ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ মার্চ ২০১৯, ৫ চৈত্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

আলোর বিচ্ছুরণ ছড়াতে নাভিশ্বাস ছাপাখানায়

মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ
প্রকাশিত: ১২ জানুয়ারি ২০১৯ শনিবার, ০৫:১৪ পিএম
আলোর বিচ্ছুরণ ছড়াতে নাভিশ্বাস ছাপাখানায়

আলো আধারির মধ্য দিয়ে ছোট ছোট হাঁটার পথ। খটখট করা বিকট শব্দ। নাকে লাগে নানা রঙের মিশেলে তীর্যক কটু গন্ধ। হাঁটতেই একটু পর পর হোঁচট খাওয়ার অবস্থায় পড়তে হয়। পরক্ষণেই সামলে নিয়ে এগিয়ে গেলেই পলেস্তরা খসে পড়া কংক্রিটের ছোট বড় কক্ষে চলছে মহাযজ্ঞ। বিরামহীনভাবে চলছে ইলেকট্রনিক কিছু মেশিন। এখানে কাজ করছে একটু রোগা পাতলা ধরনের মানুষ। রাতের পর রাত দিনের পর দিন চলছে তাদের এই যজ্ঞ। এটার নাম ছাপাখানা। বই থেকে শুরু করে সকল প্রকার ছাপার কাজই এই স্থানগুলো থেকে করা হয়। রাজধানীর বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গনে প্রতি বছরের ন্যায় আগামী মাসেই শুরু হচ্ছে (ফেব্রুয়ারি) অমর একুশে গ্রন্থমেলা। এই মেলায় এবারও প্রকাশিত হচ্ছে নতুন পুরাতন হাজারও লেখকের অনবদ্য সৃষ্টি। এই বই প্রকাশের জন্যই ব্যস্ততায় সময় পার করছে রাজধানীর প্রেসগুলো।

রাজধানীর বাংলাবাজার ও ফকিরাপুলের বিভিন্ন প্রেসে ঘুরে অসম্ভব রকমের ব্যস্ততা চোখে পড়ে। সাদা সাদা কাগজ কালির আঁচড়ে জীবন্ত হয়ে ওঠে এখানে। বাংলাবাজারের বিভিন্ন গলিতে সারি সারি ছাপাখানা ও প্রকাশনীর কার্যালয়। বেশ খানিকটা সময় ঘুরে ফিরে দেখা যায় ছাপাখানা ও প্রকাশন প্রতিষ্ঠানের ব্যস্ততা। প্রথমেরই কথা হয় পূর্বদেশ পাবলিকেশন্সের ব্যবস্থাপক মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে। যদিও তার প্রতিষ্ঠান বইমেলাকেন্দ্রীক কোন বই প্রকাশ করে না তারপরও তার সাহায্যে বিভিন্ন প্রকাশনী ও ছাপাখানায় ঘুরে আসন্ন বইমেলায় বই প্রকাশের কাজ দেখা যায়। বাংলাবাজারের শিরি দাস ও প্যারী দাস লেনে রয়েছে ঐতিহ্য ও ধ্রুবপদ প্রকাশনীর মত অসংখ্য প্রকাশনী।

ঐতিহ্য প্রকাশনীতে গিয়ে জানা যায়, এখন ধুমছে কাজ চলছে। কোন কোন বই ছাপিয়ে বাঁধাইয়ের কাজ চলছে। আবার কোনটার এখনও চলছে বানান সংশোধনীর (প্রুফ রিডিং) কাজ। ঐতিহ্য প্রকাশনীর কার্যালয়ে বসে বসে বানান সংশোধনীর কাজ করছিলেন সুরুজজ্জামান। এ প্রকাশনী এবার অনেকটি নতুন বই প্রকাশ করছে। তবে এখানে নতুন লেখকদের বই প্রকাশের সংখ্যা তেমন একটা নেই। বই ছাপার কাজ কতটুকু হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখনও চলছে। চলবে ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত।’ কিন্তু বইমেলা তো ঘনিয়ে আসল তাহলে এখনও এত দেরী কেন এমনটি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দেরী কোথায়। এমনটিই তো প্রতি বছর হয়। তবে এখন কাজ চলছে। বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় এখন কাজের চাপ বেশী। সৃজনশীল বই প্রকাশের জন্য যে প্রকাশনীগুলো কাজ করছে সে প্রকাশনীগুলো বছরের এই সময়েই বেশি ব্যস্ত থাকে।’ এই প্রকাশনীর নিজস্ব কোন ছাপাখানা নেই। প্রায় সত্তর শতাংশ প্রকাশনীরই নিজস্ব ছাপাখানা নেই বলে জানান এই কর্মকর্তা।

