ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০১৯, ৪ আষাঢ় ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

‘‘আমি মৃত্যুর জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম’’

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০ জানুয়ারি ২০১৯ বৃহস্পতিবার, ০৮:০০ এএম
‘‘আমি মৃত্যুর জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম’’

২৫ মার্চ, ১৯৭১-এর মধ্য রাত থেকে পরের বছরের ৮ জানুয়ারি। নয় মাসের বন্দী জীবন শেষে বঙ্গবন্ধু মুক্তি লাভ করেন ৮ জানুয়ারি ১৯৭২। সেদিনই তিনি পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের (পিআইএ) বিশেষ ফ্লাইট ৬৩৫-এ লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে পৌঁছেন। সেইদিন লন্ডনের হোটেল ক্যারিজেসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথম সংবাদ সম্মেলন করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেদিনের সেই সংবাদ সম্মেলনে শুধু ব্রিটিশ নয়, বিশ্বের বেশ কয়েকজন খ্যাতনামা সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। আধা ঘণ্টার কিছু কম সময়ের ওই সংবাদ সম্মেলনের আগমুহূর্তে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে চুরুটে আগুন ধরিয়ে নেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এরপর ২ মিনিটের লিখিত বক্তব্য শেষ করে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি। সেই সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া বক্তব্যের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো:

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রথমেই যেসব প্রশ্ন করা হয়েছিল তার অন্যতম হলো: ‘‘ঢাকায় না গিয়ে আপনি লন্ডনে এলেন কেন?’’

শেখ সাহেব উত্তর দিলেন : ‘‘আমি তো বন্দি ছিলাম। এটি ছিল পাকিস্তান সরকারের ইচ্ছা, আমার নয়।’’

শেখ সাহেব বলেন, তিনি কতক্ষণ এখানে অবস্থান করবেন তা স্থির করা হয়নি, তবে লন্ডন ত্যাগের আগে তিনি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হীথ- এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার আশা রাখেন।

পরে কর্মকর্তারা ঘোষণা করেন যে শেখ মুজিব সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী হীথ- এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।

শেখ সাহেব সাংবাদিকদের জানান যে, জনাব ভুট্টো তাঁকে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়টি বিবেচনা করতে বলেছেন। তিনি বলেন,‘‘আমি তাকে বলেছি যে আমার জনগনের কাছে ফিরে না- যাওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না।’’

সাংবাদিকদের নিকট শেখ মুজিবকে ‘আমাদের প্রিয় নেতা, ‘‘একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বাধীন জনগনের স্বাধীন প্রেসিডেন্ট’’ রূপে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। 

কালো রঙের আজানুলম্বিত আঁটসাঁট কোট পরিহিত শেখ সাহেব তৎক্ষনাৎ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ‘আত্মোৎসর্গকারী লক্ষ লক্ষ শহীদের পবিত্র স্মৃতির’’ প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

শেখ মুজিব বলেন, পাকিস্তানি সেনাদল- যারা বাংলাদেশের আকঙ্খাকে অবদমিত করে রাখার প্রয়াস পেয়েছিলো- ‘‘নৃশংস হত্যাকাণ্ডের’’ দায়ে দোষী। তিনি আর বলেন,‘‘ আজ হিটলার বেঁচে থাকতেন, তিনিও লজ্জা পেতেন।’’

শেখ মুজিব জনাব ভুট্টোর সরাসরি সমালোচনায় অবতীর্ণ হননি। তিনি বলেন,‘আমি তার সৌভাগ্য কামনা করি।’’

শেখ সাহেব ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন , পোলাণ্ড, গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং ‘‘যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা প্রিয় জনগনসহ সারা বিশ্বের স্বাধীনতা প্রিয় জনগনের’’ প্রতি তার শুভেচ্ছা ব্যক্ত করেন।

বাংলাদেশকে বিশ্বের স্বীকৃতিদানের আহ্বান জানিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন,‘আমার লক্ষ লক্ষ বুভুক্ষ মানুষকে সাহায্য করার জন্য আমি বিশ্বের সকল নাগরিকের প্রতি আবেদন জানাচ্ছি।’’

শেখ মুজিবকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল বন্দিদশা অবস্থায় তাকে শারীরিক নির্যাতন কিংবা তার প্রতি দুর্ব্যাবহার করা হয়েছিল কি না।

উত্তরে তিনি বলেন যে একটি পরিত্যক্ত কারাগারের নির্জন সেলে তাকে বন্দী করে রাখা হয়েছিল যেখানে তার নিকট কোন কোন দর্শনার্থীকে আসতে কিংবা কোনো চিঠিপত্র প্রদান করতে দেওয়া হয়নি এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাকে কোনো রকম যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি।…

তিনি বলেন যে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ তখন তার আত্নপক্ষ সমর্থনের জন্য একজন কৌসুলি নিয়োগ করে। তিনি বলেন,‘‘এটি ছিল একজন অসামরিক ব্যক্তিকে কোর্ট  মার্শাল করা। তারা চেয়েছিল আমাকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলাতে।’

তিনি বলেন, যে সাবেক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দিয়েছিলো সেই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সরকারের স্থলাভিষিক্ত ভুট্টো-প্রশাসন দণ্ডাদেশ কার্যকর করতে অস্বীকৃতি জানায়।…

তিনি সাংবাদিকদের জানান যে প্রহসনমূলক বিচারের পর ‘‘আমি মৃত্যুর জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম।’’

