ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০১৯, ১২ বৈশাখ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

ফাল্গুনে ভালোবাসার গান, কবিতা

শাহরিনা হক
প্রকাশিত: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ বুধবার, ০৩:২০ পিএম
ফাল্গুনে ভালোবাসার গান, কবিতা

বসন্ত মানেই একগুচ্ছ কবিতা, গান, ভালোবাসার পঙক্তিমালা। আজ বসন্ত এসেছে বলে বলছি না। আমাদের জীবনে বসন্তের গান, কবিতা, গল্পগুলো আজীবনই ঘুরেফিরে আসে। ফাল্গুন আসা মানেই এগুলো বার বার মনে করিয়ে দেওয়া, মনকে আন্দোলিত করা। এই প্রেমময় গান, কবিতা আছে বলেই ফাল্গুন এতো ভালোবাসার।

‘আজি দখিন-দুয়ার খোলা

এসো হে, এসো হে, এসো হে আমার বসন্ত এসো...’

এভাবেই বসন্তকে আহ্বান করেছেন আমাদের কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সেই বসন্ত এসে গেছে। তাঁর ভাষায় ‘মধুর বসন্ত এসেছে মধুর মিলন ঘটাতে। মধুর মলয়-সমীরে মধুর মিলন রটাতে। কুহক লেখনী ছুটায়ে কুসুম তুলিছে ফুটায়ে, লিখিছে প্রণয়-কাহিনী বিবিধ বরন-ছটাতে’।

এমন সুন্দর মনে প্রেম নিয়ে বসন্তকে ডেকে আনা কবিগুরু ছাড়া আর কার দ্বারা সম্ভব?

শুধু তো এটাই নয়। বসন্তকে নিয়ে যতো সাহিত্য আমাদের রয়েছে, তার মধ্যে রবীন্দ্রনাথের মতো করে কেউ এতো সুন্দর করে লেখার বিনুনি গাঁথতে পারেনি। তাঁর সৃষ্টি সর্বসেরা। শীতের রিক্ততা মুছে প্রকৃতিজুড়ে সাজ সাজ রব এখন চারিদিকে। বিবর্ণ প্রকৃতিতে জেগে উঠেছে নতুন জীবনের এই বসন্ত ঋতুকে নিয়ে কবিরা লিখেছেন অনেক কবিতা।

প্রেমের কবি কাজী নজরুল ইসলামও থেমে থাকেননি। তিনি লিখেছেন- ‘এলো খুনমাখা তূণ নিয়ে, খুনেরা ফাগুন।’ বসন্ত অবশ্যই আমাদের মনে শিহরণ তোলে। সেইসঙ্গে ফাগুনের আগুন লাগে বনেও। রূপলাবণ্যে জেগে ওঠে প্রকৃতি। গাছের পাতা আর ফুলে আলোর নাচন। কোকিলের কুহুতান। সবই জানিয়ে দিচ্ছে আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে। যখন শুনি-

‘ফাগুন, হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান, তোমার হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান, আমার আপনহারা প্রাণ আমার বাঁধন-ছেড়া প্রাণ।

কাজী নজরুলের গানেও নতুন রূপ নিয়ে যেন বসন্তের আগমন ঘটে। তিনি লিখেছেন,- ‘আসে বসন্ত ফুলবনে, সাজে বনভূমি সুন্দরী, চরণে পায়েলা রুমুঝুমু, মধপ উঠেছে গুঞ্জরি।’

ফাগুনের রূপ রসে মুগ্ধ হয়ে তিনি আরও লিখেছিলেন, ‘আজি দোল ফাগুনের দোল লেগেছে, আমের বোলে দোলন-চাঁপায়।’

কবি ফররুখ আহমেদের ফাল্গুনে শিরোনামের কবিতাটি আমরা ছোটবেলায় পাঠ্যবইতেই পড়েছি। বসন্ত আর প্রকৃতির প্রতি তার ভালবাসা সেখানেই দেখতে পাই। তিনি বলেছিলেন ‘ফাল্গুনে শুরু হয় গুনগুনানী, ভোমরাটা গায় গান ঘুম ভাঙানি, এক ঝাঁক পাখি এসে ঐকতানে, গান গায় এক সাথে ভোর বিহানে।’

