ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ৭ ফাল্গুন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

বাংলাভাষা বিষয়ক চিন্তাভাবনা

আহমদ ছফা
প্রকাশিত: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ বৃহস্পতিবার, ০৮:০০ এএম
বাংলাভাষা বিষয়ক চিন্তাভাবনা

বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ কোন সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আমার সঠিক মনে নেই। কলকাতা শহরে এ প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন তৎকালীন বাংলার কৃতবিদ্য মানুষদের এক বিরাট অংশ। তাঁর পেছনের একটু ইতিহাস আছে। ১৯০৫ সালে তাঁর পেছনের একটু ইতিহাস আছে। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের সিদ্ধান্ত অনুসারে বাংলা প্রদেশকে কেটে দু’টুকরা করা হয়। বাংলার পূর্বাঞ্চলকে আসামের সঙ্গে যুক্ত করা হল এবং পশ্চিম অংশকে জুড়ে দেয়া হলো বিহারের সঙ্গে।

এ বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে সমগ্র বাংলায় এক প্রচণ্ড গণঅসন্তোষের সৃষ্টি হয়। বঙ্গভঙ্গ রোধ করার উদ্দেশ্যে নানারকম কর্মসূচি গ্রহণ করা হতে থাকে। কোন কোন অঞ্চলে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন সহিংস আকার ধারণ করেছিল। আবার কোন কোনহ অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হাঙ্গামারও আকার ধারণ করেছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসটি এই বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পটভূমিতেই রচিত হয়েছিল। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে যে বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে অদ্যাবধি তার নিরসন হয়নি।

একধরনের পণ্ডিত এবং গবেষক বলে থাকেন ধুরন্ধর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বাঙালির জাতিসত্তাকে কেটে দ্বিখণ্ডিত করার যে চক্রান্ত করেছিল বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন হল তার প্রত্যক্ষ রূপ। আরেক ধরনের পণ্ডিত এবং গবেষক একটু ভিন্ন রকমের কথা বলেন। তারা মনে করেন, শেষ পর্যন্ত বঙ্গভঙ্গ যদি টিকিয়ে রাখা যেত আখেরে সারা ভারতেরই লাভ হত। পূর্ববঙ্গের ঢাকায় একটি নতুন রাজধানী চালু করা হলে অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে পড়া মুসলমান সমাজের মধ্য থেকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণী জন্ম নিত। তার ফলে পরবর্তীকালে যে আলাদা পাকিস্তান রাষ্ট্র তৈরি হয়েছিল তার প্রতিষ্ঠার কোন যৌক্তিকতা থাকত না। বর্তমান নিবন্ধে আমি বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে কোন আলোচনা করব না। | এই বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সঙ্গে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ গঠনের একটি প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। কলকাতার যে শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর লাকেরা সারা বাংলায় নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন তারা অত্যন্ত শংকিত হয়ে পড়েছিলেন । যদি বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন দীর্ঘদিনের জন্যে কার্যকর থাকে তাহলে তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি অবশিষ্ট থাকবে না। এই শ্রেণীটি সেই জিনিসটি খুব ভালভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছিলেন।

