ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০১৯, ১২ বৈশাখ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

পত্রমিতালী থেকে ফেসবুক: প্রেমে পড়ার একাল-সেকাল

অর্চি হক
প্রকাশিত: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ বৃহস্পতিবার, ১১:৩৭ এএম
পত্রমিতালী থেকে ফেসবুক: প্রেমে পড়ার একাল-সেকাল

হাসান পাঁচ বছর অপেক্ষা করেছিল মিতুর চিঠির জন্য। কিন্তু সেই চিঠি আসেনি। শেষমেশ বাবা-মায়ের পছন্দের মেয়েকেই বিয়ে করে ফেলেছিল সে। তবে এখনো মাঝে মাঝে তার জানতে ইচ্ছে হয়, মিতু কেমন আছে, কোথায়ই বা আছে। কিন্তু সে উপায় আর নেই এখন। পত্রমিতালীতে পাওয়া এক ঠিকানার মাধ্যমে মিতুকে খুঁজে পাওয়া, চেনাজানা। প্রথম চেনা বলতে শুধু নাম-ঠিকানাটুকুই। কেউ কাউকে না দেখেই শুধু চিঠি লিখে প্রেম হয়েছিল তাদের। সেই থেকে অপেক্ষা, একসঙ্গে থাকার প্রত্যয়। এখনকার তরুণ-তরুণীদের কাছে এরকম প্রেমকাহিনী অনেকটা রূপকথার মতোই মনে হবে। অথচ একটা সময় এমন ঘটনা ঘটতো অহরহ।

১৯৮০’র দশকে চিঠি লিখে মনের মানুষ খুঁজে পাওয়ার জনপ্রিয় এক মাধ্যম ছিল পত্রমিতালী। ম্যাগাজিন আকারে বের হতো, বন্ধুত্ব প্রত্যাশীদের নাম-ঠিকানা। দুই টাকার বিনিময়ে যে কেউ চাইলেই সেসব ম্যাগাজিনে নিজের নাম ঠিকানা ছাপাতে পারতো। শুধু নাম-ঠিকানাটুকুই। সেখানে থাকতো না কোনো ছবিও। স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা একটু পছন্দসই নাম পেলেই চিঠি লিখে ফেলতো। এভাবেই হতো পরিচয়। সেখান থেকে অনেকেরই সম্পর্ক প্রণয় পর্যন্ত গড়াতো। তবে পরিণয়ের সংখ্যাটা ছিল একেবারেই কম। অনেকে আবার বহু বছর চিঠি আদান-প্রদানের পরেও অদেখা-অজানাই রয়ে যেতেন। মেয়ে সেজে ছেলেকে চিঠি দেওয়ার মতো ঘটনাও তখন ঘটতো প্রচুর। সেলফোনবিহীন সেই যুগে অনেকেরই বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম ছিল এই পত্রমিতালী।

পত্রমিতালীর পরের ধাপে প্রেমে পড়ার নতুন মাধ্যম হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন। অনেক উঠতি তারকারাও তখন পত্রিকাগুলোয় ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন লিখতেন। এই বিজ্ঞাপণের বদৌলতেই ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’র মতো পত্রিকাগুলোর জনপ্রিয়তা বেড়েছিল কয়েকগুণ। এই মাধ্যমটির আবার কিছু কড়াকড়ি নিয়মও ছিল। বিজ্ঞাপনগুলো সেন্সর করে ছাপানো হতো। তাছাড়া একটা পোস্ট বক্সও নিতে হতো। শোনা যায়, লেখিকা তসলিমা নাসরিন আর কবি রুদ্র মোহাম্মাদ শহিদুল্লাহ নাকি এই ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপনের মাধ্যমেই একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন। কবি রুদ্র মোহাম্মাদ শহিদুল্লাহ তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বিচিত্রায় তসলিমা নাসরিনের বিজ্ঞাপন দেখে তাকে উৎসর্গ করে একটা কবিতা লিখেছিলেন তিনি। বিচিত্রাতে ছাপা হয়েছিল সেটি। দুজনের প্রণয়ের শুরুটা হয়েছিল সেখান থেকেই।

ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপনের পরেও প্রেমের মাধ্যম হিসেবে চিঠির প্রচলনটা টিকে ছিল বহুদিন। নব্বইয়ের দশকে টেলিফোনকে সম্বল করেও প্রেম করেছেন অসংখ্য কপোত-কপোতী। বাসা, অফিস কিংবা দোকানের ফোন ব্যবহার করে খুব অল্প সময়ই কথা বলতে পারতেন তারা।

এরপর খুব দ্রুতই সব বদলাতে শুরু করে। প্রেম ঘটানোর সবচেয়ে বড় মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায় মোবাইল ফোন। ধনী-গরীব নির্বিশেষে সবার প্রেমের অবলম্বনে পরিণত হয় এটা। নিজের নাম্বারের সঙ্গে নাম্বার মিলিয়ে ফোন দেওয়া, অতঃপর প্রেম। এমন ঘটনা ঘটেছে প্রচুর। আর এখন তো ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপসহ অনলাইন অ্যাপসগুলোর রমরমা অবস্থা।

না দেখে প্রেমে পড়ার দিন তো সেই কবেই গেছে। অনেকেই মজা করে বলেন ‘যাও পাখি বল তারে, সে যেন ভোলে না মোরে’র যুগ থেকে ‘লোকাল বাসে’র যুগে চলে এসেছে প্রেম। একাটা সময় প্রেমিক-প্রেমিকারা চিঠির জবাবের আশায় মাসের পর মাস অপেক্ষা করতো, এখন সেখানে টেক্সট এর রিপ্লাই দিতে একটু দেরি হলেই ব্রেক আপ! একটা সময় যেখানে প্রেমিকাকে এক নজর দেখতে বহুদূরের পথ পাড়ি দিত প্রেমিক, এখন সেখানে ভিডিও চ্যাটিংয়ে ২৪ ঘন্টা একে অপরের চোখের সামনেই থাকতে পারছেন তারা। কিন্তু প্রেমের মাধ্যমের আমূল পরিবর্তন কি প্রেমের বন্ধনকে দৃঢ় করেছে? নানা গবেষণা আর পরিসংখ্যান কিন্তু উল্টো ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রেমের মাধ্যম যতই হাতের মুঠোয় এসেছে, ভালোবাসা নাকি ততই ঠুনকো হয়েছে।

বাংলা ইনসাইডার/এএইচসি