ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ৭ ফাল্গুন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

গণমাধ্যমে নারী কেমন আছে, কোথায় আছে

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ মঙ্গলবার, ০৮:০১ এএম
গণমাধ্যমে নারী কেমন আছে, কোথায় আছে

‘আপনার মেয়ে শিখাকে কাল দেখলাম টেলিভিশনে, রিপোর্টটা ভালো লাগলো খুব। আমার মেয়েও তো আপনার মেয়েকে দেখে এখন বলা শুরু করেছে সে সাংবাদিক হবে!’ শিখার বাবার মতো এমন এক সাংবাদিকের বাবার কাছে মেয়েকে নিয়ে প্রতিবেশীর এমন উক্তি শোনা মানে গর্বে বুক ফুলে ওঠা। ‘আমার মেয়ে সাংবাদিক, গণমাধ্যমে তার অবস্থান এখন দারুণ’- এই ভাবনাটি গর্বেরই বটে। নারীর গণমাধ্যমে উঠে আসা আমাদের মতো দেশের জন্য নিঃসন্দেহে আশীর্বাদের। সেই পরিস্থিতি নষ্ট হলো কিনা, তা নিয়ে বোধহয় ভাবার সময় এসেছে।

খুব গর্বভরে আমরা বলি, গণমাধ্যমে নারীর উপস্থিতি ঈর্ষণীয়। চ্যালেঞ্জিং পেশার নাম সাংবাদিকতা, ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম সাংবাদিকতা। সাংবাদিকতা নারী-পুরুষ সবার পেশা, কিন্তু দেখা যায় সাংবাদিকতা পেশায় পুরুষের তুলনায় নারীদের অংশগ্রহণ নিতান্তই কম। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে নারীর কর্মস্থান হিসেবে নিরাপদ প্লাটফরম হিসেবে গণমাধ্যম শীর্ষে উঠে এসেছিল। আগের তুলনায় প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক আর অনলাইন মিডিয়ার সাংবাদিকতায় নারীদের হার এগিয়েছে অনেক দূর। সংবাদপত্র, রেডিও-টিভি, অনলাইন প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারী সাংবাদিকদের দীপ্ত পদচারণা লক্ষণীয়। বিশ্বের নারী সাংবাদিকের সংখ্যা এখন সত্যিই চোখে পড়ার মতো।

কিন্তু নারী এগিয়েছে ঠিকই। তার সঙ্গে চলছে বিভিন্ন কুৎসা, কটূকথা, অনিরাপত্তার মতো অভিশাপগুলো। যেকোনো প্রতিষ্ঠানেই যৌন নিপীড়ন হলে সেটা খারাপ। একটি নারী প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে কোনো নারী হিসেবে নয়, একজন কর্মী হিসেবে, যোগ্যতার নিরিখে।

গণমাধ্যমেও যদি এমন নিপীড়নের, কানাঘুষার ঘটনা ঘটে- সেটা অবশ্যই খারাপ। আমরা সেটাকে সমর্থন করি না। দোষীর শাস্তি হোক, প্রতিষ্ঠান তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিক সেটাও চাই। কিন্তু যে ঘটনার শিকার, তাকে নিয়ে রং মাখিয়ে আরও কিছু কুৎসা রটানো, তাকে হেয় করা, সবার সামনে ঘটনা তুলে ধরা মানেই কি তাকে সহমর্মিতা জানানো? বোধহয় না। কারণ সেই নারীর একটি পরিবার আছে, নিজের একটা জগৎ আছে। তাদের কাছে সেই নারীর অবস্থান কোথায় যাচ্ছে, তা কি আমরা ভাবছি?

এ তো গেলো ঘটনার শিকার কোনো নারীর কথা। কোনো গণমাধ্যমের প্রধান, উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সহকর্মীর সঙ্গে বিভিন্ন সত্য-অসত্য বিষয় জড়িয়ে নারীকে হেয় করার ঘটনা সম্প্রতি যেন একটু বেড়েছেই। এখন কথা হলো, পেশা আর ব্যক্তিগত বিষয়গুলোকে মিলিয়ে-মিশিয়ে গায়ে দোষ লাগিয়ে কি লাভ হচ্ছে? কার লাভ হচ্ছে? কর্মক্ষেত্রে নিপীড়ন তো খারাপই, সেই নিপীড়নকে বাড়িয়ে বলে পেশাদারিত্বের ভিতকে নাড়িয়ে দেওয়া আরও খারাপ নয় কি?

যেই ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ ঘটনার ডালপালা গজিয়ে দিচ্ছে, তারাও কি পরোক্ষভাবে নিপীড়ন করছে না? অবশ্যই করছে। নিপীড়ন তো শুধু শারীরিকভাবে হয় না, মুখের দুটি অশালীন, অরূচিকর কথাও সমান নিপীড়ক বলে আমাদের বিশ্বাস।

একটি গণমাধ্যমে একটি দুটি লোক অন্যায় করে পুরো পরিবেশটাকেই নষ্ট করে দিচ্ছে। তারা প্রমাণ করতে চাইছে যে গণমাধ্যম নারীদের জন্য নিরাপদ স্থান নয়।

