ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ মে ২০১৯, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

নারীরাও ব্যবহৃত হচ্ছেন নারী হেনস্থায়, কেন?

জান্নাতুল ফেরদৌসী
প্রকাশিত: ১৩ মে ২০১৯ সোমবার, ০৯:৩০ পিএম
নারীরাও ব্যবহৃত হচ্ছেন নারী হেনস্থায়, কেন?

‘এই শুয়ারের বাচ্চা, বোবা সাজছস তুই? তুই বোবা? তুই তো জানোয়ার? তোরে যে আমি এখন কী করমু! কুত্তার বাচ্চা, ঘরে বউ পোলাপান নাই? এই জানোয়ার তোর দি মাইয়া আছে। এই তোর লজ্জা শরম নাই নাকি? এই শুয়ারের বাচ্চা, বোবার ভান ধরো? এহনই তোরে আধলা ইটটা দিয়া বাড়ি দিয়া মাথাডা ফাটায়া দিমু।’

একজন শ্রমিক শ্রেণীর নারী হাতে আধলা ইট নিয়ে এক ভিক্ষুককে একনাগাড়ে এইভাবে বকেই যাচ্ছে। ভিক্ষুক খুব নিচু গলায় কথা বলছে, আস্তে আস্তে নারীটিকে থামানোর চেষ্টা করছে, সেই অজুহাতে হাতটা একটু ছোঁয়ার চেষ্টা করছে। নারীটি আবার তার হাতে থাকা সেই আধখানা ভাঙা ইট নিয়ে গর্জে উঠছে দ্বিগুণভাবে! দু’একজন লোকও জড়ো হয়েছে। কাছে গিয়ে সেই নারীকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘খালা কী হইছে?’

‘আর কইয়েন না আপা, ওই হারামজাদা বসিলা বস্তিত থাহে, আমার পাশের বাড়িতই থাহে। অর বউ পোলাপান আছে। বাড়িত দেহা হইলে কতাই কয় না আর এইহানে পায়া এই জানোয়ার বেডা আমার গায়ে আত দিছে আপা!’

শুনে থ মেরে গেলাম, ইচ্ছা করলো কষে একটা চড় দিই সেই বোবার ভান ধরা নির্লজ্জকে। কিন্তু কী লাভ? বোবা হোক, ভিক্ষুক হোক সে হলো পুরুষ! উল্টে যদি আমাকেও কিছু করে এই ভয়ে আমাদের আর কিছু করা হয় না। বোবা, ভিক্ষুক, বধির, অন্ধ এসব বৈকল্য সত্ত্বেও একজন পুরুষ কেবল পুরুষ হওয়ার কারণে আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম। আর আমি কেবল নারী হওয়ার কারণে সবল হয়েও নিজের উপর, নিজের মা বোনের উপর ঘটে যাওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে অক্ষম।

এটা তো রাস্তার ঘটনা, উঁচুতলার ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান-স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, বাসা, পার্ক, বাস, ট্রেন, প্লেন কোথায় নিরাপদ নারী? সার্বক্ষণিক একটা সন্ত্রস্ত  মানসিকতা নিয়ে দিন কাটায় প্রতিটি নারী। কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে সেখানেও পেতে রাখা হয় নারীর জন্য বিশাল ফাঁদ!

২০১৭ সালের ২৭ মার্চ। রাজধানীর বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া দুই বান্ধবীকে তাদের এক বন্ধু দাওয়াত করে অন্য বন্ধুর জন্মদিনের পার্টিতে। যার জন্মদিন তাকেও এই দুই বান্ধবী কিছুটা জানতো। তিনি হলেন আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে শাফাত আহমেদ। মূলত সেদিন তার জন্মদিন ছিল না। এই দুটি মেয়ের জন্য সেদিন জন্মদিনের সাজানো নাটকের আড়ালে বনানীর রেইনট্রি হোটেলে ভীষণ পাকা হাতের ফাঁদ পাতা হয়েছে। সে রাতেই দুই বান্ধবীকে নেশা জাতীয় কিছু পান করিয়ে হোটেলে আটকে রেখে ধর্ষণ করা হয়।

