ঢাকা, বুধবার, ১৯ জুন ২০১৯, ৫ আষাঢ় ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

নরসিংদীর বিপ্লবী সোমেন চন্দ

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৪ মে ২০১৯ শুক্রবার, ০৮:০২ এএম
নরসিংদীর বিপ্লবী সোমেন চন্দ

তখন বোধহয় থার্ডইয়ার। নরসিংদীতে ঘুরতে গেলাম কাকার সাথে। কাকা ওখানেই পড়াশোনা করেছেন। তাই আমাকে দেখাতে নিয়ে গেলেন কেমন শহরে তিনি তার কৈশোর ও যৌবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন।

প্রথমেই তিনি নিয়ে গেলেন একটা বইয়ের দোকানে। সেটাকে বলছে লাইব্রেরী! আমি আপত্তি করলাম, এটা তো বইয়ের দোকান, লাইব্রেরী তো এমন না, সেখানে তো বসে পড়া যায়, বই কিনতে হয়না। কাকা তখন বুঝিয়ে বললেন যে, এই বই বিক্রির দোকানে যেমন ছাত্রদের প্রয়োজনীয় একাডেমিক বই বিক্রি হয় তেমনি এই দোকানে এমন অনেক বই আছে যা কেউ চাইলে কিনতেও পারে আবার না চাইলে এখানে বসে পড়তেও পারে। এমনকি কেউ চাইলেই এখানে এসে বসে এই দোকানের মালিকের সাথে আলাপও করতে পারে নানান বিষয়ে।

আমি অবাক হলাম। দোকানের মালিক হলেন একজন কলেজ শিক্ষক। আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন কাকা, খব রসিকতার সাথে পরিচিত হচ্ছিলেন আর কোথা থেকে খুঁজে বের করে দিলেন একটা ম্যাগাজিন! আমি অবাক হলাম, কাকার দিকে তাকালাম। চোখে চোখে বললাম এখন ম্যাগাজিন পড়বো? কাকাও অনুচ্চারিত ইশারায় বললেন, আরে, পড়েই দেখোনা!

খব বিরক্ত নিয়ে পাতা উল্টালাম। প্রচ্ছ্বদে একজন কবির ছবিসহ ম্যাগাজিনের শিরোনাম ছিলো এরকম- বিপ্লবী কবি সৌমেন চন্দ!

ভেতরে ঢুকলাম ম্যাগাজিনটির। পুরোটা না পড়ে আমি আর কাউকেই কিছু বলতে পারলাম না।পড়া শেষে যখন মুখ তুলে তাকালাম দেখলাম, কাকা এবং সেই দোকানের মালিক দুজনেই হাসছেন আমার দিকে তাকিয়ে। দোকানির নাম নাজমুল হোসেন সোহাগ- তিনিই প্রথমে বলতে শুরু করলেন “শোনো নরসিংদী ঘুরতে আসছ আর সোমেন চন্দ রে চিনবা না, জানবা না, এটা হইতে পারেনা। তাইলে তোমার নরসিংদী বেড়ানোই বৃথা!”

আমি সম্মতিসুচক ঘাড় নেড়ে চলে এলাম। কিন্তু পুরো নরসিংদী ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম আর কেবলই ভাবছিলাম একজন মানুষ বিপ্লব করবে বলে তাকে এতো লোমহর্ষকভাবে খুন করা যায়!মূলত কাগজে কলমে লিখিত আছে সোমেন চন্দ দুর্বৃত্তদের হাতে ধারালো অস্ত্রে খুন হয়েছেন। কিন্তু নরসিংদীর তরুণরা জানে আরো বিস্তৃতভাবে।

