ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ মার্চ ২০১৯, ৬ চৈত্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

বিজয় পূর্ণতা পেল যেদিন

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০ জানুয়ারি ২০১৯ বৃহস্পতিবার, ০৮:০০ এএম
বিজয় পূর্ণতা পেল যেদিন

নয় মাসের সশস্ত্র ও রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশের। কিন্তু সেই বিজয় ছিল অসম্পূর্ণ। প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধুর দেশে ফিরে আসার মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতি বিজয়ের পূর্ণতা লাভ করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আর ৩০ লাখ মানুষের আত্মাহুতি ও ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম হারানোর বেদনার্ত ইতিহাস সবকিছুই যেন অসম্পূর্ণ ছিল বঙ্গবন্ধুকে ছাড়া। স্বাধীনতা এলেও বিজয়ের গৌরব উদযাপনে অপূর্ণতা থেকে গিয়েছিল অবিসংবাদিত এই নেতার অনুপস্থিতিতে। দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পান সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমান। ১০ জানুয়ারি অবিসংবাদিত এই নেতা জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন। সেই থেকে দিনটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে।

পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হয়। নিয়ে যাওয়া হয় তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে। সেখানে দীর্ঘ ১০ মাস বন্দী বঙ্গবন্ধু বেঁচে আছেন কি না তা নিয়েও সংশয় ছিলো বাঙালি জাতির মধ্যে। এই দীর্ঘ সময় যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও চিন্তাধারাকে লালন করেছিল, সেই সঙ্গে যারা তৎকালীন সময়ে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিরলস পরিশ্রম করেছিল তারাই ছিল প্রকৃত মুজিব সৈনিক। এক্ষেত্রে, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মোহাম্মদ মনসুর এবং কামারুজ্জামান এই চারটি নাম উজ্জ্বল নক্ষত্রসম। জাতির পিতার অবর্তমানে তাঁরা একটুও বঙ্গবন্ধুর আদর্শচ্যুত হননি। যুদ্ধপরবর্তী বিধ্বস্ত দেশের জনগণের জন্য তাদের এ ত্যাগ জাতি স্মরণ করে শ্রদ্ধাভরে। তৎকালীন সময়ে জাতীয় চার নেতার মতো একটা পক্ষ যেমন মুজিব আদর্শ ধারণ করে স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করেছে, অন্যদিকে খন্দকার মোশতাকের মতো আরেকটা পক্ষ নিজ স্বার্থ সিদ্ধির লক্ষ্যে গোপনে পাকিস্তানের সঙ্গে আঁতাত করেছে। কিন্তু ২৯০ দিন পাকিস্তানের কারাগারে আটক থাকার পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের পর এই দুই পক্ষই এক হয়ে গিয়েছিল। অতীত ভুলে মেনে নিয়েছিল শেখ মুজিবের নেতৃত্ব। বাংলাদেশ আর বঙ্গবন্ধু যেন একই সূত্রে গাঁথা। বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে কল্পনা করলেই বাংলাদেশ যেন এক বিভক্ত দেশ। ’৭৫ এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশ এই বিভক্ত দেশের রূপ পেয়েছে।

মাত্র সাড়ে ৩ বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ে সমাজ থেকে বৈষম্য দূরীকরণে শতভাগ সফল হয়েছিলেন জাতির পিতা। এতো স্বল্প সময়ে তিনি যা করে দেখিয়েছেন, তা আজ পর্যন্ত করতে পারেনি কেউ। বঙ্গবন্ধু যেন জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। বঙ্গবন্ধুকে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক বলার পিছনে কারণগুলো হলো:

১. বঙ্গবন্ধুই একমাত্র মানুষ যিনি পুরো বাঙালি জাতিকে এক করতে পেরেছিলেন। তাঁর ডাকে ’৬৬ সালে দল-মত নির্বিশেষে একীভূত হয়ে ৬ দফা আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল। তাঁর জনপ্রিয়তার প্রমাণটা পাওয়া গিয়েছিল ’৭০ এর নির্বাচনে।

২.  ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের জনসভার সেই কালজয়ী ভাষণে স্বাধীনতার বীজ বপন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। গুটিকয়েক কয়েকজন আলবদর, আল শামস, রাজাকার ছাড়া বাঙ্গালি জাতি জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধই হয়েছে শুধুমাত্র তাঁর ডাকে, তাঁর নামে।

৩. যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে দেশে লুটতরাজ, ডাকাতি বিরাজমান ছিল। যুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্র অনেকের কাছেই ছিল। পরে জাতির পিতার ডাকেই অস্ত্র জমা দিয়েছিল তারা। শুধুমাত্র সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার কারণেই তা সম্ভব হয়েছিল।

৪. যুদ্ধ শেষে দুর্ভিক্ষের যে আশঙ্কা করা হয়েছিল, বঙ্গবন্ধু তা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে মোকাবেলা করেন, গড়ে তুলেছিলেন সামরিক-বেসামরিক প্রশাসন। বাংলাদেশ সেই মুহূর্তে অল্প সময়ের মধ্যে শতাধিক রাষ্ট্রের কূটনৈতিক স্বীকৃতি লাভ করতে সক্ষম হয়। স্বাধীনতা লাভের তিন মাসের মধ্যেই বাংলার মাটি থেকে ভারতীয় সৈন্যদের প্রত্যাবর্তন বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্বের কারণেই সম্ভব হয়েছিল।

পোপ ছাড়া যেমন ভ্যাটিকান সিটি চলে না, ঠিক তেমনিই বঙ্গবন্ধু ছাড়া বাংলাদেশ অকল্পনীয়। ’৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর কাগজে কলমে দেশ স্বাধীন হলেও প্রকৃতপক্ষে ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর দেশে ফিরে আসার মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতির বিজয় পূর্ণতা লাভ করে। এই দিনটাকে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস হিসেবে দিনটা পালন করে বরং দিনটাকে খাটো করি আমরা। বাংলাদেশে আমরা অনেক ছোট-খাটো ধর্মীয় উপলক্ষের দিনগুলোতে সরকারি ছুটি পালন করি। কিন্তু ৭ মার্চ, ১০ জানুয়ারির মতো বাঙ্গালি জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে সমৃদ্ধ দিনগুলো উদযাপনে যেন কৃপণ আমরা। ১০ জানুয়ারি যদি বঙ্গবন্ধু দেশে না ফিরতেন তবে স্বাধীন বাংলাদেশে সংঘঠিত হতো আর একটি গৃহযুদ্ধ। বিশ্বের দরবারে আজ বাংলাদেশের যে অবস্থান তার সবই সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের জন্য। আমাদের বিজয়ের পূর্ণতার দিন হিসেবে এই দিনটাও যথাযথ সম্মান ও শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করা উচিৎ। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিবসটি বাঙালির বিজয় পূর্ণতার দিন হিসেবে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করা উচিৎ নয় কি?

বাংলা ইনসাইডার/বিকে