পাশেই ধ্রুব প্রকাশনীতে গেলে প্রথমে এই প্রকাশনীর সত্ত্বাধীকারীর দেখা না মিললেও একটু অপেক্ষা করতেই তার দেখা পাওয়া যায়। বিস্তারিত কথা হয় এ প্রকাশনীর সত্ত্বাধীকারী আবুল বাসার ফিরোজের সঙ্গে। মূলত এখন বই প্রকাশের তাড়ায় আছেন এ প্রকাশক। তবে পুরাতন ও প্রসিদ্ধ লেখকের সংখ্যাই বেশি এ তালিকায়। নতুন লেখকদের বই প্রকাশ করছেন তবে তা একটু কম। প্রায় দুই ডজন বই প্রকাশ করছেন তিনি। বই ছাপার কাজ চলছে, ব্যস্ততা আছে। তবে এ ব্যস্ততা নাকি আরও বাড়বে কয়েক দিনের মধ্যেই। কেননা এখনও অনেক বইয়ের বানান সংশোধনীর কাজ এখনও শেষ হয়নি। ছাপাখানার কাজ দেখতে চাইলে তিনি নিজেই এ প্রতিবেদককে ছাপাখানায় নিযে যান। চলতি পথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হয় প্রায় এক যুগ ধরে প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত এ প্রকাশক। নতুন লেখকের বই কম কেন, আপনারা কী নিচ্ছেন না নাকি নতুন লেখক বই নিয়ে প্রকাশকদের কাছে আসছেন না এমনটি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা নতুন লেখকদের বই অন্যান্য প্রকাশনীর চেয়ে বেশিই প্রকাশ করি। তবে আমাদের তো মানও যাচাই করতে হয়।’ নতুন লেখকদের বই প্রকাশের ক্ষেত্রে অর্থায়ন প্রকাশনী করে নাকি লেখক নিজে জানতে চাইলে তিনি জানান, এ পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যে যত লেখকই ছিলেন না কেন তারা সবাই কিন্তু নিজেদের অর্থায়নে বই প্রকাশ করেছেন। কেননা বই প্রকাশের ক্ষেত্রে অর্থায়ন করে প্রকাশক ঝুঁকি নিতে চান না। তারপরও আমরা উৎসাহ দেওয়ার জন্য নতুন লেখকদের বই প্রকাশনীর অর্থায়নে প্রকাশ করে থাকি কিন্তু সেটা বেশি পারা যায় না। এর মধ্যেই ছাপাখানায় পৌঁছুলে চোখে পড়ে ছাপাখানার কর্মীদের ব্যস্ততা। এই শীতের মধ্যেও ছাপা মেশিনের পরিশ্রমের কারণে তারা সকলেই ঘর্মাক্ত। বিশাল এই ছাপাখানার শুরুর দিকটায় চলছে কাগজ কাটাকুটির কাজ এবং পিছনে অনাবরতভাবে চলছে ছাপার কাজ। পাশের আরও একটি দালানে বাঁধাইয়ের কাজ চলছে। ছাপা কাগজ সেলাই শেষে আঠা দিয়ে মলাটে মুড়িয়ে নিয়ে কর্মীরা বাস্তব বইয়ে রূপান্তর করছেন। খুবই দ্রুত কাজ করতে হয় এখানের সকলেরই। তাদের কাজের আটসাঁট অবস্থা দেখলে মনে হয় তারা যেন পুরো পৃথিবীর পুস্তকগুলোকেই মলাটবন্ধি করেছেন।

ছাপাখানায় এত বইয়ের কাজ হয় তাহলে কি আগের তুলনায় পাঠক বেড়েছে বলতেই হবে তবে মানসম্মত পাঠক বেড়েছে কিনা এটাই প্রশ্নের বিষয়। বেশির ভাগ প্রকাশকই জানান, মানসম্মত পাঠক বাড়েনি সেক্ষেত্রে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে। কেননা পাঠকদের বিশাল একটি অংশই হলো তরুণ। তাদের সাহিত্যের রুচিবোধ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে গড়ে উঠে থাকে। সাহিত্যের পাঠকরা যদি নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমসহ বিখ্যাত সাহিত্যিকদের সাহিত্য না জানেন তাহলে সাহিত্য চর্চা কখনওই স্থায়িত্ব পাবে না। এ জন্য সরকারসহ সংশ্লিষ্টদেরই উদ্যোগ নিতে হবে।

একুশে বইমেলা শুরু হতে বাকি মাত্র কয়েকটা দিন। রাজধানীর ছোট-বড় সব প্রকাশক থেকে শুরু করে মুদ্রণ, বাঁধাই, পরিবহনসহ এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক মানুষ প্রচণ্ড ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। বইমেলা উপলক্ষে ছাপাখানার কাজ গত বছরের নভেম্বর থেকেই শুরু হয়েছে। বইমেলার সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে কাজের চাপও। রাজধানীর বাংলাবাজার, সেগুনবাগিচা, তোপখানা রোড, ফকিরাপুল, পুরানা পল্টন ও নয়াপল্টন, নীলক্ষেত ও কাঁটাবনে বইমেলার কাজ চলছে।

দিন যত গড়িয়ে যায় ছাপাখানার উত্তাপও ততটা তেঁতে উঠে। ফুরসত নেই এতটুকু সময় বিশ্রাম নেওয়ার। সৃজনশীল (সাহিত্য) বই ছাপানোর কাজ বছর জুড়ে কম থাকায় মূলত সব প্রকাশনী প্রতিষ্ঠান এ কাজ করে না। তারপরও হাতের কাছে বইমেলা আসলে তাদের ব্যস্ততা বাড়ে। নিজেদের ছাপাখানা থাকার পরও নির্ভর করতে হয় অন্য ছাপাখানার উপর।

বাংলা ইনসাইডার/এমএস