তিনি বলেন, ‘‘যেদিন আমাকে জেলে নেওয়া হয় সেদিন আমি জানতাম না আমাকে বাঁচিয়ে রাখা হবে, নাকি মেরে ফেলা হবে। কিন্তু আমি এটুক জানতাম যে বাংলাদেশ একদিন স্বাধীন হবেই।’’

শেখ সাহেবকে প্রশ্ন করা হয়, ‘ভারতের সঙ্গে সংঘর্ষ চলাকালে পাকিস্তানের প্রতি ওয়াশিংটনের সমর্থনের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাঁর মনোভঙ্গি কি হবে।’

শেখ সাহেব কৌশলে প্রশ্নটি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, ‘আমি জেলে ছিলাম এবং অনেক কিছুই আমি এখনও জানতে পারিনি। ঢাকায় গিয়ে আমার লোকজনের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করতে হবে আমাকে।’…

শেখ সাহেবের পুরনো পরিচিতজনেরা বলেন যে তাঁকে আগে যেমন তাঁরা দেখেছেন এখন তাঁকে অপেক্ষাকৃত কৃশ বা পাতলা দেখাচ্ছে, তবে অগ্নিপরীক্ষার পরেও তিনি প্রাণবন্ত রয়েছেন।

তিনি সংবাদ-সম্মেলন শেষ করেন এই বলে যে রাওয়ালপিণ্ডি থেকে বিমানযাত্রা করে এসে তিনি বড় ক্লান্ত। এরপর তিনি বিজয়দৃপ্ত কণ্ঠে বলে ওঠেন ‘জয় বাংলা’।

হোটেলের বাইরে প্রতি মুহূর্তে তাঁর সমর্থকদের ভিড় বাড়ছিল, তাঁরা আনন্দে পরস্পরকে আলিঙ্গন করছিলো এবং উচ্চকণ্ঠে ঐ একই জয়ধ্বনি দিচ্ছিল।

রয়টার জানায় : শেখ সাহেব ঘোষণা করেন : ‘আমার জনগণের মাঝে ফিরে যাওয়ার জন্য আমি এখানে এক মুহূর্তও অপেক্ষা করতে পারবো না।’

আবেগজড়িত কণ্ঠে শেখ মুজিব সাংবাদিকদের বলেন : ‘বাংলাদেশের জনগণ জীবনদান ও দুঃখ-যন্ত্রণা সহ্য করে যে-চরম মূল্য দিয়েছে আর কোথাও তার নজির নেই।’

তিনি ২০ মিনিট দেরি করে সংবাদ-সম্মেলনে পৌঁছান এবং ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি দিয়ে সাংবাদিকদের অভিনন্দন জানান।

তিনি বলেন, ‘একটি মুক্তিসংগ্রামের পর স্বাধীনতার যে- অসীম আনন্দ আজ আমি তা উদযাপন করছি।’

বাংলাদেশ মিশনের কর্মকর্তারা এই মর্মে ইঙ্গিত দেন যে ঢাকায় ফেরার আগে শেখ সাহেবের কিছুটা অবকাশ প্রয়োজন বলে মনে হয়। তাঁরা বলেন, তাঁকে দেখার জন্য দশ লাখের মতো লোক বিমানবন্দরে আসবে। বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধু আরও বলেন : ‘পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণ যেমনটি ব্যবহার করেছে তা সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে আমার বলার কিছু নেই। যখন তারা আমাকে গ্রেপ্তার করে তখন তারা আমার সন্তানদেরও গ্রেপ্তার করে ও অন্তরীন করে রাখে এবং আমার বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়।

তিনি বলেন, ‘‘শত শত বছর ধরে বাংলাদেশকে শোষণ করা হয়েছে এবং এজন্য ব্রিটেন কিছুটা দায়ী, যদিও ব্রিটিশ সরকার তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সব সময়ই ভাল ব্যবহার করে এসেছে। বাংলাদেশের কর্মকর্তারা জানান যে শেখ মুজিবের ওজন প্রায় ৪২ পাউন্ড (১৯ কেজি) হ্রাস পেয়েছে বলে মনে হয়।’’

বাংলাদেশ সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা, বীমা ও বৈদেশিক বাণিজ্য রাষ্ট্রীয়করণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে যে খবর পাওয়া গেছে সে-প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে শেখ মুজিব বলেন, ‘‘এ জাতীয় ব্যবস্থাগ্রহণের কোথা ঐ-আওয়ামী লীগের ম্যানিফেস্টোতেই নিহিত রয়েছে যে-আওয়ামী লীগ ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের নির্বাচনে জয়লাভ করে।‘’

তিনি আরও বলেন, ‘‘বাংলাদেশে তাঁর সহকর্মীরা যা করছেন সে-বিষয়ে তাঁর গভীর আস্থা রয়েছে।‘’

শেখ মুজিব বলেন, ‘‘আমি আর কোনো যুদ্ধে আমার স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে পারব না। যে-কারও সঙ্গে আমি সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।‘…

… কিন্তু এখন যেহেতু আমার জনগণ স্বাধীনতা পেয়েছে সেহেতু পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের বিরুদ্ধে আমার বলার কিছু নেই। আমি জনাব ভুট্টোর সাফল্য ও সৌভাগ্য কামনা করি।’


সূত্র: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান: জীবন ও রাজনীতি (দ্বিতীয় খন্ড), পৃষ্টা: ৫৫৬ থেকে ৫৫৯।  

বাংলা ইনসাইডার