে খরচ মেটানোর আর্থিক সঙ্গতি তাদের থাকে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, গর্ভাবস্থায় একজন নারীকে অন্তত আটবার চিকিৎসকের কাছে শারীরিক পরীক্ষা করাতে হবে। এতে গর্ভবতী নারীর শরীরের অবস্থা জানার পাশাপাশি সন্তান জন্মদানের জটিলতাগুলো সম্পর্কেও ধারণা করা যায়। তাই সেগুলো প্রতিরোধ করাও সম্ভব হয়। কিন্তু এই বিষয়ে পরিবারের সচেতনতা না থাকার মতোই।

পুরুষতান্ত্রিকতার নেতিবাচক ভূমিকা

বিশ্বের অসংখ্য নারী এখনও নিজে থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। তারা কখন বিয়ে করবে বা কখন সন্তান জন্ম দিতে ইচ্ছুক। সমীক্ষা মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ১৫-৪৯ বছর বয়সী সন্তান জন্মদানে অনিচ্ছুক ২১ কোটি ৪০ লক্ষ নারী। তারা কোনো উন্নত জন্মনিরোধক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছে না। কারণ জন্মনিরোধক তাদের নাগালের বাইরে বা তাদের সঙ্গী ও প্রচলিত সমাজব্যবস্থা এগুলোর বিরোধী। এখনো অনেক দেশেই কেবল তখনই গর্ভপাতের অনুমতি দেওয়া হয়। আবার কিছু দেশে গর্ভপাত পুরোপুরি নিষিদ্ধ। গর্ভবতী নারী মারা গেলেও গর্ভপাতের অনুমতি তাকে দেওয়া হয়না।

তাই বলে গর্ভপাত বন্ধ নেই। যেই দেশগুলোতে বৈধভাবে গর্ভপাত করানো হয় না, করলেও সমাজের চোখে অপরাধ। তখন নারীরা না পেরেই অবৈধ ও অনিরাপদ উপায়ে গর্ভপাত করে ফেলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এভাবে অনিরাপদ উপায়ে গর্ভপাত করাতে প্রতি বছর ১৩ শতাংশ মাতৃমৃত্যু ঘটে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে কারা?

বয়ঃসন্ধিতে থাকা নারীদের মধ্যে মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী যত কিশোরীর মৃত্যু ঘটেছে, তার মূল কারণ মাতৃমৃত্যু। গর্ভাবস্থায় শারীরিক জটিলতা থেকে বা প্রসবকালীন সময়ে অতিরিক্ত রক্ষক্ষরণে আবার কখনো অনিরাপদ গর্ভপাত করাতে গিয়ে এই মৃত্যু ঘটে।

কিশোরী মায়েদের মৃত্যুর বড় কারণ উচ্চ রক্তচাপ ও অসহনীয় প্রসব বেদনা। তাদের শরীর সন্তান জন্মদানের মতো উপযুক্ত কাঠিন্যতা ও সহনশীলতা পায়না। গর্ভবতী কিশোরীদের অর্ধেকেরই গর্ভধারণ ঘটে একেবারেই অপরিকল্পিতভাবে। এর চেয়ে কম বয়সেও মেয়েরা মা হয়। ২০১৬ সালে গাটম্যাচার ইনস্টিটিউট এক হিসাব অনুযায়ী সেবছর ১০-১৪ বছর বয়সী কিশোরীদেরই ৭,৭৭,০০০ শিশুর জন্ম হয়।

বাল্যবিবাহ

কমবয়সী কিশোরীদের পেছনে মা হওয়ার মূল কারণ বাল্যবিবাহ। জাতিসংঘের সবগুলো দেশ একযোগে বাল্যবিবাহ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরেও প্রতিবছর ৭৩ লক্ষ অনূর্ধ্ব-১৮ কিশোরী মা হচ্ছে। আফ্রিকা মহাদেশে বাল্যবিবাহের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। সর্বাধিক বাল্যবিবাহের হার সমৃদ্ধ প্রথম ২০টি দেশের মধ্যে ১৮টি দেশই আফ্রিকার। এবার বলি বাংলাদেশের কথা। যেখানে সবচেয়ে কম বয়সে কিশোরীরা মা হওয়ার তালিকার দেশগুলোর মধ্যে তিন নম্বরে বাংলাদেশ।

এর ভবিষ্যত

সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যর্থ হওয়ার পরেও জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলো ২০১৫ সালে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অংশ হিসেবে মাতৃমৃত্যু হ্রাসের পক্ষে স্বাক্ষর প্রদান করে। বর্তমানে লক্ষ্য হলো, প্রতিটি দেশেই মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি এক লক্ষে ৭০ এর নীচে নামিয়ে আনা। এর লক্ষ্যে আমাদের সবাইকেই কাজ করতে হবে।