ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ মার্চ ২০১৯, ৭ চৈত্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

অযত্ন-অবহেলায় নষ্টদের দখলে রেসকোর্স ময়দান

সঞ্জয় অধিকারী
প্রকাশিত: ০৭ মার্চ ২০১৯ বৃহস্পতিবার, ০১:০৪ পিএম
অযত্ন-অবহেলায় নষ্টদের দখলে রেসকোর্স ময়দান

বাঙালী জাতির ইতিহাসের নানা ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দান বা বর্তমানের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। কিন্তু কালের বিবর্তনে বিভক্ত ও সংকুচিত হয়ে গেছে ঐতিহাসিক এই ময়দানটি। অবহেলা আর অযত্নে হারিয়ে গেছে এর নানান স্মৃতিচিহ্ন। বর্তমানে এটি হয়ে উঠেছে মাদকসেবী আর অপরাধীদের অভয়াশ্রম।

বাংলাদেশের রাষ্ট্র-ক্ষমতার পটপরির্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে যায় অনেক কিছুই। ঐতিহাসিক এই উদ্যানের ক্ষেত্রেও ঘটেছে তেমনটি। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ওপর প্রথম আঘাত আসে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর। ১৯৭৯ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের একপাশে শাহবাগে শিশু পার্ক গড়ে তোলা হয়। শিশুদের বিনোদনের জন্য এই শিশু পার্কটি ১৯৮৩ সালে যাত্রা শুরু করে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ১৫ একর জায়গা চলে যায় এই শিশু পার্ক নির্মাণে। সেই সাথে হারিয়ে যেতে থাকে, ওই স্থানের স্মৃতিবহ ঘটনাগুলোও।

১৯৯৬ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নির্মিত হয় স্বাধীনতা স্তম্ভ। ১৫০ ফুট উঁচু একটি গ্লাস টাওয়ার ও ২৭৩ ফুট দীর্ঘ একটি ম্যুরাল নির্মাণ করা হয়েছে। যেখানে ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস অঙ্কিত রয়েছে। ১৯৯৯ সালে এখানে ‘শিখা চিরন্তন’ স্থাপন করা হয়। তবে নির্মাণের পর সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এই সব স্থাপনা।

বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ যেখানে ভাষণ দিয়েছিলেন এবং ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যেখানে আত্মসমর্পন করেছিল সেই স্থানগুলো দীর্ঘদিন ধরে চিহ্নিত করা যায়নি। ফলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গেলেও মানুষ সেই ঐতিহাসিক স্থান দেখা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। অবশেষে স্থানগুলো চিহ্নিত করতে পেরেছে সরকার। তবে ঐতিহাসিক এ উদ্যানের কোন জায়গায় বঙ্গবন্ধু সাত মার্চের ভাষণ দিয়েছিলেন, এর কোন নির্দেশনা নেই। একই অবস্থা পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর আত্মসমপর্ণের ক্ষেত্রেও। এছাড়া যেসব স্থানে স্মৃতি স্মারক রয়েছে সেগুলোরও কোন নির্দেশনা নেই।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের একটি অংশের ফলকে লেখা আছে, ‘মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ডাক। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। রেসকোর্স ময়দান, ৭ মার্চ ১৯৭১। জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান’। অর্থাৎ এখান থেকেই স্বাধীনতার ডাক দেয়া হয়েছিল। স্থানটি সংরক্ষণের জন্য এই ফলকটি স্থাপন করা হয়। কিন্তু সেই ফলকের অবস্থা বেশ শোচনীয়। এরইমধ্যে ফলকের লেখাগুলো অস্পষ্ট হয়ে গেছে। নিচের অংশ একেবারেই মুছে যাচ্ছে। শ্বেত পাথরের চারপাশে লাল বর্ডারের অংশ ভেঙ্গে গেছে। চারপাশজুড়ে ময়লা আবর্জনার স্তূপ। দর্শনার্থীদের মলমূত্রে ছেয়ে আছে চারপাশ। দেখলেই বোঝা যায়, অযত্ন আর অবহেলার শিকার ফলকটি। এর ঠিক পাশেই আরেকটি ছোট্ট ফলক রয়েছে। যা দেখে বোঝার কোন উপায় নেই এটিতে এক সময় কি লেখা ছিল!

এ ছাড়া সেখানে রয়েছে ছিনতাইকারী আর মাদকাসক্তদের রাজত্ব। দিনের বেলা যেমন তেমন, সন্ধ্যা হলেই এই এলাকা হয়ে ওঠে অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য। প্রায় প্রতিদিনই সেখানে ঘটছে চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা। গাছের নিচে ও ঝোপঝাড়ে বখাটেদের আড্ডা চলে। সেই সাথে চলে মাদক সেবন ও জুয়ার আসর। রাত হলেই সেখানে আগমন ঘটে ভাসমান যৌনকর্মীদের। উদ্যানজুড়ে ময়লা আবর্জনার ভাগাড়। হকারদের উপদ্রব। দশনার্থীদের নিরাপত্তা নেই। তেমনি মলমূত্রের গন্ধে গোটা উদ্যান ঘুরে বেড়ানো কষ্টকর। ভাসমান মানুষের বসবাস বিভিন্ন অংশে। উদ্যানে অন্তত ৫০টি পরিবারের বসবাস। দেখভালের জন্য কিছু নিরাপত্তাকর্মী থাকলেও তাদের তৎপরতা চোখে পড়ে না। এতে করে উদ্যানের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে মারাত্মকভাবে।

১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জেল থেকে মুক্তির পর এই ময়দানেই নাগরিক সংবর্ধনা দিয়ে তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি তৎকালীন আওয়ামী লীগ এই রেসকোর্স ময়দানে এক মহাসমাবেশের আয়োজন করে। তখন জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দলের নির্বাচিত সদস্যরা বাংলার মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা না করার অঙ্গীকার করেন। এর দুই মাস পর ৭ মার্চ সেখানে এক ঐতিহাসিক জনসভায় ভাষণ দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই সমাবেশ থেকেই তিনি মূলত স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে দেন। বঙ্গবন্ধুর অমর বাণী ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বাংলার মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সৈন্যরা আত্মসমর্পন করে এই ময়দানে। এখানেই বাংলাদেশের বিজয়ের দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এর পরের বছর ১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই এক জনসভায় বক্তব্য দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী।

১৯৯৭ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হাজির হয়েছিলেন বিশ্ব-নেতৃবৃন্দ। সেদিন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলা, ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট ইয়াসির আরাফাত ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট সুলেমান ডেমিরেল এই ঐতিহাসিক উদ্যানে পা রেখেছিলেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা যে রেসকোর্স ময়দান থেকে এসেছিল, সেটার আজকের বেহাল দশা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বাধীনতার পক্ষের বিশিষ্টজনেরা। স্বাধীনতার স্মৃতি রক্ষা, নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিক ইতিহাস পৌছে দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দান। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন এই স্থানের রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণ। আর যদি তা না করা হয় তাহলে হয়তো একদিন কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে বাঙালী জাতির উত্থানের গৌরবময় ইতিহাস। কারণ সেই ইতিহাসের সূচনা দ্বারই ছিলো এই রেসকোর্স ময়দান।    

 

বাংলা ইনসাইডার/এসএ