ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ৭ ফাল্গুন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

আমরাই পারি

অধ্যাপক ডা: কামরুজ্জামান চৌধুরী
প্রকাশিত: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সোমবার, ০৮:০৪ এএম
আমরাই পারি

ক্যান্সার, একটি অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধিজনিত রোগ, যা শরীরের অন্যান্য অংশের উপর আক্রমণ বা বিস্তার লাভ করে। ক্যান্সারের সচেতনতা বৃদ্ধি, সনাক্তকরণ, প্রতিরোধ এবং চিকিৎসায় উৎসাহিত করার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রতি বছর ফেব্রুয়ারির চার (০৪) তারিখ বিশ্ব ক্যান্সার দিবস পালিত হয়ে আসছে। এবারের ক্যান্সার দিবসের থিম হল- I am and I will এর মানে হলো আমি এবং আমার মধ্যে ক্ষমতা রয়েছে আমার এবং আমার প্রিয় মানুষদের ক্যান্সার থেকে প্রতিরোধ করার।

সারা বিশ্বে মানুষের মৃত্যুর একটি অন্যতম কারণ ক্যান্সার এবং বিশ্বব্যাপী জনগোষ্ঠীর মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ হল এই ক্যান্সার। ২০১৮ সালে সারা বিশ্বব্যাপী ৯.৬ মিলিয়ন মানুষ ক্যান্সারের কারণে মৃত্যুবরণ করেন। বর্তমানে শরীরের যেকোনো অঙ্গেই এ রোগ হতে দেখা যায়। তবে সঠিক সময়ে এ রোগ সনাক্তকরণ ও যথাযথ চিকিৎসা, মানুষকে অনেকাংশে সুস্থ করে তোলে। ধূমপান, মদ্যপান, জর্দা-তামাকপাতা, কিছু প্রক্রিয়াজাত খাবার, রেডমিট, পোড়া খাবার খাওয়া; এছাড়া আঁশযুক্ত খাবার, সবজি, ফলমূল, ভিটামিন ডি, ক্যালসিয়াম কম খাওয়া, শারীরিক ব্যায়াম না করা, শারীরিক স্থূলতা বা বেশি ওজন, আলট্রাভায়োলেট রশ্মি, এক্স-রেডিয়েশন, কিছু রাসায়নিক পদার্থ, কিছু ভাইরাস ও অন্যান্য কারণে ক্যান্সার হয়ে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২০১৮ সালে অন্য সকল ধরণের ক্যান্সারের মধ্যে দুটি প্রধান ক্যান্সার হলো- ১. ফুসফুসের ক্যান্সার (২.০৯ মিলিয়ন মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় যার মধ্যে ১.৭৬ মিলিয়ন মানুষ ফুসফুসের ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করে) ২. ব্রেস্ট (স্তন) ক্যান্সার (২.০৯ মিলিয়ন মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় যার মধ্যে ০.৬ মিলিয়ন মানুষ ব্রেস্ট (স্তন) ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করে)। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আরো একটি প্রতিবেদনে জানা যায় যে, বাংলাদেশে ক্যান্সারের কারণে ০.৮ মিলিয়ন মানুষ মারা যায় যার মধ্যে ৪৮ হাজার পুরুষ এবং ৪১ হাজার নারী। এছাড়া, প্রতিবেদনটিতে দেখা যায়, বাংলাদেশ পুরুষদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যান্সার এবং নারীদের মধ্যে ব্রেস্ট (স্তন) ক্যান্সারের হার তুলনামূলকভাবে অন্য ক্যান্সারের তুলনায় বেশি।

