ঢাকা, বুধবার, ১৯ জুন ২০১৯, ৫ আষাঢ় ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

তবু আমারে দেবো না ভুলিতে...

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৫ মে ২০১৯ শনিবার, ০৫:১২ পিএম
তবু আমারে দেবো না ভুলিতে...

কোনো এক অস্থির সময়ে তার জন্ম। বেড়ে ওঠা জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে। জীবনের প্রতিটি উপলব্ধি কার কাছে খুব স্পষ্ট করে ধরা দিয়েছিল। খুব কাছ থেকে তিনি উপলব্ধি করেছেন সবার মানব মনকে। প্রেম, ভালোবাসা আর বিদ্রোহকে কাছ থেকে দেখেছেন, ধারণ করেছেন। এজন্য তিনি অনন্যসাধারণ। তিনি আমাদের প্রেমের কবি, বিদ্রোহের কবি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। জন্মদিনে তার জন্য অসংখ্য বিনম্র শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা। 

নজরুলের জন্ম চরম দারিদ্রের মধ্যে। শিশুকাল থেকেই তাকে ঘিরে ছিল দারিদ্রের অভিশাপ। নিজেই জোগাড় করেছেন নিজের ক্ষুধার অন্ন। হয়তো এ কারণেই তার গানে, কবিতায় শোভা পেত সাম্যের কথা, অসাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যহীন এক সমাজের কথা। তিনি হয়ে উঠেছিলেন গণমানুষের কণ্ঠস্বর। হয়ে উঠেছিলেন আজন্ম বিদ্রোহের প্রতীক। সেই বিদ্রোহ তার ভেতরের প্রেম ভালোবাসাকে কখনো আড়াল করতে পারেনি। তার গানে আর কথায় সেই মাখানো ভালোবাসার স্বাদ আমরা আজও পাই। তিনি চলে গেলেও হারাবেন না কখনো। আজ আমাদের আলোচনার উপজীব্য নজরুলের লেখায় প্রেমের সান্নিধ্য।

প্রিয় মানুষ হারানোর পরে বেদনা, তাকে ফিরে পেতে ইচ্ছে করা, বার বার না চাইতেও তার কথা মনে পড়ার অনুভূতি আমরা তো কতভাবেই প্রকাশ করি। কখনো ভেতরে ভেতরে গুমরে মরি। কিন্তু সে চলে গেছে বলে কি গো স্মৃতি ও হায় যায় ভোলা বা তাহারই আসার আশায় রাখি মোর ঘরের সব দ্বার খোলা- এমন বাক্যব্যয়ে তো আর বাকিদের বোঝাতে পারি না। তিনি বুঝিয়েছেন, আমরা বোঝাই তার কথার মাধ্যমেই। 

আলগা করো গো খোপারও বাঁধন... নাহলে মনপ্রাণ ফেঁসে যাওয়ার যে মধুর প্রেমের উপাখ্যান তিনি রেখে গেছেন, প্রেমকে এমনভাবে প্রকাশ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। প্রেম তো সবার জীবনেই আসে, কিন্তু এমন প্রকাশ করতে পারে কয়জনে? 

আজীবন আপন মানুষ খুঁজতেই হিমশিমে পড়ে যাই আমরা প্রতিটি মানুষ। সেই আকাঙ্ক্ষাটা আমাদের আজীবনই থাকে। তাই নজরুল বলে গেছেন, ‘আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন, খুঁজি তারে আমি আপনায়...’ তিনি খুঁজেছেন, প্রেম দিয়ে একেবারে মনের সেই কেন্দ্র থেকে যেখানে আপন মানুষগুলোর জন্যই হাহাকার থাকে আমাদের।

মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী

দেব খোঁপায় তারার ফুল

তখন কবি নিতান্তই প্রেমিক হিসেবে ধরা দেন। এখানে তিনি প্রেমিকাকে প্রকৃতি থেকে উপকরণ নিয়ে সাজাতে চান, হূদয়ের রাণীর ভালোবাসার স্রোতে ভেসে যেতে চান।

আবার মধ্যরাতে যখন সমস্ত কলরব থেমে যেত, প্রকৃতি হয়ে যেত নিস্তব্ধ তখন কবি মনের গহীনে ডুবে যেতেন। কোনো এক স্তব্ধ রাতে তিনি কবিতায় লিখেছিলেন—

থেমে গেছে রজনীর গীত কোলাহল

ওরে মোর সাথী আঁখি জল

এইবার তুই নেমে আয় অতন্দ্র এই নয়ন পাতায়

মোর ঘুমো ঘোরে এলে মনোহর... ঘুমের ঘোরে প্রিয়জনকে মনে করা, তার উপস্থিতি টের পাওয়া, বাস্তব জগৎ আর কল্পনার জগতে সর্বদা প্রিয় মানুষটির আনাগোনার বোধ তিনিও বুঝতেন, বোঝাতেও পারতেন। আবার তিনি যখন বলেন ‘প্রিয়, এমনও রাত যেন যায় না বৃথায় বা প্রিয় যাই যাই বলো না...’ গহীন রাতে ভালোবাসা প্রকাশের সুযোগ হাতছাড় না করার এই যে আকুতি, প্রিয়জনকে চলে যেতে না দিয়ে কাছে ধরে রাখার এই যে আকুতি তা সর্বদা আমাদের মনে বিরাজ করে, আজীবনই করবে। 

তার কথা ধরেই শেষ করতে হয়-

আমি চিরতরে দূরে চলে যাবো, 

তবু আমারে দেবো না ভুলিতে

তাকে আমরা ভুলিনি, তিনি আর তার সৃষ্টিই তাকে যুগে যুগে প্রেম আর দ্রোহের কবি করে প্রতিটা মানুষের মনের মধ্যে যত্নে তুলে রেখেছে। তার সৃষ্টি জ্বলজ্বল করবে, আগে যেমন করতো, এখনো তেমন করে। তিনি নিজেই তো একটা গানে বলে গেছেন, 

আমায় নহে গো, ভালোবাসো শুধু ভালোবাসো মোর গান। 

যার গানকে আমরা এতো গভীর বোধ থেকে ভালোবাসি, সেই কিংবদন্তী মানুষটিকে ভালেবাসবো না, স্মরণ করবো না তা কি করে হয়! নজরুল আর তার প্রেম বেঁচে রয়েছে তার প্রতিটি পংক্তিতে।  

বাংলা ইনসাইডার/এসএইচ