ঢাকা, বুধবার, ১৯ জুন ২০১৯, ৫ আষাঢ় ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

কেনো উদ্ভাসিত হননি অভিনয় ও সংগীতে দক্ষ সত্যজিৎ পত্নী?

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২ জুন ২০১৯ রবিবার, ০৯:০০ এএম
কেনো উদ্ভাসিত হননি অভিনয় ও সংগীতে দক্ষ সত্যজিৎ পত্নী?

স্বামী-স্ত্রী দুজনেই শিল্পী বা শৈল্পিক মানসের হলে অনেক সময়েই সংসারে অতিরিক্ত ঝামেলা, ঝগড়াঝাঁটি এমনকি বিচ্ছেদও হতে দেখা যায় সচরাচর। ভারতীয় উপমহাদেশে এই প্রচলন বা অনেক ক্ষেত্রে ভয়ই বলা যায়, যা অনেক বেশি। উপমহাদেশের যেকটি ভাষায় সিনেমা নির্মীত হয়, প্রায় প্রত্যেকটি ভাষায়ই এই বিষয়ক একটি অন্তত সিনেমা থাকবেই। তবে বাংলা ও হিন্দিতে এরকম প্লটনির্ভর সিনেমা একাধিক রয়েছে যেখানে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই শিল্পী, শিল্পের বিষয়ে তাদের উচ্চাকাঙ্ঙ্ক্ষা রয়েছে। কিন্তু শিল্পচর্চার চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছাতে একটা কিছু ঝামেলা হয়ে গেলো যা নিয়ে বিচ্ছেদ হয়ে যায় দুজনের।

সিনেমায় এই প্লট চলে আসে মূলত এই উপমহাদেশের মানুষেরই মন মানসিকতাকে বিচার করে। বাস্তবের শিল্পীদের ক্ষেত্রেও এরকম ঘটনা অহরহ।

বিখ্যাত ও জনপ্রিয় সিনেমা পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের স্ত্রী বিজয়া রায়! তার সম্পর্কে যেখানে যতো আর্টিকেল, গল্প জেনেছি সবগুলোতেই বলা হয়েছে যে তিনি ছিলেন, সংগীত, অভিনয়, লেখালেখি সমস্ত কিছুতেই দক্ষ। অনেকেরই একেবারে খোলামেলা অভিযোগও রয়েছে যে কেনো সত্যজিৎ রায় তাকে আরো বেশি প্রোমোট করলেন না। কেনো তার প্রতিভা বিকাশে তিনি মাধ্যম হয়ে উঠলেন না যদিও তিনি একটি বিশাল বড় প্লাটফর্ম ছিলেন তবুও!

বিজয়া রায়ের জন্ম ১৯১৭ সালে ময়মনসিংহে, কিন্তু বড় হয়েছেন পাটনায়। জন্মগতভাবে তিনি ছিলেন দাশ এবং সত্যজিত রায়ের মামাতো বোন। বিজয়া দাশের পিতার মৃত্যুর পর তিনি যে কাকার বাড়িতে আসেন,  সত্যজিতের পৈতৃক ভিটা বিক্রি হয়ে যাওয়ায় তিনি চলে আসেন সেই মামার বাড়িতেই। এ বাড়িতেই বিজয়া ও সত্যজিৎ এর প্রেম এবং লুকিয়ে বিয়ে। পরে অবশ্য একবছর পর আবার তাদের রেজিস্ট্রি ম্যারেজ হয়েছিল।

বিভিন্নসুত্রে জানা যায়, বিজয়া দাশ  ‘সন্ধ্যাএবং ‘শেষ রক্ষা’  নামক দুটি চলচ্চিত্রের নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। মুগ্ধ রবীন্দ্রনাথকে তিনি আট বছর বয়সে গান শুনিয়েছিলেন। মুগ্ধ রবীন্দ্রনাথ বিজয়াকে স্থান দিয়েছিলেন নৃত্যনাট্যে। নিজের গলায় গানও রয়েছে বিজয়া দাশের অভিনীত দুটি ছবিতেই। সন্ধ্যা  ছবিতে বিজয়ার কণ্ঠে রেকর্ড হয়েছিল ‘চাঁদের লাগিয়া হব না’, ‘হৃদয় জানে না তারে’, ‘সময়টা নয় মন্দ’। শেষ গানটি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে দ্বৈতকণ্ঠে। এ ছবির সংগীত পরিচালক ছিলেন হিমাংশু দত্ত। এছাড়াও শেষ রক্ষা  ছবির সংগীত পরিচালক অনাদি কুমার দস্তিদার স্বয়ং। এই শিল্পীর কাছেই বিজয়ার রবীন্দ্রসঙ্গীতের পাঠ। শেষ রক্ষা নামক এই ছবিতেও বিজয়ার কণ্ঠে একাধিক রবীন্দ্রসংগীত শোনা গিয়েছে। ‘মোর ভাবনারে কী হাওয়ায় মাতালো’ এবং ‘স্বপ্নে আমার মনে হল’।