বঙ্গবঙ্গকে সকল প্রকারে যাতে অসম্ভব করে তোলা যায় সেই লক্ষ্য পূরণ করার জন্যে একটি আধা সামাজিক এবং আধা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান সষ্টির প্রয়োজনীয়তা মর্মে মর্মে অনুভব করেছিলেন। সেই কারণেই মুখ্যত বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ সৃষ্টি। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ তৎকালীন বাংলার জনসমাজের মধ্যে একটি শক্তিশালী ঐক্যবোধ সুদৃঢ় করার উদ্দ্যেশ্যে কতিপয় কর্মসূচি যেমন গ্রহণ করেছিলেন তেমনি বাঙালির একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সৃষ্টির বিষয়টিও তাঁদের চিন্তা কল্পনার মধ্যে ছিল। তাঁরা তৎকালীন বঙ্গ প্রদেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নেন। তাছাড়া বিজ্ঞান, শিল্প এবং কৃষ্টি এ সমস্ত বিষয়গুলো সাহিত্য সম্মেলনের অনুষ্ঠানমালার মধ্যে অন্তর্ভূক্ত করে। সেই সময়ে কলকাতা কেন্দ্রিক বাঙালির বিদ্বত সমাজটির মধ্যে বাংলা ভাষাকে নিয়ে একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষার সৃষ্টি হয়েছিল। তাঁদের কেউ কেউ মনে করতে আরম্ভ করলেন কোনদিন যদি ভারত স্বাধীন হয় তাহলে বাংলাভাষা সেই স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রভাষা রুপে পরিগণিত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা সৃষ্টি করা তাঁদের একটি পবিত্র কর্তব্য। এই লক্ষ্য সামনে রেখে তাঁরা প্রতিবছর বাংলা প্রদেশের বিভিন্ন জেলায় যেমন সাহিত্য-সম্মেলনের আয়োজন করতে থাকলেন তেমনি বাংলার বাইরে উড়িষ্যার কটক, বিহারের ভাগল্পুর এবং আসামের অঞ্চলেও সাহিত্য সম্মেলনের কর্মসূচি প্রসারিত করতে থাকলেন। প্রায় সর্বভারতে প্রসারিত এই কর্মকাণ্ডের পেছনে তাঁদের মনে একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষাই ক্রিয়াশীল ছিল। আর সেটা হলো এই যে বাংলা ছাড়া ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর মধ্যে গ্রহণযোগ্য করার একটি কর্মপদ্ধতি তাঁরা চিন্তা করে আসছিলেন। তাঁরা মনে করতেন বাংলা ভাষার সঙ্গে অসমীয়া (অসহনীয়া) এবং উড়িষ্যা ভাষার সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। বাংলা ভাষা যদি পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হয়ে ওঠার সুযোগ পায় তাহলে আসাম এবং উড়িষ্যার লোকেরাও বাংলা ভাষাকে নিজেদের ভাষা হিসেবে গ্রহণ করতে অমত করবেন না। উড়িষ্যা এবং আসাম ছাড়া বিহার বাংলার সীমান্তবর্তী এলাকা। বিহারের মানুষ একধরনের  হিন্দী উপভাষায় কথা বললেও বাংলার সন্নিকটবর্তী জেলাসমূহের মানুষেরা যে ধরনের ভাষা ব্যবহার করেন সেটা হলো হিন্দি এবং বাংলার মিশ্রণে সৃষ্ট একটি ভাষা। বিশুদ্ধ হিন্দি যেমন নয় তেমনি পুরোপুরি বাংলাও নয়। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন রদ করা হল এবং বাংলার দুই ভাঙ্গা অংশকে আবার প্রশাসনিকভাবে সংযুক্ত করা হলো। কিন্তু বাংলা থেকে ভারতের রাজধানী সরিয়ে দিল্লীতে নিয়ে গেলো ব্রিটিশ সরকার। কলকাতা থেকে দিল্লীতে রাজধানী স্থানান্তর করার কারণে পূর্বে ব্রিটিশ-ভারতে বাংলা যে ধরণের গুরুত্বের অধিকারী ছিল তাঁর অনেকখানিই হারিয়ে বসল। তাঁর পরবর্তী রাজনীতির যে গতি প্রক্রিয়ার মধ্যে ভারতে এই উত্তর-পূর্বাঞ্চলে জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পারিক অবিশ্বাস এবং সন্দেহ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকল। তাঁর ফলে বাংলাভাষার অবিভক্ত ভারতে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গৃহীত হওয়ার দাবী ক্রমাগত শক্তি হারিয়ে ফেলেছিল। প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক মনে করতেন ১৯৪০ সালে শহর কলকাতার প্রথম ভাষা ছিল ইংরেজি, দ্বিতীয় ভাষা হিন্দি, তৃতীয় ভাষা উর্দু এবং রাজনৈতিক গুরুত্বের দিক দিয়ে বাংলা ভাষার অবস্থান ছিল চতুর্থ স্থানে।

বাংলাভাষা সম্পূর্ণরূপে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ার কারণে বাঙালির ঐক্যবদ্ধ থাকার সম্পূর্ণ সম্ভাবণা যেমন তিরোহিত হোল, তেমনি বাংলাভাষা ভারতের রাষ্ট্রভাষা হয়ে ওঠার দুয়ারও চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গেলো। তারপরের ইতিহাস সকলেই জানেন ভারতকে কেটে দু টুকরা করা হল, ভারতের মুসলমান প্রধান অঞ্চল নিয়ে একটি নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তান সৃষ্টি হলো। পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির অর্ধযুগ অতিক্রম করার পূর্বে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের জনগণ বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষায় পরিণত করার দাবিতে একটি দুর্বার গণআন্দোলন সৃষ্টি করল। সেই গণদাবির রুদ্ররোষের মুখে পাকিস্তান সরকারকে বাধ্য হয়ে বাংলা ভাষাকে উর্দুর পাশাপাশি আরেকটি রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং  সমাজবিজ্ঞানীদের সুচিন্তিত অভিমত এই যে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির জন্ম সম্ভাবিত হয় ১৯৫২ ভাষা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে তার প্রথম সূচনা হয়েছিল।

