ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০১৯, ৪ আষাঢ় ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

পিতার স্বদেশে ফেরা

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০ জানুয়ারি ২০১৯ বৃহস্পতিবার, ০৮:০০ এএম
পিতার স্বদেশে ফেরা

আজ ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি ১৯৭২ সালের এদিন স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি তিনি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডন-দিল্লী হয়ে দেশে ফেরেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেশে ফেরার খবর বিভিন্ন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করা হয়। সেইসব আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর ঘটনার ক্রমানুসারে তুলে ধরা হল: 

‘জয়বাংলা’’ ধ্বনি আনলো শেখের মুক্তি

বাংলাদেশের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান (৮ জানুয়ারী) নাটকীয়ভাবে মুক্তিলাভ করেন এবং তাঁর জনগনের স্লোগান ‘জয়বাংলা’’ ধ্বনি উচ্চারণের মধ্য দিয়ে বিমানযোগে লন্ডন পৌছান। … সূত্র: The Sunday Times of Zambia, 9 January, 1972

মুজিবের মুক্তি

ব্রিটিশ ফরেন ও কমনওয়েলথ অফিসের একজন উর্ধতন কর্মকর্তা বিমানবন্দরে ভিআইপি লাউঞ্জে তার সাক্ষাৎ করেন। সূত্র: Sunday Mail, Malaysia, 9 Januaray,1972

লন্ডনে মুজিব

শেখ মুজিবুর রহমান আজ (৮ জানুয়ারী) বাংলাদেশকে ‘‘এক অপ্রতিদ্বন্ধী বাস্তবতা’’ রুপে ঘোষণা করেছেন এবং বিশ্ব-স্বীকৃতি ও জাতিসংঘে তার দেশের আন্তর্ভুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন।

লন্ডনে পৌছে শেখ মুজিব এক সংবাদ- সম্মেলনে বলেন যে, পাকিস্তানের কারাগারে থাকাকালে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য তাঁকে সেলে রাখা হয়। সূত্র: AP, ReUter Despatch datelined London, 8 January 1972


ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শেখ মুজিবের বৈঠক

গতরাতে (৮ জানুয়ারী) ১০, ডাউনিং স্ট্রিটে মি.হীথ – এর সঙ্গে এক ঘন্টাব্যাপী বৈঠকে শেখ মুজিব বাংলাদেশকে এক সার্বভৌম শক্তি হিসাবে ব্রিটেনের স্বীকৃতিদানের প্রশ্নটি উথাপন করেন।… সূত্র: James Margach, The Sunday Times, London 9, 1972

সংবর্ধনা যা দিল্লীর স্মৃতিতে ভাস্বর হয়ে থাকবে

বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা ফেরার পথে আজ (১০ জানুয়ারি) রাজধানীতে (নয়াদিল্লী) এসে পৌছূলে তাঁকে প্রানঢালা সংবর্ধনা জানানো হয়।

রাজকীয় বিমান বাহিনীর বিমানযোগে এখানে (নয়াদিল্লী) এসে পৌছানোর পর যখন তিনি বিমান থেকে অবতরণ করেছিলেন তখন‘‘শেখ মুজিবুর রহমান জিন্দাবাদ’’ ও ‘‘মুজিব দীর্ঘজীবি হোন’’ উচ্চ:স্বরে ধ্বনি দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানানো হয়। সূত্র: Express, New Delhi, 11 January, 1972

নয়াদিল্লীর জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ

শেখ মুজিবুর রহমান বিশাল জনতার উদ্দেম্যে আবেগজড়িত কন্ঠে বলেন,‘‘বাংলাদেশ ও তার জনগন আপনাদের প্রধানমন্ত্রী , সরকার, সশস্ত্র বাহিনীর বীর সদস্যবৃন্দ এবং আপনাদের সাধারণ মানুষকে কোনো দিনই ভুলতে পারবে না। বঙ্গবন্ধু বাংলায় বলেন যে পাকিস্তানিরা বাংলাদেশে যে নৃশংস ও বর্বরোচিত কাজ করেছে মানব ইতিহাসে এমনটি আর কখনও ঘটেনি। - (১০ জানুয়ারী, ১৯৭২)

