ঢাকা, বুধবার, ১৯ জুন ২০১৯, ৫ আষাঢ় ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

নায়ক নাকি খলনায়ক, ইতিহাস নাকি কলঙ্ক

জান্নাতুল ফেরদৌসী
প্রকাশিত: ৩০ মে ২০১৯ বৃহস্পতিবার, ০৮:০০ এএম
নায়ক নাকি খলনায়ক, ইতিহাস নাকি কলঙ্ক

জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বীরউত্তম খেতাবপ্রাপ্ত একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং একসময়ের রাষ্ট্রপতি। তিনি ১৯৭০ সালে একজন মেজর হিসেবে চট্টগ্রামে নবগঠিত অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড পদের দায়িত্ব লাভ করেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পশ্চিম পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন পূর্ব পাকিস্তানের নিরস্ত্র বাঙালীদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালায় বাংলাদেশের জনগণের এই সঙ্কটময় মুহূর্তে মেজর জিয়াউর রহমান পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করে বিদ্রোহ করেন।

সে রাতে পশ্চিম পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান বন্দী হন। সে রাতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। তিনি যুদ্ধেও দক্ষতার সঙ্গে দেশকে বাঁচানোর জন্য লড়াই করেন। যুদ্ধ শেষে তিনি বীর উত্তম খেতাব লাভ করেন। স্বাধীনতার পর পুনরায় সেনাকর্মকর্তা হিসেবে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।

এই পর্যন্ত তার যে জীবন সেটি একজন সাধারণ মানুষেরই জীবন। এরপর শুরু হয় নানান হাঙ্গামা যা বিতর্কিত করে তুলেছে এই সেনাসদস্য জিয়াউর রহমানকে।

১৯৭৫ এর মাঝামাঝিতে তাঁকে সেনাবাহিনীর উপপ্রধান করা হয় এবং এ বছরই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন পাকিস্তানপন্থী ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে যারা এদেশের ক্ষমতাকে ছিনিয়ে নেয়ার জন্য আবার হানা দিয়েছে এই দেশেই বসে।

ইতিহাস ঘাটলে জানা যায় ৭৫এর মাঝামাঝি সময়ে জিয়াউর রহমানকে কমাণ্ড থেকে সরিয়ে সেনাবাহিনীর উপপ্রধান করা হয়। শুরু হয় মোশতাক সরকারের সময়। তিনি এসময় জিয়াউর রহমানকে সেনাবাহিনী প্রধান করেন।

আসে ৭৫ এর ৩ নভেম্বর, মোশতাককে বন্দি করে তখনকার বিগ্রেডিয়ার খালেদ মোশাররফ কয়েকজন সৈনিক নিয়ে আলাদা হয়ে যায়। তারা অভ্যুত্থানের ডাক দেয়, জিয়াউর রহমান বন্দী হন। খালেদ মশাররফ সেনা প্রধানের পদে আসীন হন।

এই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অনেকটা বানচাল হচ্ছিল আরেক মহানায়কের বৈপ্লবিক পরিকল্পনা, তিনি হলেন কর্নেল তাহের। তিনি বাংলাদেশের একজন অন্তপ্রাণ মুক্তিযোদ্ধা ও সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। স্বাধীনতার পর তিনি বুঝতে পেরেছিলেন পরাধীন দেশের ঔপনিবেশিক কায়দায় গড়ে ওঠা সেনাবাহিনী কখনোই স্বাধীন দেশের জন্য যথাযথ হতে পারেনা। স্বাধীন গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার পূর্বশর্ত হিসেবে তিনি আমলাতান্ত্রিক,উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কহীন,শাসকের হাতিয়ার বাহিনীর ঔপনিবেশিক কাঠামো ভেঙে জনতার বাহিনী প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। সেনাবাহিনীর সদস্য হয়ে এ পরিকল্পনা সফল হবেনা বলে তিনি নিজে থেকেই চাকরি ছেড়ে দিয়ে যোগ দেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল বা জাসদে। তাদের ইচ্ছে ছিলো গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের। সেনাবাহিনীর অনেক সৈনিকেরাও তাদের সাথে কাজ করবে বলে কথা দেয়।তাদের দাবি ছিলো খালেদ মোশাররফকে অপসারণ। এছাড়াও কর্নেল তাহেরদের দলে ছিলো ছাত্র-কৃষকসহ অনেক সাধারণ জনতা!