আমরা ভাষা সম্পর্কিত আলোচনার আরেকটি পরিপ্রেক্ষিত পাঠকদের সামনে এই আলোচনায় তুলে ধরতে চাই। বাংলা বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা। বাংলাদেশ ছাড়াও পশ্চিমবাংলা, ত্রিপুরা আসামের জনগোষ্ঠীর একটি অংশ বাংলাভাষায় কথা বলে। আসামে বাংলাভাষার স্বীকৃতির দাবিতে বাঙালি জনগোষ্ঠীর লোকেরা ৫২ সালে ঢাকার মনের মত একটি আন্দোলন তৈরি করেছিল। তাদের দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠতে পারে না। আজকে ভারতের যে সকল এলাকার মানুষ বাংলাভাষায় কথা বলেন তাদেরকে কতিপয় সংকটের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। যে সমস্ত রাজ্যে বাংলাভাষীরা সংখ্যালঘু সেখানে প্রাদেশিক ভাষাসমূহের চাপ তাদের সহ্য করতে হচ্ছে। অন্যদিকে পশ্চিম-বাংলায় বাংলাভাষা স্থানীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও হিন্দিভাষার হামলা তাদের পক্ষে এড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। পশ্চিম বাংলার বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর মধ্যে এনিয়ে তীব্র অসন্তোষ রয়েছে। জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিদের অনেকেই আশংকা করছেন পশ্চিম-বাংলায় বাংলাভাষা আজ থেকে অন্তত ৫০ বছর পরে টিকে থাকবে কি না। আগ্রাসী হিন্দির মোকাবেলা করা ছাড়াও পশ্চিম-বাংলার বাঙালিকে আরো কতিপয় সংকটের মুখোমুখি দাঁড়াতে হচ্ছে। পশ্চিম-বাংলার সীমান্তে ঝাড় খণ্ডে একটি নতুন রাজ্য তৈরি করা হয়েছে। গুরখারা সুভাষ ঘিসিং-এর নেতৃত্বে দার্জিলিং অঞ্চলে ‘গুর্খাল্যাভ` রাজ্য প্রতিষ্ঠার দাবি জানাচ্ছে। এতেই শেষ নয়, বাংলা কে দিল্লিতে  বিহারের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের আদিবাসী সম্প্রদায়ের লোকেরা কামতাপুর নামে আরও একটি রাজ্য তৈরি করার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। গুর্খাল্যান্ড, কামতাপুর এই দুটি রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বীকৃতি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার দিতে বাধ্য হবে। প্রশ্নটা সময়ের। এই আলাদা প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলো যদি গঠিত হয়ে যায় সেখানে বাংলাভাষা কোন একটা ভূমিকা পালন করতে পারবে সেটা আশা করা যায় না। প্রস্তাবিত রাজ্য গুর্খাল্যান্ডে গুর্খারা নেপালি ভাষা দাবী করবে এবং প্রস্তাবিত কামতাপুর রাজ্যে সাঁওতাল ইত্যাদি আদিবাসীদের ভাষা প্রাধান্য পাবে। বাংলাভাষা কলকাতার আশেপাশে কয়েকটি জেলা নিয়ে এক চিলতে ভুমির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে বাধ্য হবে তাও হিন্দির আগ্রাসন সহ্য করে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল এইযে, এই কলকাতা মহানগরের বাঙালিরা একসময়ে বাংলাভাষাকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিল।

[লেখাটি আহমদ ছফার প্রবন্ধ সমগ্রর (তৃতীয় খন্ড)-এর ১২৩ থেকে ১২৬ পৃষ্টা থেকে সংকলিত।]

(খ্যাতিমান লেখক, ঔপন্যাসিক, চিন্তাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী আহমদ ছফা। ১৯৪৩ সালের ৩০ জুন চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার গাছবাড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর লেখায় বাংলাদেশি জাতিসত্তার পরিচয় নির্ধারণ প্রাধান্য পেয়েছে। জীবদ্দশায় আহমদ ছফা তাঁর প্রথাবিরোধী, নির্মোহ, অকপট দৃষ্টিভঙ্গীর জন্য বুদ্ধিজীবি মহলে বিশেষ আলোচিত ছিলেন। ২০০১ সালের ২৮ জুলাই অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার সময় তাঁর মৃত্যু হয়।)

বাংলা ইনসাইডার/এসআর