বর্তমান সময়ে উঠতি, জনপ্রিয়, নবীণ, প্রবীণ কোনো গণমাধ্যম কর্মীই বাদ যাচ্ছেন না এই অবস্থা থেকে। যে নারী বা পুরুষ ঘটনার সঙ্গে জড়িত তার দিকে তীর তোলা হয়, সেটা ভিন্ন কথা। তার সঙ্গে মিলিয়ে সব নারী গণমাধ্যম কর্মীকে এক কাতারে ফেলা হচ্ছে, গণমাধ্যমের পরিবেশটাই এমন, গণমাধ্যমে আসতে গেলে নিচে নামতে হবে, নিজেকে বিকিয়ে দিতে হবে- এমন সব ধারণা কিন্তু এখনো আমাদের মধ্যে আছে। গণমাধ্যমের বাইরের মানুষেরা এই ধারণা বেশি পোষণ করে। অথচ খোলাচোখে তাকালে দেখা যায় একজন পুরুষ সাংবাদিক যখন সাফল্য পাচ্ছে, ভালো কোনো চমক করার মতো কাজ করে ফেলছে- তাকে বাহবা দেওয়া হচ্ছে। তার প্রশংসা করা হচ্ছে। এটা শুধু তারই অর্জন, সেটাও বলা হচ্ছে। একটা নারীর ক্ষেত্রে তেমনটা হচ্ছেনা কিন্তু। নারীর সাফল্য মানে তার একার নয়। সে হয়তো কারো থেকে সহায়তা পেয়েছে, কারো মাধ্যমে উপরে উঠে এসেছে। এই ভাবনাটি অবশ্যই নারীর প্রতি অবিচার।

একজনের অপরাধ আরেকজনের ওপর বর্তাচ্ছে অহরহ। বর্তমানের কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা সেগুলো আরও উস্কে দিচ্ছে।

এই কাজের জায়গাটি তুলনামূলক স্বাধীন, মিলেমিশে কাজের খাতিরে প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ব্যক্তিকে দুরত্ব রেখে চলার কথা ভাবলে চলে না। কার সঙ্গে কে কোথায় গেলো, কেমন ছবি তুললো, কার সঙ্গে কার ঘনিষ্ঠতা কতোটুকু- এগুলোকে মুখরোচক গল্প বানিয়ে ফেলা হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, পেশাদারীত্বের জায়গা থেকে ব্যক্তিগত দিকে কেন টানা হচ্ছে? একটা নারীকে বিষাক্ত করতে বাকিদেরও কেন বিষিয়ে তোলা হচ্ছে? এতে পরিবার কি আর চাইবে তাদের মেয়েটি গণমাধ্যমে কাজ করুক? বন্ধুসমাজই বা কি ভাবলো? পরিবারের কাছে প্রশ্নের মুখোমুখি হলে কি জবাব দেবে তারা?

যারা সরাসরি নিপীড়ন করে তারা যেমন গর্হিত অপরাধী, আর যারা নারী সাংবাদিকদের নিয়ে বিভিন্ন কুৎসা আর নোংরা কথা ছড়াচ্ছে তারাও এমন গর্হিত অপরাধী। ভালো অবস্থান পেতে হলে উপরমহলে ভালো সম্পর্ক রাখতে হবে- এই ধারণা গণমাধ্যমে এখনো প্রচলিত।

নারীকে সম্মান আর শ্রদ্ধা দেখানোর কথা যুগ যুগ ধরে আমরা বলে আসছি। যারা এটা করে না তাদের রূচি নিঃসন্দেহে বিকৃত। অফিসের কাজের পরিবেশ সুন্দর রাখবে, নারীদের নিরাপত্তা দেবে কর্তৃপক্ষ। এর ভেতরে কেউ যাতে অপমান বা অসম্মানজনক কথা না বলে, হয়রানিমূলক কাজ না করে সেই নিশ্চয়তাও দেবে তারা। প্রতিষ্ঠানের বাইরে কে কি করছে- সেটা প্রতিষ্ঠানের মাথাব্যথা নয়।

এই অবস্থা নিরসন হবে কীভাবে

খুব বেশিকিছু প্রয়োজন নয়। প্রথমে প্রয়োজন মানসিকতার উন্নয়ন ঘটানো। কর্মক্ষেত্র আমাদের কাছে পবিত্র একটি জায়গা। এর ওপরেই সম্মান, আয় আর জীবিকা নির্ভর করে। গণমাধ্যমকেও তেমন কর্মক্ষেত্র মনে করতে হবে। যারা সমস্যা তৈরি করে তারা পেশাকে সম্মান করে না, তাদের রূচি বিকৃত। তাদেরকে অর্থাৎ অভিযুক্তকেই শাস্তি দেওয়া হোক। অন্যকে এর মধ্যে না আনাই সম্মানের। এতে প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলাও নষ্ট হয় না। একজনকে কোনো কারণে পছন্দ হচ্ছে না, তার বিরুদ্ধে দাড়াতে গেলে কিচু কুৎসিত কথা ছড়িয়ে দিলেই হলো। আবার একজন নারী খেটেখুটে উপরে উঠে যাচ্ছে, তাকে নামিয়ে দেওয়া জন্যেও কুকথা ছড়িয়ে দিলে গেলো ইমেজের বারোটা বেজে। এই কাজটি নৃশংস। নিরসনের পথ আছে সবার কাছেই। মূল্যায়ন করতে শিখতে হবে। নারী-পুরুষকে আলাদা করে দেখার মানসিকতা ছাড়তে হবে।

মনে রাখতে হবে মেধা, পরিশ্রম দিয়ে একজন নারী গণমাধ্যমে আসছে, সাংবাদিকতা করছে, ছুটে চলেছে আপন গতিতে। সেই অগ্রগতির পথে নারীকে টেনে নামিয়ে না দিলেই কি নয়? গণমাধ্যমকে ইচ্ছাকৃতভাবেই কি কলঙ্কিত করা হচ্ছে না?

 

বাংলা ইনসাইডার/এসএইচ