ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ মে ২০১৯, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

নির্জনতার কবি এমিলি ডিকিনসন

জান্নাতুল ফেরদৌস
প্রকাশিত: ১৫ মে ২০১৯ বুধবার, ০৯:০৫ এএম
নির্জনতার কবি এমিলি ডিকিনসন

“আমি কেউ নই,তুমি কে?”

উক্তিটি বিখ্যাত আমেরিকান নারী কবি এমিলি ডিকিনসনের।
১৭ বছর বয়সী একজন তরুণীকে মাসাচুসেটসের সাউথ হেডলিতে অবস্থিত মাউন্ট হলিওক ফিমেইল সেমিটারিতে পড়াশোনার উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানে যেয়েই বাড়ির জন্য তার প্রচণ্ড মন খারাপ হতে থাকে। সবসময় বিগড়ে থাকতে শুরু করে তার মানসিক অবস্থা। এসব কারণে সেখানকার মেরি লিওনের সঙ্গে একদিন তার মতভেদ ঘটে এবং মেরি লিওনেল তাকে বেশ অপমান করে। এই ঘটনার পর তার মানসিক অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায় এবং তিনি আরো বেশি ঘরকাতুরে হয়ে ওঠেন। এই ঘরকাতরতা থেকে ধীরে ধীরে তিনি শারীরিক অসুস্থতায়ও আক্রান্ত হন। পরে তিনি বাড়িতেই ফিরে আসেন সব ছেড়েছুড়ে। আর বাড়িতে এসেই তার প্রথম কবিতা লেখেন। এই খাপছাড়া একগুঁয়ে একাকীত্বপ্রেমী তরুণীটিই হচ্ছেন আমেরিকার বিখ্যাত নারী কবি ‘এমিলি ডিকিনসন’।

১৮৩০ সালের ১০ ডিসেম্বর আমেরিকার ম্যাসাচুসেট্সের একটি বনেদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এমিলি ডিকিনসন। তার বাবা এডওয়ার্ড ডিকিনসন ছিলেন অ্যামহার্স্ট শহরের একজন খ্যাতিমান আইনজীবী।
ছোট্ট এমিলি ছিলেন খুবই শান্ত স্বভাবের মেয়ে। সঙ্গীতের প্রতি তার ছিল আসক্তি। শুনতে ভালোবাসতেন খুব। প্লিজ্যান্ট স্ট্রিটের দোতলা প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি করা হয়েছিল তাকে। কারণ তার বাবা চেয়েছিলেন মেয়েটি পড়াশোনা করে ভালো কোনো ব্যবসায় মনোনিবেশ করবে। অল্প বয়সেই এমিলি বিভিন্ন বিষয় শেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। যেমন ক্লাসিক সাহিত্য,ভারগিল ও লাতিন, গণিত,ইতিহাস ও উদ্ভিদবিজ্ঞান।

১৮৪০ সালে এমিলি ও তার বোন লাভিনিয়াকে ভর্তি করা হয় অ্যামহার্স্ট একাডেমিতে- যেটি তাদের ভর্তির দু’বছর আগেও একটি বয়েজ স্কুল ছিল। তারা ছিলেন বিজ্ঞানী ও থিওলজিয়ান এডওয়ার্ড হিচককের তত্ত্বাবধানে। এর মধ্যেই প্রতিশ্রুতিশীল শিক্ষার্থী এমিলি প্রমাণ করেছেন নিজের মেধা ও অধ্যবসায়।
উনিশ শতকের আমেরিকার কবিদের মধ্যে দু’জনকে প্রকৃতই কবি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একজন ওয়াল্ট হুইটম্যান, অন্যজন এমিলি ডিকিনসন। এমিলি ডিকিনসন তার কবিতায় ভাঙা ছন্দ, ড্যাশ চিহ্ন, যত্রতত্র বড় হাতের অক্ষর ব্যবহারের মাধ্যমে নিজস্ব প্রকাশরীতির জন্য আজ বিশ্বব্যাপী খ্যাত। আমেরিকার স্কুলে অহরহ এমিলির কবিতা পড়ানো হয়। স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে সে দেশের সব ধরনের মানুষ এমিলি ডিকিনসনের নাম ও লেখার সঙ্গে পরিচিত।

