ঢাকা, বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ১০ বৈশাখ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

আল মাহমুদ: ভ্রান্ত রাজনীতিতে হারিয়ে যাওয়া এক যোদ্ধা

অর্চি হক
প্রকাশিত: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ রবিবার, ০১:০১ পিএম
আল মাহমুদ: ভ্রান্ত রাজনীতিতে হারিয়ে যাওয়া এক যোদ্ধা

একজন মুক্তিযোদ্ধাকে জীবনের প্রতিটি ধাপে পরীক্ষা দিতে হয়। বলা হয়ে থাকে, প্রতিটা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হতে পারেন। কিন্তু একজন রাজাকারকে কোনো পরীক্ষাই দিতে হয় না। একবার রাজাকার হলেই সে সারাজীবনের জন্য রাজাকার। মুক্তিযোদ্ধা আর রাজাকারের মধ্যে মূল পার্থক্যটা হয়তো এখানেই। বাংলা সাহিত্যের শক্তিশালী কবি আল মাহমুদ একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পরে যারা কিছুটা ভিন্ন পথে চলে যান, আল মাহমুদ তাদের মধ্যে একজন।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর আল মাহমুদ জাসদের দ্বারা দীক্ষিত হন। জাসদের পত্রিকা গণকণ্ঠে যোগ দেন। এরপর বলতে গেলে প্রায় পুরোপুরি ঘুরে গিয়ে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী জামাতের মুখপত্র ‘দৈনিক সংগ্রাম’-এ যোগদান করেন।

বাংলাদেশের সাহিত্যের উত্থানপর্ব হিসেবে ধরা হয় যে সময়টাকে, সেই ষাট-সত্তর দশকের অন্যতম শক্তিশালী কবি আল মাহমুদ। এই দশকে শামসুর রহমান, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, ফজল শাহবুদ্দিন এবং আল মাহমুদরা মিলে বাংলা কবিতায় একটা বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন।

যেকোনো দেশে স্বাধিকার বা মুক্তিযুদ্ধের আন্দোলন যেমন একটি স্বাধীন দেশের উত্থান ঘটায়, ঠিক তেমনি এই সময়টাতেই দেশটির সাহিত্যে জগতেও একটি সোনালী প্রজন্মের সৃষ্টি হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে যেমন লিও তলস্তয়ের প্রজন্ম রুশ সাহিত্যে বিপ্লব ঘটিয়েছিল, আমাদের দেশেও তেমনি আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণেরা মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম। আমাদের দেশের সাহিত্যের উত্থান ঘটেছিল তাদের হাত ধরে। ষাটের দশকে বাঙালী জাতির দ্রোহ আর আন্দোলনের প্রতিচ্ছবি আমরা দেখতে পাই তাদের কবিতায়।

অনেকেই বলেন আল মাহমুদ বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী কবিদের একজন। তার ভাষা, শব্দচয়ন অত্যন্ত শক্তিশালী বলেই উল্লেখ করেন সাহিত্য অনুরাগীরা। কিন্তু সাহিত্যে একজন মানুষের অবদান যতই নিরেট হোক না কেন, তার রাজনীতি ভ্রান্ত হলে, মানুষটা সঠিকভাবে মূল্যায়িত হন না। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলেন কবি আল মাহমুদ। 

একজন মানুষের শরীরের প্রত্যেকটা অঙ্গ প্রত্যঙ্গ যেমন তার নিজের অংশ, এগুলো আলাদা করা সম্ভব নয়। ঠিক তেমনি একজন মানুষের শুধুমাত্র কবিসত্তাটাও আলাদা করা সম্ভব নয়। মানুষকে বিচার করতে হলে তার রাজনৈতিক মুল্যবোধটা কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। কিন্তু যদি শুধুমাত্র কবিসত্তা বিচার করা হয়, তবে আল মাহমুদ হলেন বাংলা সাহিত্যের শীর্ষ সাহিত্যিকদের মধ্যে একজন। তিনি অসাধারণভাবে চিরায়ত বাংলা শব্দগুলো তার কবিতায় তুলে এনেছেন। কিন্তু দিগভ্রান্ত রাজনীতির কারণেই তার প্রাপ্য সম্মান তিনি পাননি। বর্তমানে তিনি অসুস্থ অবস্থায় আইসিইউ’তে চিকিৎসাধীন। যেকোনো সময় তিনি বিদায় নিতে পারেন।

বর্তমানে বাংলা সাহিত্যে বন্ধ্যাকাল চলছে। এই সময়ে এসে আল মাহমুদের মতো একজন শক্তিশালী কবিকে হারানো হবে বাংলা সাহিত্যের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। কিন্তু সাহিত্যিকদের অবশ্যই মনে রাখা উচিৎ যে, রাজনৈতিক মূল্যবোধ সাহিত্যের একটা বড় অনুষঙ্গ। কেউ যদি রাজনীতিমনষ্ক না হন ক্ষতি নেই। কিন্তু যদি কেউ ভ্রান্ত রাজনীতির চোরাগলিতে পা বাড়ান, সেক্ষেত্রে তার প্রতিভার যে যোগ্য মূল্যায়ন হয় না, এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ কবি আল মাহমুদ। এ কারণেই হয়তো যোদ্ধা এই কবির প্রতিভার থেকেও তার রাজনৈতিক মূল্যবোধটাই বারবার বড় হয়ে উঠে আসে।

বাংলা ইনসাইডার