সোমেন চন্দ একজন বিপ্লবী কবি এবং বিশালার্থে সাহিত্যিকই। কেননা তার রচিত উপন্যাস, গল্প কোনোটিই তার কবিতার চেয়ে কিছু কম নয়। তিনি অশ্বিনীকুমার দত্তের কাছে তার প্রাথমিকের পড়াশোনা শেখেন। এরপর ঢাকার পোগোজ হাইস্কুলে ভর্তি হন মাধ্যমিকের জন্য। সেটা শেষ করে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা মিটফোর্ড মেডিকেল স্কুলে। কিন্তু অসুস্থতার কারণে অল্পকিছুদিন পরেই তিনি পড়াশোনায় ইস্তফা দেন।

সাম্যবাদে বিশ্বাসী একদল মানুষদের দ্বারা পরিচালিত ঢাকার জোড়পুল লেনের প্রগতি পাঠাগার ছিল তার পাঠাগারে পড়ার অভ্যাস গড়ার পেছনে অন্যতম। এই পাঠাগারে পড়াশোনা করেই সোমেন চন্দ বাংলা সাহিত্যে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ধীরে ধীরে তিনি কার্ল মার্কসের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এবং এই আগ্রহ থেকেই  ১৯৩৭ সালে সোমেন সরাসরি কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। আন্দোলনে যুক্ত হলে প্রগতি পাঠাগারের কর্তৃপক্ষ ১৯৩৮ সালে কমিউনিস্ট পাঠচক্রের এই সম্মুখ প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনার দায়িত্ব দেন সোমেন চন্দকে। পরিবারসহ তখন তিনি পুরান ঢাকার দক্ষিণ মৈশণ্ডিতে থাকতেন।

সোমেন চন্দ জন্মগ্রহণ করেন ১৯২০ সালের ২৪ মে। আজ তার জন্মদিন!

ঢাকার পার্শ্ববর্তী বুড়িগঙ্গার পশ্চিম পাড়ে শুভাড্ডা ইউনিয়নের তেঘরিয়া গ্রামে, মামার বাড়িতে তিনি জন্মলাভ করেন। তবে অনেকেই বলেন তার জন্ম নরসিংদী জেলার আশুলিয়া গ্রামে।  তাঁর বাবার নাম নরেন্দ্রকুমার চন্দ,আর মায়ের নাম হিরণবালা। চার বছর বয়সে তার মা তাকে ছেড়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।  তার দেখাশোনার জন্য বাবা আরেকটি বিয়ে করলেন। বাবা-মায়ের সাথে সোমেন শৈশব কৈশোরে পুরান ঢাকার তাঁতিবাজারে ছিলেন।

তিনি রণেশ দাশগুপ্তের মতন একজন বড় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্য পেয়েছেন এবং রণেশ দাস গুপ্তই তাকে দেশে বিদেশের বিখ্যাতসব লেখকদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। সেখান থেকেই তার লেখালেখির আগ্রহ সৃষ্টি হয়। ১৯৩৭ সালে ১৭ বছর বয়সে সাপ্তাহিক ‘দেশ’পত্রিকায় প্রকাশ পায় সোমেন চন্দের প্রথম গল্প ‘শিশু তপন’।

এরপর আর থামেনি কখনো তার কলম। লিখে গেছেন শোষণপিড়ীত মানুষের পক্ষে এবং তিনি না লেখায় না তার ব্যক্তিগত জীবনে কখনোই ছাড় দেননি অন্যায় অত্যাচারকে। শোষণমুক্ত মানুষের সমাজ গড়াই ছিলো তার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য যা বাস্তবায়ন করার আগেই শোষকরা হত্যা করে শেষ করে দেয় এই তাজা প্রাণের সোল্লাস!

১৯৪২ সালের ৮ মার্চ সমাজতান্ত্রিক পার্টির কর্মীরা তাঁর ওপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালায়। শহীদ হন সোমেন চন্দ। হত্যা করেই ক্ষান্ত দেয়নি তারা হাত পা কেটে তার শরীর থেকে আলাদা করে লাশটিকে বিকৃত করে ফেলে দিয়েছিল রাস্তায়!

বাংলা ইনসাইডার