ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ আগস্ট ২০১৯, ৮ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bagan Bangla Insider

ভারতবর্ষের আধুনিকতা রামমোহনেরই সৃষ্টি

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ২২ মে ২০১৯ বুধবার, ০৭:৫৯ এএম
ভারতবর্ষের আধুনিকতা রামমোহনেরই সৃষ্টি

"Raja Ram Mohan Roy was the only person in his time  in the world to realise completely the significance of modern age." রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

আধুনিক ভারতবর্ষের নির্মাতা হিসেবে পরিচিত সমাজসংস্কারক রাজা রামমোহন রায় সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ উদ্ধৃত মন্তব্যটি করেন।  

 ১৭৭২ সালের ২২ মে রাজা রামমোহন রায়ের জন্ম। আজ তার জন্মদিন!

বাংলার রাধানগরের একটি সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম হয়েছিল তার।তাঁর বাবার নাম রামকান্ত রায় বাহাদুর বন্দ্যোপাধ্যায়। তার নাম রামমোহন, উপাধি রাজা এবং পৈতৃক পদবি রায়। ইংল্যান্ড গমনের সময় দিল্লির সম্রাট দ্বিতীয় আকবর ১৮৩১ সালে তাকে ‘রাজা’ উপাধিতে ভূষিত করেন। তিনি ১৮৩৩-এর ২৭ সেপ্টেম্বর ব্রিস্টলে মৃত্যুবরণ করেন।

তিনি যখন জন্মেছেন তখন ইংরেজদের কাছে পলাশীর প্রান্তরে বাংলার সুলতানদের দুইশ বছরের জন্য পরাজয়ের সেই যুদ্ধ- পলাশীর যুদ্ধের পনেরো বছর শেষ। ভারতবর্ষ তখন ঔপনিবেশকতার বেশ চাঙ্গা বাজার, যেখানে বিকিয়ে যাচ্ছিল শিক্ষিত কিছু উচ্চবিত্ত ভারতবাসীও। আর বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তখন চলছিলো রেনেসাঁ যুগ। বলা যায় নিউটন পরবর্তী যুগ এবং এ সময় পশ্চিমের লোকজন শিল্প-কারখানা সৃষ্টির প্রয়াসের মাধ্যমে নিজেদেরকে বিজ্ঞানের দিক থেকে নানানভাবে উন্নত করার চেষ্টা করে যাচ্ছিল। এই আধুনিক পৃথিবী গড়ে ওঠার যুগসন্ধিক্ষণে জন্মলাভ করা রামমোহনকে তৎকালীন ব্রাহ্মণ সমাজের প্রথানুসারে বাবার নির্দেশে নয় বছর বয়সের মধ্যেই  বিয়ে করতে হয়েছিল তিনবার!

গুরুর পাঠশালায় তার পড়াশোনার হাতে-খড়ি হয়। পরে তিনি পাটনাতে আরবি ও পারসি, এবং কাশিতে সংস্কৃত ভাষায় শিক্ষা লাভ করেন। পরে তিনি সংস্কৃত, আরবি, ফারসির পাশাপাশি ইংরেজি, হিব্রু, গ্রিক, সিরীয় ভাষায়ও পাণ্ডিত্য লাভ করেন।

তিনি যখন পাটনায় পড়াশোনা করতে যান তখন আরবি ভাষা শেখার প্রয়োজনে তাকে কোরআন পড়তে হয়েছিল। কোরআন পড়ে তিনি প্রথম মূর্তিপূজার উপর বীতশ্রদ্ধ হয়েছিলেন। এমনকি এ বিষয়ে তিনি একটি বইও লিখে ফেলেন। মূর্তিপূজার বিরুদ্ধতায় পারসি ভাষায় রচিত তার এ গ্রন্থের প্রকাশ তার বাবা মেনে নিতে পারেনি। তিনি তাকে ত্যাজ্যপুত্র করেন।

তখন রামমোহন মাত্র ষোল বছর বয়েসী যুবক। পিতার সঙ্গে এই মনোমালিন্যে তিনিও খুব বেদনাহত হলেন। ঠিক করলেন ফকির সন্ন্যাসীদের সঙ্গে তীর্থে তীর্থে ঘুরে বেড়াবেন, করলেনও তাই। ঘুরতে ঘুরতে তিনি যখন তিব্বতে পৌছালেন তখন তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে নানা প্রকার কুসংস্কার ও পৌত্তলিকতার প্রসার ছিল। তিনি এসবের প্রতিবাদ করেন। তখন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়, পরে তিনি পালিয়ে কাশীতে চলে আসেন। এখানে এসেই তিনি সংস্কৃত ও ইংরেজি ভাষা শেখেন।

