ঢাকা, রোববার, ২৬ মে ২০১৯, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

‘নারী দিবস’ কতটা যৌক্তিক?

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৮ মার্চ ২০১৯ শুক্রবার, ০৮:০৭ এএম
‘নারী দিবস’ কতটা যৌক্তিক?

আমরা সবসময়ই বলি, পৃথিবীতে আমাদের প্রথম পরিচয় হলো আমরা মানুষ। নারী পুরুষ বা তৃতীয় লিঙ্গের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ থাকা উচিত নয় বলেও শোরগোল তুলি আমরা। কিন্তু এই আমরাই আবার নারীদের জন্য আলাদা করে একটা দিবস পালন করি। নারী পুরুষ যদি সমানই হবে তাহলে নারীদের জন্য আলাদা দিবস কেন?

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, সভ্য অনেক দেশে নারীদের ভোটের অধিকার পেতে লড়তে হয়েছে। বাড়ির বাইরে গিয়ে কাজ করতেও সংগ্রাম করতে হয়েছে তাদের। এখনকার নারীরা কাজের এই সব অধিকারগুলোই ভোগ করছে। কিন্তু তারপরও কোথায় যেন একটা বাঁধা রয়েই গেছে। সমাজে নারীরা এখনও অনেকটা দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিকের মতো। পুরুষের ইচ্ছাটাই যেন এখানে শেষ কথা।

আমাদের ধারনা এমন যে, সমাজের শিক্ষাবঞ্চিত পিছিয়ে পড়া পরিবারগুলোতেই বোধয় নারীদের বৈষম্যের শিকার হতে হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তথাকথিত শিক্ষিত এবং আধুনিক পরিবারগুলোতে এই বৈষম্যের চিত্র আরও প্রকট।

কম-বেশি প্রায় সব পরিবারেই আমরা দেখি, একটা ছেলে যখন চাকরী করতে যায়, তার বাসা থেকে কেউ প্রশ্ন করে না যে, কেন চাকরি করছো, অফিসে কি কাজ করতে হবে কিংবা অফিসের পরিবেশটা কেমন? কিন্তু একটা মেয়ে যখন চাকরি করতে যায়, তাকে শত প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব দিয়ে তবেই কর্মক্ষেত্রে যেতে হয়। মেয়েটা যখন বিবাহিত হয়, তখন তাকে স্বামীর অনুমতি নিয়ে চাকরি করতে হয়। ব্যাপারটা এমন যে, পুরুষই তার অভিভাবক, নারী একটা কৃতদাস মাত্র।

একটা পুরুষ যদি ভালো কাজ করে তবে তরতর করে তার প্রমোশন হয়। কেউ এটা নিয়ে কোনো প্রশ্ন করে না। সবাই তাকে বাহবা দেয়। অথচ একটা মেয়ে যখন তার কর্মক্ষেত্রে সফল হয় তখন তার বিরুদ্ধে কুৎসা রটতে সময় লাগে না। একজন নারী সফলতার শীর্ষে পৌছলেই সেটাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে রাখা হয়।

একটা ছেলে যখন সারাদিন কাজ শেষে রাতে বাসায় ফেরে, তখন বাসার সকলেই তার যত্ন-আত্তিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ধরেই নেওয়া হয় যে, সে অনেক পরিশ্রম করে বাড়িতে ফিরেছে। কিন্তু একটা মেয়ে যখন একটু দেরী করে বাসায় ফেরে তখন হাজারটা প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় আর তিরস্কারের বন্যা তো আছেই। তাকে শুনতে হয়, ক’টা টাকাই বা বেতন, শুধু শুধু এতো দেরি করে বাড়ি ফেরার মানেটা কি? কিন্তু ছেলের ক্ষেত্রে কখনই এই প্রশ্নটা আসে না যে, অল্প কিছু টাকা বেতনের জন্য এতো পরিশ্রম কেন?

একটা ছেলে অফিস শেষে বাসায় ফিরে চিন্তামুক্ত হয়ে বিশ্রাম নেয়। অথচ সেই একই কাজ করে বাসায় ফেরা মেয়েটিকে হয়তো ঢুকে পড়তে হয় রান্নাঘরে। একটা পুরুষ যখন চিন্তামুক্তভাবে শুধু অফিসের কাজেই মনোনিবেশ করে, তখন একজন নারীকে অফিসের কাজের পাশাপাশি বাড়ির হাজারটা বিষয় নিয়েও ভাবতে হয়।  

অনেক পরিবারে চিত্রটা আবার একটু ভিন্ন। মেয়ে চাকরি করতে পারবে তবে সেটা নিঝঞ্ঝাট সরকারি চাকরি হতে হবে। আমাদের ধারনাটা এমন যে, কোনো চ্যালেঞ্জিং কাজ মেয়েদের জন্য নয়। মেয়েরা ঝামেলাহীন পদে দায়িত্ব পালন করবে আর সারাটা সময় পরিবার নিয়েই মাথা ঘামাবে। তার কোনো নিজস্বতা থাকতে পারবে না। পরিবারই তার জীবন হতে হবে। পরিবার এবং অফিস একসঙ্গে সামাল দিতে পারলেই সে সফল, অন্যথায় নয়। 

মেয়েরা শুধু যে পরিবারেই এতোটা বৈষম্যের মুখোমুখি হয়, তা কিন্তু হয়। কর্মক্ষেত্র যেন মেয়েদের জন্য আরেক রণাঙ্গন, যেখানে তাকে প্রতিটা মূহুর্ত পুরুষ সহকর্মীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করতে হয়। একটা ছেলে যখন কাজে ব্যর্থ হবে তাকে হয়তো দু’একটা কটু কথা শুনতে হয়, ব্যাস। কিন্তু একটা মেয়ে একটু খারাপ করলেই তাকে শুনতে হয়, ধুর মেয়ে তো, এদের দিয়ে কাজ হয় না। আবার অনেক অফিসে তো বিবাহিত নারী কর্মী ‘নট অ্যালাওড’।

একটা নারীকে কতগুলো বাধা পেরিয়ে তবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। পরিবার আর কর্মক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে সে যখন নিজের যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত হয়, তখনও আরেক ঝামেলা এসে পড়ে। প্রশ্ন উঠে যায়, কী করে সে এখানে পৌছালো, নিশ্চয়ই তাকে গোপন কোনো বিষয়ে ছাড় দিতে হয়েছে। 

আমাদের যে পুরুষ শাসিত সমাজ, এখানে নারীদেরকে আমরা দেখি একটা অলংকার হিসেবে। নারীদের কোনো ঘর থাকতে পারবে না। সে কেবল অন্যের দখলেই থাকতে পারবে। কখনো বা-বাবা কখনো বা স্বামীই তার ভবিষ্যৎটাকে ঠিক করে দেবে। ধর্ম যা-ই হোক না কেন, নারীরা যেন সবখানেই বঞ্চিত।

একবিংশ শতাব্দিতে এসেও একজন নারীকে আমরা নারী হিসেবেই দেখি, মানুষ হিসেবে নয়। এ জন্যেই হয়তো পুরুষশাসিত সমাজের ঠিক করে দেওয়া একটা দিনকেই আমরা নারী দিবস হিসেবে উদযাপন করি। যেখানে আমরা নারীকে মানুষ হিসেবেই দেখতে পারছি না, সেখানে এই নারী দিবস পালন কি শুধুমাত্র মেকি একটা উপলক্ষ নয়?

বাংলা ইনসাইডার/এএইচসি