জীবনের কবি জীবনানন্দের কবিতায়ও বসন্ত এসেছে, তাঁর কবিতার পংক্তিতেই বোঝা যায় তিনিও বসন্ত আর প্রকৃতিকে ভালোবাসতে জানেন। তিনি বলেছিলেন, ‘সবিতা, মানুষ জন্ম আমরা পেয়েছি, মনে হয় কোন এক বসন্তের রাতে, ভূমধ্যসাগর ঘিরে সেই সব জাতি, তাহাদের সাথে, সিন্ধুর আঁধার পথে করেছি গুঞ্জন।’

আবার কবি সুভাস মুখোপাধ্যায় তাঁর কবিতায় লিখেছিলেন- ‘ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক আজ বসন্ত।’

কবি মহাদেব সাহা আবার বসন্তকে সরাসরিকবির সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ‘বসন্তকে আমি বলি কবি, তার হাতে রচিত হয়, পৃথিবীর প্রেমের কবিতা।’

সুফিয়া কামালের সেই কথাগুলো আজও কানে বাজে, ‘হোক, তবু বসন্তের প্রতি কেন এই তব তীব্র বিমুখতা?” কহিলাম “উপেক্ষায় ঋতুরাজে কেন কবি দাও তুমি ব্যথা?” কহিল সে কাছে সরি আসি- “কুহেলী উত্তরী তলে মাঘের সন্ন্যাসী- গিয়াছে চলিয়া ধীরে পুষ্পশূন্য দিগন্তের পথে রিক্ত হস্তে। তাহারেই পড়ে মনে, ভুলিতে পারি না কোন মতে। এই প্রেমের কোনো শেষ ছিল না।

আধুনিক কবি হেলাল হাফিজ বলেছিলেন- আমাকে পাবে না খুঁজে, কেঁদে কেটে মামুলি ফাল্গুনে।

আমাদের সবার প্রিয় একটা আমাদের মুখে মুখে এখনো চলে। বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম গেয়ে উঠেছিলেন ‘বসন্ত বাতাসে সই গো, বসন্ত বাতাসে, বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে।’

আমাদের আধুনিক যে কয়টি বাংলা গান আমাদের শিল্পকে প্রতিষ্ঠিত করেছে তার মধ্যে কুমার বিশ্বজিৎ এর ‘যেখানে সীমান্ত তোমার, সেখানে বসন্ত আমার, ভালোবাসা হৃদয়ে নিয়ে, আমি বারে বার আসি ফিরে, ডাকি তোমায় কাছে।’ বসন্তের মধুর পরিবেশেই প্রিয়জনকে এমনভাবে কাছে ডাকা সম্ভব।

এপার আর ওপার বাংলার ফাল্গুনের সব গান কবিতা যেন একেবারে মিলেমিশে গেছে। ‘ফাগুনের মোহনায় মন মাতানো মহুয়ায়, রঙ্গিনী বিহুর নেশা কোন আকাশে নিয়ে যায়।’ এই গান শুনলেই শরীর আর মন অদ্ভুতভাবে আন্দোলিত হতে থাকে।

‘আকাশে বহিছে প্রেম, নয়নে লাগিল নেশা; কারা যে ডাকিল পিছে! বসন্ত এসে গেছে… এই গানটির মতো জনপ্রিয়তা কিন্তু খুব কম গানই পেয়েছে।

প্রেম আর ভালোবাসার ফাঁকে ফাঁকে অভিমান বিচ্ছেদও সমানভাবে চলে। বসন্তকে নিয়েও যেমন আনন্দ উচ্ছাস আছে, তেমনি আছে বিরহের সুর। যারা এই বসন্তে তাদের মনের মানুষ থেকে দূরে আছেন তাদের জন্যে লেখা গান, ‘কেউ বলে ফাল্গুন, কেউ বলে পলাশের মাস, আমি বলি আমার সর্বনাশ, কেউ বলে দখিনা কেউ বলে মাতাল বাতাস, আমি বলি আমার দীর্ঘশ্বাস।’

বাঙালি বসন্তকে জড়িয়ে রাখে হৃদয়ের একেবারে কাছে। তারা বসন্তে মাতে নানা আনন্দ-উৎসবে। আর এসব বসন্তের উৎসবে আলো ছড়ায় বসন্তের গান ও কবিতা। ‘সুখে আছে যারা, সুখে থাক তারা, সুখের বসন্ত, সুখে হোক সারা’ কবিগুরুর এই পঙক্তিমালা আমাদের ছুঁয়ে যাক বার বার।

 

বাংলা ইনসাইডার/এসএইচ/এমআর