দেশের মধ্যে সরকারী পর্যায়ে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন সরকারী মেডিকেল কলেজের ক্যান্সার বিভাগ প্রধানত, পাশাপাশি কিছু দাতা সংস্থা যেমন আহছানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতাল এবং ৮-৯টি বেসরকারী হাসপাতালে চলছে ক্যান্সারের চিকিৎসা। ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে বলেছে, গত বছর ক্যান্সারে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার যা এই বছর আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে ক্যান্সারের চিকিৎসা ব্যবস্থা যা আছে, তা একদিকে অপ্রতুল এবং অন্যদিকে দীর্ঘ মেয়াদী। সারা পৃথিবীতে এই চিকিৎসা অনেক ব্যয়বহুল। বাংলাদেশে এত বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠী ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও যে হারে আমাদের চিকিৎসা খাত এবং হাসপাতালগুলোর উন্নত হবার কথা তেমনটি হয়ে উঠেনি। ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য একটি মাল্টিডিসিপ্লিনারি চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োজন যার মধ্যে রয়েছে সার্জিকাল অনকোলজি (শৈল্য চিকিৎসক), মেডিকেল অনকোলজি, রেডিয়েশন অনকোলজি, পেডিয়াট্রিক অনকোলজি, নিউক্লিয়ার মেডিসিন, ডায়াগনস্টিক সার্ভিস। এছাড়াও ফিজিওথেরাপি, ক্যান্সার প্রতিরোধের জন্য স্বেচ্ছাসেবক দল, পরামর্শদাতা দল (Counseling Team), পুষ্টিবিদ, প্যালিয়েটিভ সাপোর্ট কেয়ার এবং জরুরী কেয়ার টিম ইত্যাদি সমন্বয়ে একটি ক্যান্সার চিকিৎসা সম্পন্ন হয়। গত ১০ বছরে বাংলাদেশে ১০টিও বিকিরণ যন্ত্র (রেডিয়েশন মেশিন) সমন্বয়ে ক্যান্সার হাসপাতাল গড়ে উঠেনি। বাংলদেশে সরকারী পর্যায়ে ১১টি এবং বেসরকারী পর্যায়ে ৮টি রেডিওথেরাপি সেন্টারের মধ্যে Cobalt Teletherapz Machine আছে ১৩টি; Brachztherpaz Machine আছে ১৬টি; Linac Machine আছে ২০টি; যা আমাদের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। এছাড়াও ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকটের কারণে বিশেষায়িত হাসপাতাল সেভাবে গড়ে উঠছে না। সরকারী এবং বেসরকারী হাসপাতালগুলোর সমন্বয়ে রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট এর সংখ্যা মাত্র ১০০-১৫০ জন। যা বাস্তবতার সাপেক্ষে খুবই নগণ্য। প্রতিবছর মাত্র ৫ জন রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট এবং ৩-৫ জন মেডিকেল অনকোলজিস্ট তৈরী হচ্ছে যা আমাদের দেশে এই বিশাল ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসার জন্য অনেক কম। ১৬ কোটি জনগোষ্ঠীর এই দেশে যেখানে ১৬০টি ক্যান্সার সেন্টার প্রয়োজন সেখানে আমাদের হাতে গোনা কয়েকটি ক্যান্সার সেন্টার দিয়ে সুষ্ঠু চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা কল্পনাতীত। ক্যান্সার চিকিৎসার প্রাথমিক পর্যায়ে সার্জিকাল অনকোলজিস্টরা একটি গুরুতপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য যে শৈল্য চিকিৎসার প্রয়োজন হয় তা অন্য শৈল্য চিকিৎসা থেকে ভিন্ন। কারণ এর জন্য প্রয়োজন হয় বিশেষ দক্ষতা এবং নিখুঁত নৈপূন্য। কিন্তু এই ক্ষেত্রেও বিশেষজ্ঞ শৈল্য চিকিৎসক তৈরীতে আমরা পিছিয়ে রয়েছি। বাংলাদেশে দুইটি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান থেকে মাত্র ৩-৫ জন সার্জিকাল অনকোলজিস্ট বের হন যা আসলে আমাদের প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম।