৬ মে ২০১৭ তে বনানী থানায় ধর্ষণের অভিযোগে একটি মামলা করেন এই ছাত্রী।  তখন তার সঙ্গে থাকা আরেক বান্ধবীও ছিলো। এই ঘটনায় মামলার প্রধান সাক্ষীই ছিলো শাফাত আহমেদের স্ত্রী যাকে ওই ছাত্রী সেদিন খালাত বোন পরিচয় দেন। গত ২৯ নভেম্বর শাফাত আহমেদ জামিনে ছাড়া পায়। আর ছাড়া পাওয়ার পরই মামলার প্রধান সাক্ষী ফারিয়া মাহবুব নিজের বোল পাল্টে ফেলেন। তিনি এখন বলছেন যে, মামলাকারী ওই ছাত্রী তার খালাত বোনই নন, তার বাড়িও ঢাকায় নয়, তিনি মূলত চট্টগ্রামের মেয়ে। তিনি আরও বলেছেন যে মুক্তি পাওয়ার পর  শাফাত আহমেদ তাকে বাদীর সঙ্গে কথা চালাচালির কিছু স্ক্রিনশট দেখিয়েছে। তাতে ফারিয়া মাহবুবের মনে হয়েছে আসামীর সঙ্গে বাদির সুসম্পর্ক ছিল।

এখন প্রশ্ন হলো সুসম্পর্ক থাকলেই কি কারো সঙ্গে জোরপূর্বক সেক্সুয়াল মুভমেন্টে যাওয়া যায়? আর এই নারী? যিনি নিজের মুখে স্বীকারোক্তি দিয়ে এখন কথা বদলে ফেলছেন? কীভাবে এসব সম্ভব সবই সমাজের প্রত্যেকজন মানুষ জানে। আর এই যে বোল পাল্টে ফেলা মেয়ে একেও হয়তো সবাই এখন গালাগাল করবো আমরা,  ‘কী বাজে মেয়ে কথা ঠিক রাখতে পারলো না!’ মূলত বিষয়টা এখানে না, বিষয়টা হলো এই ফারিয়া মাহবুব হলেন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ক্রীড়নক। আর বাদী দুই ছাত্রী হলো শিকার!

এভাবেই সকল ক্ষেত্রে কখনো আর্থিক ক্ষমতার বলে, কখনো রাজনৈতিক ক্ষমতার বলে, কখনো শারীরিক ক্ষমতার বলে, কখনো বা আবার সংখ্যাগরিষ্ঠতার অজুহাতে প্রতিনিয়ত পার পেয়ে যাচ্ছে অসহায় নারীর উপর যৌন হেনস্থাকারীরা।  

কয়েকদিন আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড় শিল্পী মিলার একটি নিউজে- ‘নগ্ন অবস্থায় বাথরুমে শিল্পী মিলাকে নির্যাতন।’ বেচারি মিলা তার ক্ষমতাসীন স্বামীর অত্যাচারের কোনো বিচার তো পেলোই উল্টো নিউজে ব্যবহৃত শব্দে ভীষণ হাসির পাত্র হয়ে উঠলো। এই যে নিউজ হেডলাইন এটা একজন সাংবাদিকের কাজ। সাংবাদিককে সমাজে সবচেয়ে বেশি সচেতন ও নিরপেক্ষ হিসেবে ভাবা হয়। অথচ একটা মেয়ে এবং আরো দশটা মেয়ের আইডল মিলা, তাকে উদ্দেশ্য করে তার দুঃসময় বর্ণনার সুযোগ নিয়ে একজন সাংবাদিকের এভাবে হেনস্থামূলক নিউজ শিরোনাম আমাদের সমাজের কোন দিককে চিহ্নিত করে?

আবৃত্তিকার মাহিদুল ইসলাম মাহির নামেও ‘মি টু’ আন্দোলনে অংশ নিয়ে একটি মেয়ে যৌন হেনস্তার শিকার বলে অভিযোগ তুলেছে কিন্তু শিল্পী কোঠায় পার পেয়ে গেছে সকলের প্রিয় মাহি ভাই। কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি কর্তৃপক্ষ। কবি- শিল্পী- সাহিত্যিক- শিক্ষক- চিন্তাবিদ-দার্শনিক কারো কাছেই যেন মূল্যবোধ বলে আর কিছু বাকি নেই। সকলে মিলে যেন হামলে পড়ছে, যেন পারলে গিলে খায় প্রতিটি নারীকে।

দেশে তো এসব যৌনহেনস্থা, ধর্ষণ, উত্ত্যক্তকরণ, এসবের বিরুদ্ধে আইনের অভাব নেই। কিন্তু কেউ সেই আইনকে বিন্দুমাত্র ভয় পাচ্ছে না। ৮ দিনে ৪১টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু কারোই বিচার হয়নি। ৮ বছরে ৪ হাজার ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে বিচার হয়েছে মাত্র ৫ জনের। এই যদি হয় জরিপ, তাহলে মানুষ কেন আইনকে ভয় পাবে? কেবলমাত্র আইন করেই কি দেশের বিচারব্যবস্থা চোখ বন্ধ করে ঘুমাচ্ছে?