ইংরেজি ভাষা শেখার মাধ্যমে ১৮০৫সালে তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে চাকুরি গ্রহণ করেন। এ সময় রংপুর কালেক্টরেটে জেলা কালেক্টর মি. ডিগবির অধীনে তাকে দেওয়ানের কাজ করতে হতো। ১৮১৪সাল পর্যন্ত তিনি এই চাকুরিটিতেই ছিলেন। ১৮১৪সালে তিনি এই চাকুরি ছেড়ে দেন এবং স্থায়ীভাবে কলকাতায় বসবাস শুরু করেন। এ সময়েই ধর্ম ও সমাজ সংস্কারের কাজে তিনি আগ্রহী ও সাহসী হয়ে ওঠেন।

সাহসী তো বলাই উচিত, কেননা তিনি ঔপনিবেশিক ভারতের উন্নয়নে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন এবং কাজে লাগিয়েছেন ইংরেজদেরকে। নিজের জীবনে অতিবিবাহের বিড়ম্বনা থেকে তিনি যেমন বহুবিবাহ প্রথার প্রতি বিরক্ত ছিলেন তেমনি মারাত্মকভাবে ঘৃণা করতেন হিন্দু সমাজের সতীদাহ প্রথা! এই প্রথা সেই গুপ্ত যুগেরও পূর্বে থেকে চলে আসছিল হিন্দুদের মধ্যে। স্বামী মারা গেলে স্ত্রীকেও জোর করে পুড়িয়ে মারা হতো। বলা হতো এতে পূণ্য হয়, কিন্তু মূলত বিধবার সম্পত্তি দখল করার জন্যই তাকেও হত্যা করা হতো আগুনে পুড়িয়ে।  কতো শতশত বিধবাকে যে এভাবে জোর করে স্বামীর চিতায় তুলে হত্যা করা হয়েছে তার কোনো হিসেব নেই। রামমোহন এই প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন।

তখন ১৮২৫, অক্টোবর মাস চলছিল। কলকাতায় একটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। একজন ব্যক্তি নিহত হন সেই হত্যাকাণ্ডে। ওই ব্যক্তির চিতায় ওর স্ত্রীকেও পুড়িয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত দেয় হিন্দু সমাজ এবং তাই করা হয়। খবরটি ইংরেজদের কানে পৌঁছালে ইংরেজরাও খুব অবাক হয় এবং তারা খুব ক্ষুদ্ধও হয়। তখন রামমোহন রায় অ তার অনুসারীরা পূর্বের চেয়ে আরো জোর আন্দোলনে নেমে পড়েন। রামমোহন সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে বই রচনা করেন এবং এই বই পড়ে ইংল্যান্ডেও সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে ওঠে।

প্রবল আন্দোলনের মুখে গভর্নর বুঝতে পারেন সতীদাহ প্রথা হুট করে বন্ধ ঘোষণা করলে যেমন হিন্দু সমাজ ক্ষেপে উঠবে তেমনি রদ না করলেও আন্দোলন থামবে না, তা ভয়ংকর রূপ নেবে। এসময় বাংলার গভর্নর ছিলেন লর্ড হামহাস্ট। ঘটনার এই দ্বৈত স্বরূপ বুঝতে পেরে তিনি এ সময় কৌশলে কিছু আইন প্রণয়ন করেন। যেমন, কোনো সহগমনার্থীনি বিধবাকে স্বামীর দেহের সঙ্গে ছাড়া অন্য কোনোভাবে দগ্ধ করা যাবে না। সহগমনার্থীনি বিধবাদের স্বয়ং ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে এসে অনুমতি নিতে হবে সহমরণের জন্য। অন্যের দ্বারা দরখাস্ত দিয়ে অনুমতি নিলে চলবে না। সতীর সহমরণে সহায়তাকারী কোনো ব্যক্তি সরকারি চাকরি পাবে না। সহমৃতার কোনো সম্পত্তি থাকলে সরকার তা বাজেয়াপ্ত করে সরকারি সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করবে।

এই আইনে তৎক্ষণাৎ হিন্দুদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও এভাবেই ধীরে ধীরে বন্ধ হয় হিন্দু বিধবাকে আগুনে পুরিয়ে মারার জঘন্য নিয়ম সতীদাহ প্রথা!

এছাড়াও রামমোহন রায় হিন্দু মুর্তি পূজাকে অবিশ্বাস করে নিজস্ব চিন্তা থেকে নিরাকার ব্রহ্ম উপাসনাই শ্রেষ্ঠ উপাসনাতে নিজে যেমন বিশ্বাস ও চর্চা করা শুরু করেন তেমনি তিনি এটি প্রচারও করেন। তার তত্ত্বাবধানেই গড়ে ওঠে ব্রাহ্ম সমাজ। এই ধর্ম সংস্কারের কারণে তিনি হিন্দু ও খ্রিস্টানদের প্রবল বিরোধিতার মুখোমুখি হন। তার নামে ছড়া বানিয়ে কুৎসা রটনা করতেও ছাড়েনি এই ধর্মগুরুরা।