ঢাকা, শনিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১০ ফাল্গুন ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

ভালোবাসা কি মনস্তাত্ত্বিক না শারীরিক?

শাহরিনা হক
প্রকাশিত: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ বৃহস্পতিবার, ১০:০৩ এএম
ভালোবাসা কি মনস্তাত্ত্বিক না শারীরিক?

হুট করে জানতে ইচ্ছে হলো, ‘আচ্ছা ভালোবাসি কেন আমরা? কি দরকার খামাকা মাথা নষ্ট করে? কাউকে ভালো লাগলে, কারো মিষ্টিমধুর ভালোবাসার সম্পর্ক দেখলেই অবশ্যই কখনো না কখনো জানতে ইচ্ছে করে যে ভালোবাসা কাকে বলে? প্রেমের সংজ্ঞা আসলে কী? দেখবেন মাথায় কিছু আসছে না, কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন না। আপনার দোষ নেই। প্রেম বা ভালবাসার সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা তো এখনো দিতে পারেননি কেউ। না কোনো সাহিত্যিক, কোনো দার্শনিক বা মনস্তাত্তিক। প্রেম আর ভালবাসা আসলে একই কি না তা নিয়েও রয়েছে বিতর্ক।

অভিধানে দেখবেন ‘লাভ’ (LOVE)-এর অর্থ প্রেম ও ভালবাসা দুটোই লেখা। প্রেম-এর অর্থ বা সমার্থক শব্দ হিসেবে ভালোবাসা এটা আমরা জানি। অনেকের কাছে আবার প্রেম মানেই ভালোবাসা নয়।

সংজ্ঞা প্রসঙ্গ রেখে এবারে আসি আমরা কীভাবে প্রেমকে দেখি সে বিষয়ে। প্রেম বা ভালবাসার অর্থবোধে আমরা দুইভাগে বিভক্ত। একপক্ষের কাছে ভালোবাসা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি শরীরনির্ভর একটি অনুভূতি। শরীরের উপস্থিতি ছাড়া ভালবাসার অস্তিত্ব তাদের কাছে কিছুটা অকল্পনীয়। এই বিষয়ে বিখ্যাত অস্ট্রিয়ান নিউরোসায়েন্টিস্ট সিগমুন্ড ফ্রয়েড-ও তার মতাদর্শী মনস্তাত্তিকদের ধারণাটা বলা দরকার। তাদের মতে সব প্রেমের উৎস শরীরী আকর্ষণ- যৌনতা। এখনো অনেকের কাছেই প্রেম মানে শরীর বা যৌনতা।

বিপরীত পক্ষের কাছে প্রেম শাশ্বত, চিরন্তন, স্বর্গীয় এক অনুভূতি। সেখানে শরীরের কোনো স্থান একেবারেই নেই। পরস্পরের প্রতি মানসিক আকর্ষণই সেখানে প্রেম বা ভালবাসার মূলভিত্তি। সম্পর্কের স্থায়িত্বের নিয়ামকও বটে। এই পক্ষের লোকেরা মনে করেন যতক্ষণ অনুভূতিটা থাকে, ততক্ষণই সেটা ভালোবাসা। আর সেই ভালোবাসার মধ্যে শারীরিক বিষয়গুলো অন্তর্ভূক্ত হলে তা আর ভালোবাসা মনে হয়না, সেটা যৌনতা বা কাম। আবার ভাবা হয়, মানসিক আকর্ষণ বেশি হলে প্রেম টেকসই হয়। এদের কাছে ভালোবাসার বিষয়টি প্লেটোনিক, যেটি প্লেটোর আদর্শ থেকে এসেছে। বিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক প্লেটো আদতে প্রেমের কোনো তত্ত্ব দেননি। তার দর্শনে রয়েছে এমন এক ধরনের প্রেমের যা ইন্দ্রিয়াতীত এক চির সৌন্দর্যের ধারক এবং বাহক।

আরেকদল লোক আছে যারা ভিন্নমত পোষণ করেন। তারা শারীরিক আকর্ষণনির্ভর অনুভূতিকে প্রেম বলে আখ্যায়িত করেন, মানসিকটি ভালবাসা। আবার কেউ বলেন নর-নারীর পারস্পরিক ভালবাসা বা প্রেমে শরীর বা যৌনতা আসতে পারে। এই বিতর্ক আজীবনের। মনীষী-বিজ্ঞানী-গবেষকরাও এখনো একমত হতে পারেননি এই গোলকধাধায়। তারা আজও বলতে পারেননি যে প্রেম বা ভালবাসা শারীরিক নাকি মানসিক।