পরিকল্পনা অনুযায়ী কর্নেল তাহের তাদের অভ্যুত্থান শুরু করেন এবং সেই অভ্যুত্থানের পরে দলের ভেতরে কাকে রাষ্ট্রপ্রধান করা হবে এমন প্রশ্নে কর্নেল তাহেরের মুখ থেকেই বের হয় জিয়াউর রহমানের নাম যিনি তখন বন্দি। কর্নেল তাহেরের ৭নভেম্বরের সেই অভ্যুত্থানে সসম্মানে মুক্ত করা হয় জিয়াউর রহমানকে এবং তাকে জানানো হয় সমস্ত পরিকল্পনার কথা! পরিকল্পনা মতো সবই হচ্ছিলো শধু পেছন থেকে যেন একজন কেবলই মুচকি হাসি দিচ্ছিল।

সেই মুচকি হাসির লোকটিই পরে দেশোদ্রোহীতার অভিযোগে কর্নেল তাহেরসহ তার দলের প্রায় সকলকেই বন্দি করেন, এবং বিচারহীনভাবে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেন কর্নেল তাহেরকে। এই মুচকি হাসির লোকটি তারপর বাংলাদেশের অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রপতি হয়ে ওঠেন এবং সারাদেশেই তার জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে কোন এক অজানা কারণে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর এই জিয়াউর রহমানই জাতির পিতার বড় কন্যা বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে আসার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।

এই মুচকি হাসির লোকটি একসময় পশ্চিম পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য ছিলেন। এসময়ই বোধয় তৈরি হয়েছে তার চক্ষু আড়াল করার জন্য ব্যবহৃত একটি কালো চশমার ব্যবহার। তিনি ছিলেন ভীষণ স্টাইলিস্ট-স্মার্ট একজন ব্যক্তিত্ব। সে সময়ের যুবক ছেলেদের স্টাইল আইকনও ছিলেন তিনি। সবকিছু মিলিয়ে বলা যায় তার সময়ে তিনি যেভাবেই হোক ছিলেন বেশ জনপ্রিয় একজন রাষ্ট্র নায়ক। কিন্তু এই জনপ্রিয় রাষ্ট্রনায়কেরও জীবনে অন্ধকার নেমে আসে প্রগাঢ়ভাবে আরেকটি সেনা অভ্যুত্থানেই ১৯৮১ সালের ৩০মে।

দেশের রাজনীতিতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা একজন মানুষ দিনকে দিন অনেকবেশি বিতর্কিত হয়ে উঠছেন তারই দলের নেতাকর্মীদের নানান বাহুল্য জাহিরের কারণে। ইতিহাস বিকৃত করে জিয়াউর রহমানের গঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপির নেতাকর্মীরা তাকে মহান থেকে মহান করতে যেয়ে যেন আরো বেশি ঘৃণার্হ্য করে তুলছে।

মুক্তিযুদ্ধ করেছেন সেই স্বীকৃতি তার রয়েছে, কিন্তু তিনি এই করেছেন সেই করেছেন করে যতো তার দলের নেতাকর্মীরা খৈ ফোটাচ্ছেন মুখে, আদৌ কি তিনি সেসব করেছেন? ইতিহাস বিকৃত হয়, একথা সত্য, কিন্তু ইতিহাস কখনোই চিরতরে হারিয়ে যায়না। একটি জাতি অবশ্যই তার সত্য ইতিহাস খুঁজে নেয় যতোদিন অস্তিত্ব থাকে।

আজ অনেকেই তাকে বাইচান্স মুক্তিযোদ্ধা, কর্নেল তাহেরসহ আরো কিছু দেশপ্রেমিক নেতাদের খুনী, বাংলাদেশকে পাকিস্তানীদের হাতে তুলে দিতে চাওয়া ষড়যন্ত্রকারী, জেলের আসামিদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে পাহাড়ে রেখে আসাসহ নানান ধরণের অভিযোগে অভিযুক্ত করছেন।

আসলে কোনটা সত্য? তিনি কি মূলত বাঙালি জাতির ইতিহাসে নায়ক নাকি খলনায়ক???

বাংলা ইনসাইডার/জেএফ