ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ মে ২০১৯, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

নাকবা: ফিলিস্তিনিদের সব হারানোর দিন আজ

জান্নাতুল ফেরদৌসী
প্রকাশিত: ১৫ মে ২০১৯ বুধবার, ০৮:০০ এএম
নাকবা: ফিলিস্তিনিদের সব হারানোর দিন আজ

জাতিসংঘ প্যালেস্টাইনে আরবদের জন্য একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যে অঞ্চলটি বরাদ্দ করেছিল, এই যুদ্ধের পর তার অর্ধেকটাই চলে যায় ইসরায়েল বা ইহুদীদের দখলে। ফিলিস্তিনের জাতীয় বিপর্যয়ের শুরু সেখান থেকে। এটিকেই তারা বলে `নাকবা` বা বিপর্যয় দিবস।

প্রায় সাড়ে সাত লাখ ফিলিস্তিনিকে পালিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিতে হয় এসময়। ইহুদী বাহিনী তাদেরকে বাড়ি-ঘর থেকে উচ্ছেদ করে। পরে ১৯৬৭ সালের জুন মাসে আরব ও ইসরাইলের মধ্যে আবারও যুদ্ধ হয় এবং সেসময় জর্ডান নদীর পশ্চিম তীর ও গাজা ভূখণ্ড থেকে আরো হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়ে। বর্তমানে প্রায় ৫০ লাখ ফিলিস্তিনি জাতিসংঘে শরণার্থী হিসেবে নিবন্ধিত। তাদের বেশির ভাগই বাস করে জর্ডান,গাজা ভূখণ্ড পশ্চিম তীর, সিরিয়া, লেবানন এবং পূর্ব জেরুজালেমে। তাদের এক-তৃতীয়াংশ বসবাস করে শরণার্থী শিবিরগুলোতে।

এই সংঘাতের সুচনা বহু আগে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তুর্কী অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙ্গে পড়ে। তখন যে লিগ অব নেশন` গঠিত হয়েছিল, সেটিই বিশ্ব সংস্থার পক্ষ থেকে ব্রিটেনকে `ম্যান্ডেট` দেয়া হয় প্যালেস্টাইন শাসন করার।

অন্যদিকে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইউরোপে বসবাসকারী ইহুদীরা ব্যাপক বিদ্বেষ-নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। সেখান থেকেই `জাওনিজম` বা ইহুদীবাদী আন্দোলনের শুরু। তাদের লক্ষ্য ছিল ইউরোপের বাইরে কেবলমাত্র ইহুদীদের জন্য একটি রাষ্ট্র পত্তন করা।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যখন চলছিল তখন ব্রিটেন আরব এবং ইহুদী, উভয় পক্ষের কাছেই নানা রকম প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল প্যালেস্টাইন নিয়ে। কিন্তু এসব প্রতিশ্রুতির কোনটিই ব্রিটেন রক্ষা করেনি।পুরো মধ্যপ্রাচ্য তখন ভাগ-বাটোয়োরা করে নিয়েছিল ব্রিটেন আর ফ্রান্স।

সেই সময় প্যালেস্টাইন বা ফিলিস্তিন ছিল, মুসলিম, ইহুদী এবং খ্রিস্টান এই তিন ধর্মের মানুষের কাছেই পবিত্র ভূমি হিসেবে বিবেচিত। ফলে ইহুদীবাদী আন্দোলন দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ইউরোপের ইহুদীরা দলে দলে প্যালেস্টাইনে গিয়ে বসত গাড়তে শুরু করে। কিন্তু তাদের এই অভিবাসন স্থানীয় আরব এবং মুসলিমদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করে। সেসময় আরব এবং মুসলিমরাই ছিল সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ। প্যালেস্টাইনে তখন আরব জাতীয়তাবাদী এবং ইহুদীবাদীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত শুরু হয়। ইহুদী এবং আরব মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে।

এদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যেভাবে লাখ লাখ ইহুদীকে হত্যা করা হয় (হলোকাস্ট) তার পর ইহুদীদের জন্য একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় চাপ বাড়তে থাকে। ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অধীনে থাকা এই ফিলিস্তিন অঞ্চলটি তখন ফিলিস্তিনি আর ইহুদীদের মধ্যে ভাগ করার সিদ্ধান্ত হয়। এই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই ১৯৪৮ সালের ১৪ই মে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসরায়েল।

এই নাকবা দিবসও তখন থেকেই পালিত হয়ে আসছে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে। প্রতিবছরই ফিলিস্তিনিরা এই নাকবা দিবসে প্রতিবাদ বিক্ষোভের আয়োজন করে। দিবসটি উপলক্ষে তারা জড়ো হয় ইসরায়েলি সীমান্তের কাছে। এবং দিনটিকে ঘিরে ইসরায়েলের সাথে ফিলিস্তিনিদের তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। নাকবা দিবসকে কেন্দ্র করে দুবার বড়ো ধরনের সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

ফিলিস্তিনিদের নাকবা দিবসের প্রধান দাবি- তাদের জমিতে ফিরে যাওয়ার অধিকার। এই দাবির ভিত্তি হচ্ছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ১৯৪৮ সালে গৃহীত এক প্রস্তাব। সেখানে বলা হয়েছে, "যেসব শরণার্থী তাদের বাড়িতে ফিরে যেতে চাইবে এবং প্রতিবেশীদের সাথে শান্তিতে বসবাস করবে তাদেরকে সেখানে যাওয়ার অনুমতি দিতে হবে।"

ইসরায়েলের বক্তব্য -৫০ লাখ শরণার্থীকে ফিরিয়ে নেওয়া অসম্ভব। কারণ সেরকম কিছু হলে তারাই ৮৫ লাখ জনসংখ্যার দেশটিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে পড়বে এবং ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের সমাপ্তি ঘটবে। বিশ্ব ইসরায়েলের পক্ষ নিয়ে চুপচাপ আছে, যার ফলে ফিলিস্তিনিদের ১৫মে নাকবা দিবস পালনও শেষ হচ্ছেনা!

বাংলা ইনসাইডার/জেএ