ঢাকা, সোমবার, ১৪ জুন ২০২১, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

একজন বদলে যাওয়া নারী

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৭ মে ২০১৯ শুক্রবার, ০৯:০০ পিএম
একজন বদলে যাওয়া নারী

ছোট্ট মেয়ে হাসু! চমৎকার হাসিমুখে সরলতা, সাহস আর স্পষ্টভাষীতা জ্বলজ্বল করে। ১৯৫৪ সাল। তিনি গ্রামের বাড়ি টুঙ্গি পাড়া থেকে তাঁর পরিবারের সাথে ঢাকার মোগল টুলির রজনী বোসলেনের বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। পরে তাঁরা মিন্টো রোডের সরকারি বাসভবনে উঠেন এবং ১৯৫৬ সালে তিনি টিকাটুলির নারীশিক্ষা মন্দির বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এরপর অবশ্য তাঁরপরিবার ১৯৬১ সালের ১ অক্টোবর থেকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে থাকা শুরু করেন।

ছোট্ট মেয়ে হাসুর এন্ট্রান্স পাশ হয়ে গেলে বাবা তাঁর জন্য নিয়ে আসেন একজন রাজপুত্তর, বিয়ে হয়ে যায় হাসুর। তাঁর স্বামী পরমাণু গবেষক, বিদেশ থেকে ডিগ্রী নিয়ে এসেছেন। আবার গবেষণার কাজে স্ত্রীকে নিয়ে উড়াল দেন বিদেশে। তখন তাঁর দ্বাদশ শ্রেণীর পড়াশোনা চলছে ফাইনাল দেয়ার জন্য।

এমনই একটি দিনে, তখন তাঁরা বেলজিয়ামে। পরদিন তাঁদের ব্রাসেলস থেকে প্যারিস যাওয়ার কথা বোন-শেখ রেহানাকে সহ। তখনও ঘুম ভাঙ্গেনি কারো, তাঁরা তখন অবস্থান করছিলেনবেলজিয়ামে তখনকার বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের বাড়িতে। সানাউল হকের স্ত্রীর ডাকেই ঘুম ভাঙ্গে তাঁদের এবং জানতে পারেন তাঁদের জীবনের সব থেকে খারাপ সংবাদটি এবংবাঙালি জাতির ইতিহাসে সব থেলে কালো অধ্যায়ের খবর। আর সেটি হলো , ১৯৭৫সালের ১৫আগস্ট বাংলাদেশ ও দেশের বাইরের স্বাধীনতা বিরোধী একটি চক্র গভীর এক ষড়যন্ত্রের অংশহিশেবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার সংবাদ।

আর এই ছোট্ট সরল মতি হাসুই হলো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আওয়ামীলীগ সভাপতি শেখহাসিনা। তিনি বাঙালি জাতির পিতা ও বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতিবঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বড়কন্যা। দেশের বাইরে থাকার কারণে তিনি ও তাঁর ছোটো বোন শেখ রেহানা ঘাতকদের হাত থেকে প্রাণে বেঁচে যান।

এরপর কোথাও অবহেলা, কোথাও বঞ্চনা, কারো কাছে শত্রু হিসেবে আবার কারো কারো খেলার পুতুল হিসেবে পলাতক জীবনযাপন করতে হয়েছে তাঁদের দুইবোনকে প্রায় ছয় বছর। এ সময়একমাত্র ভারত সরকার তাঁদের বিশ্বস্ত আশ্রয় হিসেবে ছিলো। কেননা বাংলাদেশের তখনকার সামরিক সরকার এই দুই বোনের দেশে ফিরে আসার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।

১৯৮১ সালে ফেব্রুয়ারির ১৪, ১৫ ও ১৬ তারিখে আওয়ামীলীগের কাউন্সিলে শেখ হাসিনাকে  বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সভানেত্রী করা হলে ঐ বছরেরই ১৭ মে তারিখে সরকারি নিষেধাজ্ঞাঅমান্য করে তিনি বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। এই সবহারানো দুঃখী মেয়েটির বাংলার বুকে পা রাখার দিনে বাংলার প্রকৃতিও কেঁদেছে তার সঙ্গেই অঝোরে।

দ্বাদশ শ্রেণীর একজন পরিবার হারানো নারী ৬বছরের মাথায় ১৯৮১ সালে হয়ে উঠলেন একটি দেশের একটি প্রধানতম রাজনৈতিক দলের সভাপতি। সেই ১৯৮১ সাল থেকে ২০১৯সাল পর্যন্ত তিনিই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি আছেন।  এর মধ্যে পুরোটাই যে সাফল্যের গল্প তা কিন্তু নয়, বহু চড়াই উৎরাই পেরিয়ে তবেই তিনি আজকের এই জায়গায় এসেছেন।