আমেরিকার যে কোনো লাইব্রেরিতে গেলে এমিলি ডিকিনসনের ওপর শ’খানেক বই পাওয়া যাবে। তারপরও তার ওপর অনুসন্ধান করে চলেছেন পণ্ডিতরা। এমিলি ডিকিনসন প্রায় ১ হাজার ৮০০ কবিতা লিখেছেন। তার মধ্যে ১০-১২টি কবিতা তার জীবদ্দশায় ছাপা হয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর পরে ছোট বোন লাভিনিয়া তাঁর কাজগুলো খুঁজে পান। তাঁর প্রথম কবিতা ১৮৯০ সালে টমাস ওয়েটভর্থ হগিনসন এবং মেবেল লুমিস টডদের দ্বারা ছাপা হয়। টমাস এইচ জনসন কোন ধরনের সম্পাদন ছাড়া তাঁর কবিতাগুলো ১৯৫৫ সালে "দ্য পয়েমস অফ এমিলি ডিকিনসন" প্রকাশ করেন। উনিশ শতক এবং বিংশ শতাব্দীর আগেও তারা প্রতিভা যত্ন না করা হলেও, তিনি এখন সারা বিশ্বে অন্যতম একজন কবি হিসেবে স্বীকৃত।

তাঁর কবিতার ধরণ ছিল ব্যতিক্রম। সেগুলো ছোট ছোট বাক্যের মধ্যে থাকতো। যেখানে না থাকতো টাইটেল, এমনকি কবিতার মধ্যে কিছু যতিচিহ্ন বা বর্ণ ব্যবহার করা হতো। তাঁর কবিতার মধ্যে মৃত্যু এবং অমরত্ব এই দুইটি ভাবের প্রকাশ ঘটতো। এমনকি বন্ধুদেরকে চিঠি লেখার সময়ও এই দুইটি ভাব লক্ষণীয় ছিল।

যে অন্তর্জগৎ তাকে জীবন সম্পর্কে লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছিল- সেই অন্তর্জগতের ভিত গড়ে উঠেছে সত্যকে জানার অদম্য আকাক্সক্ষা, প্রেম ও মৃত্যুচিন্তা থেকে। আর পাশাপাশি দুটি বাড়ি, যে বাড়িতে এমিলি ডিকিনসন থাকতেন এবং তার পাশের বাড়ি যেখানে তার ভাই অস্টিন ও তার পরিবার বাস করতেন- এ দুটি বাড়ির মধ্যেই এমিলি ডিকিনসন তার জীবন ও চলাফেরা সীমিত রেখেছিলেন। কারণ তিনি পছন্দ করতেন নির্জনতা।

এমিলি ডিকিনসনের মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন ধরে দুটি বাড়িই স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক মিউজিয়াম হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছিল। ২০০৩ সালে অ্যামহার্স্ট কলেজের অধীনে এ দুটি একত্রিত করে সৃষ্টি হয় এমিলি ডিকিনসন মিউজিয়াম। এ মিউজিয়ামের দুটি ভাগ। দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। একটি হোমস্টেড বা খামারবাড়ি, যেখানে এমিলি থাকতেন এবং এভারগ্রিনস, যে বাড়িটিতে এমিলির ভাই ও তার পরিবার বাস করতেন। এ বাড়ির মাধ্যমে এমিলির সঙ্গে অ্যামহার্স্টের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ঘটত।

বাংলা কবি জীবনানন্দ দাশের মতো নির্জনতম আমেরিকান এই নারী কবি এমিলি ডিকিনসনের আজ মৃত্যুদিন। ১৮৮৬ সালের ১৫ মে মাত্র ৫৫ বছর বয়সে মারা যান এমিলি ডিকিনসন।