বহু কূটিনীতিকের সমর্থন জ্ঞাপন উপস্থিতি

২০টিরও অধিক দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধিবৃন্দ – যাদের অধিকাংশই রাষ্ট্রদূত -বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন। সবচেয়ে বেশি প্রতিনিধি ছিলেন সোভিয়েট ব্লকের। ব্রিটেন , ফ্রান্স , বেলজিয়াম, ইটালি, পশ্চিম জার্মানি, নরওয়ে এবং ডেনমার্কের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। 

উন্মত্ত ঢাকা-শেখ মুজিবকে অভিনন্দন জানানোর জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল

শেখ মুজিবুর রহমান নয় মাসের বন্দিদশা শেষে আজ তাঁর জনগনের কাছে ফিরে এলেন। নৃত্যরত ও হর্ষোৎফুল্ল মানুষের এক অন্তহীন ঢল এক অভূতপূর্ব অভ্যার্থনার মাধ্যমে তাকে বরণ কলো, আর পাকিস্তানের সঙ্গে চিরতরে সম্পর্ক ছিন্ন করার কেথা ঘোষণা করে তিনি অবিলম্বে করলেন স্বাধীনতার প্রতি তাঁর অকুন্ঠ সমর্থন জ্ঞাপন। বৃহৎ শুভ্র রাজকয়ি বিমান বাহিনীর জেট বিমান যে -মুহূর্তে এসে অবতরণ করলো সেই মুহূর্ত থেকে বিমানের দরজা হতে সারা পথ উদ্বেলিত জনতা তাকে ঘিরে ধরে এবং এমন কি যখন তাকে কূটনীতিকবৃন্দের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছিল তখনও একই অবস্থা বিরাজ করেছিল।– (ঢাকা ,১০ জানুয়ারি)  

মুজিব পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলেন

ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে অশ্রুসজল চোখে শেখ মুজিবুর রহমান দশ লক্ষ বাঙালিকে বলেন যে তাঁর নবরাষ্ট্র বাংলাদেশ এখন স্বাধীন এবং ‘‘চিরকাল’’ স্বাধীন থাকবে।

তিনি বলেন, নিজেদের একটি জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য পৃথিবীর ইতিহাসে কোথাও কখনও এত লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ বিসর্জন দেয়নি। সকল দেশের উচিত হবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদান করা এবং জাতিসংঘে এর অন্তর্ভূক্তি নিশ্চিত করা।

রুমাল দিয়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি পাকিস্তানকে সম্বোধন করে বলেন:‘‘তোমরা আমার লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছো, মা-বোনদের ইজ্জত লুন্ঠন করেছো, অসংখ্য বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছো এবং আমার এক কোটি মানুষকে তাড়িয়ে দিয়ে ভারতে যেতে বাধ্য করেছো। এরপরেও তোমাদের প্রতি আমি কোনরুপ বিদ্বেষ পোষণ করি না। তোমরা থাকো তোমাদের স্বাধীনতা নিয়ে, আর আমরা থাকি আমাদের স্বাধীনতা নিয়ে।’’

আবেগঘন পুনর্মিলনের দৃশ্য

জনসভা শেষে তাঁর শহরের বাড়িতে শেখ সাহেব ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এক আবেগঘন পুনর্মিলনের দৃশ্য লক্ষ্য করা গেল। বন্ধু বান্ধবরা যখন তাঁর ওপর ফুলের পাপড়ি বর্ষণে ব্যস্ত তখন তিনি তাঁর দুই কন্যাকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরেন।

এরপর তিনি তাঁর ৯০- বছর বয়স্ক পিতার সামনে হাঁটু গেড়ে বসেন এবং তাঁকে কদমবুচি করেন। আর ৮০ বছর বয়স্কা মা এসে ঘরে ঢুকলে তিনি তাঁকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।- (ঢাকা ,১০ জানুয়ারি)       


সূত্র: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: জীবন ও রাজনীতি  

বাংলা ইনসাইডার