ঢাকা, শনিবার, ২৩ মার্চ ২০১৯, ৯ চৈত্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

পৃথিবীতে যত কালজয়ী ভাষণ

অর্চি হক
প্রকাশিত: ০৭ মার্চ ২০১৯ বৃহস্পতিবার, ০২:০৪ পিএম
পৃথিবীতে যত কালজয়ী ভাষণ

কথা তো আমরা সবাই বলি। ভাষণও দেন অনেকে। প্রতিদিনই পৃথিবীজুড়ে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বক্তৃতার তুবড়ি ছোটান নেতারা। কিন্তু ক’টা ভাষণ পারে, একটি জাতির ভবিষ্যৎ বদলে দিতে? ক’টা বক্তৃতা পারে, স্থান-কালের সীমা ছাড়িয়ে সর্বজনীন হয়ে উঠতে? নিঃসন্দেহেই বলা যায়, মানবজাতির ইতিহাসে এমন ভাষণের সংখ্যা খুবই কম। চলুন জেনে নিই, এমন কালজয়ী কয়েকটি ভাষণের কথা-

‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ (৭ মার্চ, ১৯৭১) - বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বাঙালি জাতির উদ্দেশ্যে এক অনন্য ভাষণ দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই ভাষণটি বাঙালী জাতিকে পরাধীনতার শিকল ছিড়ে মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে উজ্জীবিত করেছিল। এ কারণেই মাত্র ১৮ মিনিটের এই ভাষণটিকে স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার ভিত্তিমূল বলা হয়।

‘স্বাধীনতা অর্জনের কোনো সহজ পথ নেই’ (২১ সেপ্টেম্বর, ১৯৫৩)- নেলসন ম্যান্ডেলা

বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের পথিকৃৎ নেলসন ম্যান্ডেলা ১৯৫৩ সালের ২১ সেপ্টেম্বর যে বক্তৃতাটি দিয়েছিলেন তা শুধু নিজ দেশের জন্য নয়, বরং সারা বিশ্বের  স্বাধীনতাকামী জনগণের জন্য আলোকবর্তিকা। ম্যান্ডেলা ২১ সেপ্টেম্বরের এই বক্তৃতা শুরু করেন ১৯১২ সাল থেকে কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর চলমান শ্বেতাঙ্গদের নির্যাতনের কথা দিয়ে। ওই বক্তৃতায় ম্যান্ডেলা শত প্রতিকূলতার মধ্যেও জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিজেদের শক্তি সম্পর্কে সচেতনতাকে এক বিজয় বলে উল্লেখ করেন। তবে সবচেয়ে বড় বিজয় বা স্বাধীনতার কথা বলতে গিয়ে ম্যান্ডেলা বলেন,  ‘স্বাধীনতা অর্জনের কোনো সহজ পথ নেই।’ তার এই বাণীটিই পৃথিবীর ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।

‘সরকার; জনগণের, জনগণের দ্বারা এবং জনগণের জন্য’ (১৯ নভেম্বর, ১৮৬৩)- আব্রাহাম লিংকন

যুক্তরাষ্ট্রের ষোড়শ রাষ্ট্রপতি আব্রাহাম লিংকনের মাত্র তিন মিনিটের ভাষণটিই পৃথিবীর ইতিহাসে অক্ষয় হয়ে আছে। ১৮৬৩ সালের ১-৩ জুলাই তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়ার গেটিসবার্গে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে প্রায় আট হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। তাদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধে যুদ্ধের প্রায় চার মাস পর এক স্মরণসভায় লিংকন ২৭২ শব্দের এই ভাষণটি দেন। অদ্ভুত বিষয় হলো, ওই স্মরণসভায়  মূলবক্তা ছিলেন বাকপটু অ্যাডওয়ার্ড এভার্ট। তিনি প্রায় দুই ঘণ্টা বক্তৃতা করেন। কিন্তু সেটা ছাপিয়ে অমর হয়ে আছে লিংকনের ৩ মিনিটের ভাষণটি। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ফটোসাংবাদিক এবং ফটোগ্রাফাররা তাদের ক্যামেরা সচল করার আগেই তিনি বক্তৃতা শেষ করে ফেলেন। যারা স্বাধীনতা ও সবার মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমেরিকা মহাদেশের গোড়াপত্তন করেন তাদের স্মরণ করে ভাষণ শুরু করেন লিংকন। এরপর গৃহযুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি উল্লেখ করেন। সবশেষে তিনি সেই ঐতিহাসিক উক্তিটি করেন, যা গণতন্ত্রের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সংজ্ঞা হিসেবে বিবেচিত। তিনি বলেন— ‘সরকার; জনগণের, জনগণের দ্বারা এবং জনগণের জন্য’। শোনা যায়, তার এই বক্তব্যের পর বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে উপস্থিত জনতা। এমনকি তারা হাততালি দিতেও ভুলে যান।

‘আমি স্বপ্ন দেখি’ (২৮ আগস্ট, ১৯৬৩) - মার্টিন লুথার কিং

মার্টিন লুথার কিংয়ের আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম বা আমি স্বপ্ন দেখি ভাষণটি কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা জাতি নয়, বরং সারা বিশ্বের বর্ণবাদবিরোধী এবং সাম্যবাদী মানুষের জন্য এক অনবদ্য কবিতা বলা চলে। যেদিন এই লুথার কিং এই ভাষণটি দিয়েছিলেন, সেদিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন শহর এক মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়। লিংকন স্কয়ারের উত্তাল জনসমুদ্রে একে একে বক্তব্য রাখেন সব নেতারা। সবশেষে আসেন মার্টিন লুথার কিং। ভাষণে তিনি শ্বেতাঙ্গদের বৈষম্যমূলক আচরণ আর কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর নির্যাতন ও বঞ্চনার কথা কথা তুলে ধরেন। এরপরই তিনি বলতে শুরু করেন সেই অমর বাণী- আমি স্বপ্ন দেখি, এই স্বপ্নগাঁথা জড়িয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্তিত্বে।  আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন এই জাতি জাগ্রত হবে এবং মানুষের এই বিশ্বাসের মূল্যায়ন করবে যে, সব মানুষই জন্মসূত্রে সমান।

‘ভারত ছাড়’ (৮ আগস্ট, ১৯৪২)- মোহনদাস করম চাঁদ গান্ধী

১৯৪২ সালের ৮ আগস্ট মোহনদাস করম চাঁদ গান্ধী যিনি মহাত্মা গান্ধী নামেই সমধিক পরিচিত, তৎকালীন বোম্বের গাওলিয়া ট্যাক ময়দানে ব্রিটিশদের প্রতি ভারত ছেড়ে চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বক্তৃতা দেন। এই বক্তৃতাটিই ‘ভারত ছাড়’ বা ‘কুইট ইন্ডিয়া’ বক্তৃতা নামে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। ভাষণে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘কারেঙ্গে ইয়া মারেঙ্গে’ অর্থাৎ করবো নয়তো মরবো।

বাংলা ইনসাইডার/এএইচসি/এমআর