প্রেমের ধরন নিয়ে গ্রহণযোগ্য একটি মতবাদ দিয়েছেন কানাডার প্রখ্যাত মনস্তত্তবিদ জন অ্যালান লি। তার তত্ত্বের নাম কালারস অব লাভ বা ভালবাসার রং। রঙের মতবাদের সঙ্গে মিল রেখে এই তত্তের নাম দেয়া হয়েছে। মূল রং তিনটি লাল, সবুজ, নীল। বাকি সব রং এই তিন রঙের ভিন্ন ভিন্ন মিশ্রণের ফল।

ভালবাসার আরেকটি মতবাদ দিয়েছেন আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী রবার্ট জেফ্রি স্টার্নবার্গ। তার মতবাদ ‘ভালবাসার ত্রিভুজ তত্ত্ব’ হিসেবেই পরিচিত। তার মতে, ত্রিভুজের তিন বাহুর মতো ভালবাসারও তিনটি ভিন্ন উপাদান অন্তরঙ্গতা,  কামোচ্ছাস এবং প্রতিশ্রুতি। অন্তরঙ্গতা বলতে বোঝায় পরস্পরের প্রতি নৈকট্যের অনুভব। কামোচ্ছাস হচ্ছে কাম, জৈবিক আকর্ষণ বা যৌন আকাঙক্ষা। আর দীর্ঘস্থায়িত্ব ও পারস্পরিক নির্ভরতায় ভবিষ্যতের পরিকল্পনাই হচ্ছে প্রতিশ্রুতি। ভালোবাসার এই তিনটি উপাদানের উপস্থিতি-অনুপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে ভালোবাসা ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে ভিন্নতর হয়।

আমেরিকান নৃবিজ্ঞানী হেলেন ফিশার প্রেম-ভালবাসাকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করেছেন। রোমান্টিক ভালোবাসাতে আবেগের প্রাধান্য বেশি। দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের জন্য এটি প্রয়োজনীয়। ফিশারের মতে প্রেম-ভালবাসার সম্পর্ক এই তিনটি ধরনের যে কোনো একটি দিয়ে শুরু হতে পারে এবং পরবর্তী সময়ে তা অন্য ধরনে পরিবর্তিতও হতে পারে। আবার একই সঙ্গে তিনটি ধরনই উপস্থিত থাকতে পারে।

মহামনীষীদের কথা ছাড়ি। আমরা নিজেরা যারা ভালোবাসি বা ভালোবাসি না, তাদের কাছে কি পরিস্কার যে ভালোবাসা শরীরসর্বস্ব নাকি মনসর্বস্ব? এই বিতর্কের এখনো কোনো সমাধান নেই। মনস্তাত্ত্বিক, দার্শনিক, সমাজবিদরা ভালোবাসার মতবাদ দিয়েছেন বা দিচ্ছেন- সেগুলোও যে মেনে নিতে হবে তা না। সবচেয়ে বড় কথা আপনি কি ভাবছেন। এতোকিছু ভেবেও তো প্রেম হয় না। এগুলো ভাবতে গিয়ে তো ভালোবাসা বা সম্পর্ক করা যায় না।

তবে এখন আধুনিক যুগ তো। ভালোবাসার সংজ্ঞা পাল্টে গেছে। আগের মতো দূরত্ব রেখে প্রেম বা অনেকদিন পর পর দেখা করা, লাজুক বদনে সঙ্গীর দিকে তাকানোর দিন শেষ। এখন ভালোবাসা অনেকটাই খোলামেলা আর আধুনিক। এখানে সংকোচ কম, জানাশোনা অনেক বেশি। তাই সম্পর্ক গভীর মাত্রায় চলে যেতে খুব একটা সময় লাগে না এখন। তাই ভালোবাসা শারীরিক না মানসিক- সেটা নিয়ে আমাদের ভাবনাচিন্তা এখন অন্যদিকে প্রবাহিত। তবে ভালোবাসার দিনে একটাই চাওয়া, ভালোবাসা হোক স্বচ্ছ আর নির্মল।

 

বাংলা ইনসাইডার/এসএইচ