দিনেদুপুরে ধর্ষণ করে ঘাড় মটকে মৃত্যু নিশ্চিত করে বাস থেকে ফেলে দিয়ে চলে যায় নারী যাত্রীকে। কোনো বিচার নেই, নুসরাতকে পুড়িয়ে মারে মাদরাসার প্রিন্সিপ্যাল, কোথায় বিচার? তনুকে ধর্ষণ করে নৃশংসভাবে হত্যা করে ফেলে রাখে ক্যান্টনমেন্টের জঙ্গলে, কী বিচার হলো? কীভাবে বাবার বয়েসী, ভাইয়ের বয়েসীরা একটি শিশুর প্রতি লোভী হয়ে ওঠে? কোন পাশবিকতা একটি শিশুকে ছিড়ে খেতে বাধ্য করে একজন মানুষকে? আর এই পাশবিকতা কোথা থেকে এতোটা উস্কানি পাচ্ছে? এই পাশবিকতার গ্লানিটুকুও কেড়ে নিচ্ছে কে?

জঘন্য অন্যায় করে আবার সেই অন্যায় থেকে বেঁচে যাওয়ার জন্য আরও অন্যায় করতে কে ইন্ধন যোগায় আমাদের পুরুষদেরকে, আমাদের দেশের পুরুষদের এই দুরাবস্থা কেন? কেন আমাদের ভাইয়েরা, বন্ধুরা, বাবারা, আরও বয়স্ক নানা-দাদারা, আমাদের কাঙ্ক্ষিত প্রেমিকেরা হয়ে ওঠে আমাদের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রেমিক, কেন আমাদেরকে ভালো না বেসে আমাদের উপর হামলে পড়ছে তারা? এর জন্য কি কেবল পুরুষ দায়ী? নাকি সামাজিক ব্যবস্থা যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে আমাদের ছেলেদেরকে মূল্যবোধহীন করে তুলছে? নাকি যথাযথ শিক্ষার অভাব? কোথায় সমস্যা, কী কারণে পুরুষরা এমন হামলে পড়ছে আমাদের নারীদের উপর?

আবার আমাদের মেয়েদের হেনস্থা করতে, হত্যা করতে, শেষ করে দিতে মেয়েদেরকেই ব্যবহার করছে। নারী হয়ে নারীকে বিপদে ফেলতে কেন আরেকটি নারীর মূল্যবোধ জাগ্রত হচ্ছেনা? সমাজ ব্যবস্থার কোন ফাঁকফোকর গলে বেরিয়ে যাচ্ছে এসব নারীদের মানবিকতা? কারো সঙ্গে শত্রুতা, জমি নিয়ে দ্বন্দ্ব, কাউকে কোথাও থেকে সরাতে হবে, সমস্ত কিছুর সহজ সমাধান যেন যৌন হেনস্থা বা ধর্ষণ। মেয়েটিই কেনো সবকিছুতে বাজেভাবে ব্যবহৃত হয়? অথচ আজ থেকে ১০/১৫ বছর আগেও নারীরা যৌতুকের জন্য যতোটা নিপীড়িত ছিলেন লৈঙ্গিক নির্যাতনে ততোটা নিপীড়িত ছিলেন না। যতই ইন্টারনেট, এবং সোস্যাল সাইটের স্মার্টনেস বাড়ছে ততোই আমাদের দেশের মেয়েরা যেন বাঘের থাবার নিকটে গিয়ে পড়ছে। পৃথিবীর সব দেশেই ইন্টারনেট আছে, স্মার্ট সোশ্যাল সাইটের আরও বেশি স্মার্ট ব্যবহার আছে, কই সেসব দেশে তো মেয়েরা এমনভাবে জবরদস্তির শিকার হচ্ছেনা! আমাদের সমাজব্যবস্থা কি এই স্মার্টনেস হজম করতে পারছেনা? দেশে আইন আছে কিন্তু আইনের প্রয়োগ নেই, বিচার ব্যবস্থা আছে কিন্তু সাধারণ জনগণ, অসহায়-ভুক্তভোগী জনগণ বিচার পাচ্ছে না, অন্যায়কারীই বরং বিচারের সুযোগ গ্রহণ করে। সেটাই বা কীভাবে সম্ভব হচ্ছে? মানুষের ন্যূনতম মানবিকতা, মূল্যবোধের কোনো প্রমাণ কি সমাজের এইসব জঘন্য ঘটনাগুলো বহন করছে? সুশীলসমাজ কী উত্তর দেবে এসব ঘটনার?

 

বাংলা ইনসাইডার