এর মধ্যে তাকে হত্যা করার চেষ্টা হয়েছিল বহু বহুবার, ২১আগস্ট গ্রেনেড হামলায় দলের বহু নেতা- কর্মী- সমর্থক আহত ও নিহত হয়েছেন, ভাগ্যক্রমে শত্রুর লক্ষ্য ভেদ করে তিনি বেঁচেরইলেন।  মূলত বাঙালির জন্য বাংলাদেশের জন্য তাঁর যেই ত্যাগ এবং বাংলাদেশকে পৃথিবীর বুকে পরিচিত করে তোলার বঙ্গবন্ধুর যে স্বপ্ন, তা পূরণের জন্য তিনি এক দীপ্ত শপথে পথেনেমেছিলেন । সেই স্বপ্ন পূরণের আগে তাকে সরিয়ে দেয়ার সাধ্য কারোই নেই। কেননা প্রকৃতি সৎ উদ্দেশ্যকে হেরে যেতে দেয়না।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশে এসেছিলেন যে অবস্থায়, তাতে তাঁকে নিয়ে তখনকার কেউই ভীত ছিলোনা। তখনকার সামরিক সরকার জিয়াউর রহমান এই দুঃখ বুকে চেপে রেখে ছুটেচলা অগ্নিকন্যার বাংলাদেশে ফিরে আসাকে যেন পাত্তাই দিলেন না। তাদের মনেই হয়েছিল এই মেয়ে যদি কিছু করেও সেটা হলো সারাজীবন বিরোধীদল হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে চিৎকার-চেঁচামেচি! তাই তাঁকে তারা খুব বেশি গুরুত্ব দিচ্ছিলো না। কিন্তু এই বীরকন্যা চেঁচামেচি করেছেন তাদের কানের কাছে যেয়ে যারা বাংলাকে পিষে মারছে, চিৎকার করেছে্ন বাবারহত্যাকারীদের বিরুদ্ধে এবং সর্বোপরি বাংলাদেশকে শাসনের ভার নিয়েছেন নিজের কাঁধে।

আজ তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। যেন লালন পালন করছেন একটি দেশকে ও তার জাতিকে যেমন করে তাঁর বাবা – বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান করতেন। একজন স্ত্রী, ও একজন মা থেকেতিনি হয়ে উঠেছেন একটি দেশের সরকার। তার এই বদলের গল্পের পেছনে আছে অনেক অনেক কষ্টের ইতিহাস, অনেক অনেক সংগ্রামের ইতিহাস, অনেক অনেক ত্যাগ ও না পাওয়ারইতিহাস। এই বদল তিনি চাননি তাকে করতে হয়েছে পরিস্থিতির কারণে। হয়তো মন দিয়ে পড়াশোনা আর ঘরকন্যাটাই তিনি করতেন। কোনোদিন তিনি হয়তো ভাবেনইনি বাবার স্বপ্নের পথ পাড়ি দিতে হবে তাকে নিজেকেই।

কিন্তু যখন তিনি বুঝে গেলেন তার জীবনের মোড় ঘুরে গেছে, সহজে স্বাভাবিকতায় তার জীবন আর বয়ে চলবেনা,  তিনি তখন সংগ্রামকেই বেছে নিয়েছেন একমাত্র পথ হিশেবে।

যেকোনো দেশেই রাজনীতি মানে ভাবা হয় কৌশলিক জ্ঞানের চর্চা, ধূর্ততা, চাটুকারিতা ইত্যাদির সমন্বয়। কিন্তু আওয়ামী সভাপতি ও বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাররাজনীতিতে এসব নয়, বরং সত্যবাদিতা এবং স্পষ্টবাদিতাই তাকে করে তুলেছে বাংলার জনগণের কাছে এতোটা প্রিয়। তিনি যেন রাজনীতির পদ্ধতি ও  এর ভাষা এর চেহারাই বদলেফেলেছেন। তিনি যেমন কঠিন, অনঢ় তেমনি সবচেয়ে সরল, উদার, মায়ের মতন আদরণীয়।

আজ বঙ্গবন্ধুর এই দুঃখী কন্যার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। এদিনে তিনি করুণমুখে, একবুক অভিমান নিয়ে যেন বাঙ্গালির জন্য আলোকবর্তিকা হাতে ফিরে এসেছেন বাংলার মাটিতে।

 

বাংলা ইনসাইডার