কেবল গান কিংবা অভিনয় নয়, লেখালেখির ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত আগ্রহী এবং যত্নশীল। ১৯৫২ সাল থেকে ১৯৯২ এই চারদশক ধরে তিনি নিয়মিত যে ডায়রি লিখছেন তার জীবনের ঘটনাবলী নিয়ে সেসবের একটি পরিকল্পিত রূপও তিনি দিয়েছেন সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যুর পর ‘আমাদের কথা ‘ নামক আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ রচনার মাধ্যমে। এছাড়াও সত্যজিতের নিজের লেখা রহস্যগল্পগুলোর প্রত্যেকটিই তিনি স্ত্রী বিজয়াকে প্রথমে দেখিয়ে নিতেন বলে শোনা যায়।

এছাড়াও জানা যায়, বিজয়াই সত্যজিতের সিনেমার কস্টিউম পরিকল্পনা করতেন, তিনিই তার সিনেমার শিল্পীদের গান তুলে দিতেন, একটু ব্যতিক্রম চরিত্রগুলোকে তিনিই খুঁজে বের করতেন যা সহজে খুঁজে পাওয়া যেত না। পথের পাঁচালির বালক অপুকেও নাকি তিনিই খুঁজে বের করেছিলেন, প্রথম স্ক্রিন টেস্টের জন্য ‘অপর্ণা’ চরিত্রে শর্মিলা ঠাকুরকে সাজিয়েও দিয়েছিলেন তিনিই। অর্থাভাবে পথের পাঁচালি  সিনেমার শুটিং বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে এই বিজয়া দাশই নিজের সমস্ত গয়না বিক্রি করে সত্যজিতকে অর্থের যোগান দিয়েছিলেন। কিন্তু সর্বগুণে গুণান্বিতা এই নারী কেনো কেবলমাত্র তার সিনেমা পরিচালক স্বামীর কাজেই শুধু সাহায্য করে গেছেন কেনো নিজের শিল্প প্রতিভাকে ছড়িয়ে দেননি দর্শক-শ্রোতা-পাঠকদের কাছে তা আসলেই এক জটিল রহস্য!

তিনি ২০১৫সালের ২জুন মৃত্যুবরণ করেন। আজ তার মৃত্যুবার্ষিক!

কিন্তু তার প্রতিভাকে তিনি কিংবা সত্যজিৎ কেনো মানুষের কাছাকাছি নিয়ে যাননি এই বিষয়ে আগ্রহীদের গবেষণা চলমান। অনেকে মনে করেন হয়তো সত্যজিৎ রায়ের চেয়ে তিনি বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠতেন তাই তাকে সত্যজিৎ রায় এগিয়ে আসতে দেননি নিজের কাজ নিয়ে। অনেকেই আবার বলেছেন সত্যজিৎ রায়ের প্রতিভায় তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন তাই তার মনে হয়েছে নিজের গুণ প্রকাশের চেয়ে সত্যজিৎ রায়ের জীবনে কেবলমাত্র সহযোগীর ভূমিকায় থাকাই তার দায়িত্ব। আবার অনেকেই মনে করেন,  সিনেমা পরিচালক, সংসার উদাসীন স্বামী- সত্যজিতের সংসার সামলাতে যেয়ে তিনি নিজের সমস্ত ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা হারিয়ে ফেলেছেন।

আসলে কোনটা সত্য? কেনো এই রায় দম্পত্তি প্রতিভায় প্রায় সমকক্ষ হয়েও জনপ্রিয়তায় সমান নয়? কেনো সারাটাজীবন নেপথ্যেই রইলেন বিজয়া দাশ স্বামী সত্যজিতের মতো প্লাটফর্ম পেয়েও?