ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ৭ ফাল্গুন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

একুশের স্মৃতি: ভাষা সৈনিক গাজীউল হক

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ শুক্রবার, ০৮:০৯ এএম
একুশের স্মৃতি: ভাষা সৈনিক গাজীউল হক

আন্দোলন ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে বাংলা বাষা প্রতিষ্ঠা বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি স্মরণীয় ও গৌরবোজ্জল ঘটনা। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত দিন। এদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হয়েছে কয়েকজন তাজা তরুণের বুকের রক্তে। তারাই জীবন দিয়ে মাতৃভাষাকে প্রতিষ্ঠা করেছে। আর ভাষা আন্দোলন সফল করেছেন ছাত্র, শিক্ষক, সাংবাদিক , রাজনীতিক, পেশাজীবীসহ আপামর বাঙালি জনতা। আমরা জানি,‘ ৫২ সালে ভাষার চূড়ান্ত আন্দোলন হলেও, এর সূত্রপাত ঘটেছিল ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পরপরই। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলা ভাষাভাাষী তৎকালীন পূর্ব বাংলার বাঙালিদের পাশ কাটিয়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাঙালিরা প্রতিবাদমুখর হয়। শুরু হয় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন। পাকিস্তানের শাসক মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের ২১ ও ২৪ মার্চ ঢাকায় দুটি সভায় উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলে বাঙালিরা এর প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। ধীরে ধীরে প্রতিবাদ চূড়ান্ত আন্দোলনে রুপ নেয়। এই আন্দোলন দানা বাঁধে ঢাকাসহ সারা পূর্ববাংলায়। পাকিস্তানি শাসকরা ঢাকাসহ পূর্ব বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে আন্দোলনরত ভাষাকর্মীদের ওপর অত্যাচার, গ্রেফতার, জেল- জুলুম ও নির্যাতন চালায়। কিন্তু ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ দাবিতে ঢাকার রাজপথ মুখর হয়ে ওঠে। এসময় ‘তমদ্দুন মজলিস’ ও ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের উদ্যোগে গঠিত ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে বেগবান করতে প্রধানতম ভূমিকা পালন করে। সরকারি পুলিশ ও মুসলিম লীগের গুণ্ডাবাহিনীর আক্রমণ, নির্যাতন, অত্যাচার, গ্রেফতার উপেক্ষা করে ভাষাকর্মীরা তীব্র আন্দোলনের দিকে এগিয়ে যায়। অসংখ্য ভাষাকর্মী ও নেতাকে গ্রেফতার ও জেলে পাঠিয়েও আন্দোলন দমন করতে পারেনি বাংলা  

ভাষার ওপর আঘাতকারী পাকিস্তানি সরকার ও পূর্ববাংলার দোসররা। দীর্ঘ কয়েক বছর আন্দোলনের শিখা জ্বালিয়ে রেখে অবশেষে ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখ বাঙালি জাতি তাদের কাঙ্ক্ষিত প্রথম ন্যায্য দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে বাংলা ভাষাকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করে। এই প্রতিষ্ঠার প্রাণ- শহীদ সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার, সফিউরসহ থোকা থোকা কতগুলো নাম।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ও ভাষাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠা ছিল প্রকৃতপক্ষে বাঙালি জাতির মুক্তি ও স্বাধীনতার প্রথম সোপান। তার পরের ধাপগুলো ছিল ’৫৪-র যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ’৫৬-র সামরিক শাসন প্রবর্তন,’৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-র ৬-দফা আন্দোলন, ’৬৯-র গণ অভ্যুত্থান, ’৭০-র নির্বাচন এবং ’৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধ। নয় মাসের দীর্ঘ যুদ্ধ শেষে কয়েক লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে বাঙালি চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করে, যার নাম বিজয় ও স্বাধীনতা।

আমরা বাঙালিরা আজ বাংলা ভাষায় কথা বলি। আমরা বাঙালিরা আজ স্বাধীন ও সার্বভৌম। আমাদের অর্জন আরও আছে-১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদা পেয়েছে। ২১ ফেব্রুয়ারি এখন বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস। এটি অবশ্যই আমাদের জাতির জন্য আনন্দ ও গৌরবের।

ভাষা আন্দোলন, ভাষা প্রতিষ্ঠা ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে অনেক গ্রন্থ। কিন্তু ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কোন পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম এখনও প্রকাশিত হয়নি। আমি জেনে খুশি, আনন্দিত ও গৌরবান্বিত যে, ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের সর্বত্র ভাষা আন্দোলন ও আন্দোলন-উত্তর ঘটনাবলি, প্রামাণিক দলিল, কার্টুর, কবিতা, গান ও অন্যান্য তথ্যসহ ভাষাকর্মীদের সমাবেশ ঘটিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম প্রকাশিত হচ্ছে। এই মহতী উদ্যোগ ও ঐতিহাসিক কাজটিকে আমি অভিনন্দিত করছি, সাধুবাদ জানাচ্ছি এবং সাফল্য কামনা করছি। এই ঐতিহাসিক ও গৌরবান্বিত কাজটি যারা পরিশ্রমের সঙ্গে, নিষ্ঠার সঙ্গে করছেন তারা নিজেদেরকে ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করলেন বলে আমার বিশ্বাস।

লেখাটি সি এম তারেক রেজার  ‘একুশ: ভাষা আন্দোলনের সচিত্র ইতিহাস (১৯৪৭-১৯৫৬)’ বই থেকে সংকলিত হয়েছে।

(গাজীউল হক একজন ভাষা সৈনিক। তিনি ১৯২৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া থানার নিচিন্তা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মওলানা সিরাজুল হক ছিলেন কংগ্রেস ও খেলাফত আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী। মায়ের নাম নূরজাহান বেগম। গাজীউল হক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কাজী মোতাহার হোসেনের মত বিখ্যাত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে এসে ভাষা আন্দোলনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নেন। আপোষহীন এই ভাষাযোদ্ধা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে জীবদ্দশায় বহুবার কারাবরণ করেন। ভাষা সৈনিক ছাড়াও গাজীউল হক সাহিত্যিক ও গীতিকার হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। মহান এই ভাষা সৈনিক ২০০৯ সালের ১৭ জুন বিকেলে রাজধানী ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।)

বাংলা ইনসাইডার