এছাড়াও বাংলাদেশে ক্যান্সার রোগীদের উপর নিজস্ব কোনো পরিসংখ্যান নেই। এর কোনো উদ্যোগ কখনও নেয়া হয়নি। ২০০৯ সালে ক্যান্সার প্রতিরোধে একটা নীতিমালা করা হয়েছিল যেটা আর আপডেট করা হয়নি। এর জন্য সবার আগে দরকার আমাদের নিজস্ব একটা পরিসংখ্যান। রোগীর সংখ্যা কত কি ধরণের ক্যান্সার বেশি হচ্ছে, এগুলো যদি জানা যায় তবেই ক্যান্সার মোকাবেলায় সঠিক পরিকল্পনা নেয়া যাবে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ক্যান্সার চিকিৎসা মোকাবেলায় ৫০ বছরের একটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে এবং বর্তমানে ভারতের ক্যান্সার সেন্টারগুলো সেই পরিকল্পনার ফসল আর সেখানে আমাদের দেশে তেমন কোন পরিকল্পনা গড়ে ওঠেনি। বাংলাদেশের জন্য একটি দীর্ঘ মেয়াদী ক্যান্সার পরিকল্পনা তৈরী করা এখন সময়ের দাবী।

অতএব, আমি আপনি এবং আমাদের সবাইকে হাতে হাত রেখে ক্যান্সার মোকাবেলায় এগিয়ে আসতে হবে। সরকারী-বেসরকারী এবং বিভিন্ন দাতা সংস্থা যদি এগিয়ে আসে তাহলে এই দেশে সম্ভব ক্যান্সার চিকিৎসার একটি শক্ত ভীত গড়ে তোলা। ক্যান্সার প্রতিরোধে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে হবে-

১। ক্যান্সার প্রতিরোধে বাংলাদেশের সকল বিভাগীয় শহর, মেডিকেল কলেজ এবং জেলা শহরে একটি করে দক্ষ সার্জিকাল অনকোলজিস্ট, মেডিকেল অনকোলজিস্ট এবং রেডিয়েশন অনকোলজিস্টদের সমন্বয়ে একটি করে আধুনিক ক্যান্সার সেন্টার স্থাপন করতে হবে যাতে দূর দূরান্ত থেকে মানুষকে কষ্ট করে ঢাকা না এসে নিজের বাড়ির পাশেই চিকিৎসা নিতে পারে।

২। কেমোথেরাপি রোগীদের জন্য একটি এসেনশিয়াল ঔষধের তালিকা প্রণয়ন করতে হবে যা দেশের সকল সরকারী এবং বেসরকারী হাসপাতালে পাওয়া যাবে।

৩। সার্জিকাল অনকোলজিস্টদের জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা যার মাধ্যমে সাধারণ শৈল্য চিকিৎসকরাও নিজেদের এই ব্যাপারে দক্ষ করে তুলতে পারেন এবং প্রাথমিক অবস্থায় নিজেরা ভূমিকা রাখতে পারেন।

৪। প্যালিয়েটিভ কেয়ার স্থাপন: প্যালিয়েটিভ কেয়ার ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে কারণ অধিকাংশ রোগী অ্যাডভান্স স্টেজে চিকিৎসা নিতে আসেন। বাংলাদেশে একমাত্র বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে সেন্টার ফর পেলিয়েটিভ কেয়ারে মাত্র ১৯টি শয্যা রয়েছে যা দ্বারা এত বিশাল সংখ্যক ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসা সুবিধা দেয়া প্রায় অসম্ভব। ক্যান্সার রোগীদের ব্যথা নিরামক হিসাবে মরফিন একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ঔষধ। এজন্য চিকিৎসকদের অবশ্যই মরফিন এবং এর ব্যবহার পদ্ধতির সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে যাতে প্যালিয়েটিভ কেয়ার এই ড্রাগটি চিকিৎসকরা যথাযথ ভাবে ব্যবহার করতে পারেন।

এছাড়াও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাদের যদি আমাদের এই উদ্যোগের সাথে নিজেদের একাত্মতা ঘোষণা করেন তবে আমরা নিজেদের আরও ক্যান্সার মোকাবেলায় এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবো। আসুন আজ এই বিশ্ব ক্যান্সার দিবসে সবাই মিলে সচেতন হই, অন্যকে সচেতন করি, আর সমাজ থেকে রোগটিকে নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক চেষ্টা করি।

 

লেখক: পরিচালক, মেডিকেল সার্ভিসেস

আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল।