ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ আগস্ট ২০১৯, ৮ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bagan Bangla Insider

সারাজীবনের সমস্ত সাহিত্যেকর্মে কাফকা ছেনেছেন তাঁর জীবনকেই

জান্নাতুল ফেরদৌসী
প্রকাশিত: ০৩ জুন ২০১৯ সোমবার, ০৮:৩২ এএম
সারাজীবনের সমস্ত সাহিত্যেকর্মে কাফকা ছেনেছেন তাঁর জীবনকেই

“আমি নোংরা, মিলেনা, আমার ভেতরকার নোংরার কোনো শেষ নেই, সে কারণেই আমি শুদ্ধতা নিয়ে এত জোরে চিৎকার করি" পৃথিবীর দ্বিতীয় কোনো মানুষই বোধয় নিজের সম্পর্কে এতোটা সত্য কথা বলেননি এর আগে যেভাবে বিখ্যাত সাহিত্যিক ফ্রানৎস কাফকা বলেছেন তার প্রেমিকা মিলেনার কাছে নিজের সম্পর্কে।

হতে পারে এই নোংরা শব্দটি দিয়ে তিনি তার নিজের সত্ত্বাকে নয় বরং সকল মানুষের অভ্যন্তরীণ সত্ত্বার নোংরামোকেই নির্দেশ করেছেন, কিন্তু সেভাবে ভাবলেও বোঝা যায় কতোটা বিনয়ী তিনি ছিলেন যে মানুষের ভেতরকার সবচেয়ে নোংরামো দেখে ফেলেও তিনি কাউকেই ঘৃণা কিংবা তাচ্ছিল্য করলেন না বরং সমস্ত দায় নিয়ে নিলেন নিজের উপর। আবার এই দায় নেয়ার ভঙ্গি থেকে বোঝা যায়, তিনি মূলত ভেতরে ভেতরে নিজেকে ততোটা একা ভাবতেন না যতোটা তিনি বাস্তবে একা থাকতেন বা নিজেকে একা হিশেবে দেখতেন! বরং পৃথিবীতে তিনি নিজেকে মানুষের প্রতিনিধি হিসেবেই ভাবতেন।

বাইরে থেকে তাকে দেখলে মনে হতো ভীষণ গুটিয়ে যাওয়া একজন আত্মবিশ্বাসহীন লোক এমনই বর্ণনা রয়েছে কাফকা গবেষকদের অনেকেরই ভাষ্যে। কিন্তু আদৌ কি তিনি তা ছিলেন? এমন গুটিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাসহীন একজন ব্যক্তির পক্ষে কেমন করে তার পেশাজীবনে এতোটা সফল হওয়া সম্ভব যা তার জীবনীতে উল্লেখিত!

আবার লেখালেখির জগতে তার যে বিচরণ সেখানে তাকে স্বাভাবিক মস্তিষ্কের কোনো মানুষ বলেই মনে হয়না। সবচেয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করে জীবনকে ধাঁধাঁয় জড়িয়ে একধরণের দ্বান্দ্বিক সমাধান দিয়েছেন তিনি তার রচনাসমূহতে। তার চরিত্ররা কখনো হয়ে যাচ্ছে পোকা, কখনোবা ইঁদুরই হচ্ছে তার গল্পের চরিত্র, কখনো একজন ডাক্তারের রোগ সারাতে না পারার শাস্তি হচ্ছে রোগীর সাথে শোয়া, কখনো আবার একজন লোক যার সারাজীবনই বিচারের মধ্য দিয়ে কেটে যায় কিন্তু সে নিজেই জানে না তার অপরাধ টা কী! এমনসব চরিত্র গঠন স্বাভাবিক চিন্তার মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়!

তার একজন প্রেমিকা মিলেনা তার সম্পর্কে এমনটিই বলেছেন- “তাঁর [কাফকার] কাছে জীবন অন্যদের কাছে যেমন সেরকম মোটেই নয়…সে একদম সাধারণ জিনিসগুলোও বুঝতে পারে না…এই পুরো পৃথিবীই তাঁর কাছে একটা ধাঁধা…সে [কাফকা] মিথ্যা বলতে সম্পূর্ণ অসমর্থ"

এটি কাফকার সবচেয়ে প্রিয় এবং কাছের বন্ধু ব্রডকে লেখা কাফকার প্রেমিকা মিলেনার চিঠির কিছু অংশ! গবেষকদের ভাষায়, কাফকাকে সবচেয়ে বুঝেছিল তার এই প্রিয়বন্ধু ম্যাক্স ব্রড। কেননা তার বাবা-মায়ের সাথে তার ছিলো বোঝাপড়ার একটা বিশাল দূরত্ব! বাবাকে লেখা কাফকার একটি চিঠি থেকে জানা যায় বাবার সাথে তার মতের মিল ছিলোনা কখনোই। তার গুটিয়ে থাকা, অদ্ভুত চিন্তাভাবনার সাথে মধ্যবিত্ত একটা পরিবারকে ক্রমান্বয়ে সামনে এগিয়ে নেয়ার যুদ্ধে লিপ্ত বাবা কিছুতেই নিজেকে মেলাতে পারতেন না! তার আইন নিয়ে পড়াশোনা করা থেকে শুরু করে, প্রেম, বিয়ে না করা, আত্মবিশ্বাসহীনতা সমস্তকিছুতেই বাবাকে তার ভিলেন বলে মনে হতো। কাফকার ভাষায়, “বাবা আমার পৃথিবীর পুরো মানচিত্রের উপর শুয়ে ছিলেন। তিনি আমার জন্য খুব কম জায়গাই রেখেছিলেন

কাফকার জন্ম হয় ১৮৮৩ সালের জুলাই মাসের ৩ তারিখে তখনকার অস্ট্রো হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের চেকোস্লোভাকিয়ার প্রাগে। বোহেমিয়া রাজ্যের রাজধানী এই প্রাগে তখন তিন ধরণের ভাষাভাষী মানুষ বসবাস করতেন। কাফকার বাবা-মায়ের ভাষা ছিলো ইদ্দিস যা হিব্রু বর্ণমালায় লেখা আশেকানাজি ইহুদি মূল থেকে তৈরি হওয়া, গোঁড়া ইহুদিদের ব্যবহৃত হিব্রু ও সেমেটিক সংমিশ্রণের জার্মান ভাষার একটি রূপ। কিন্তু তখন চাকরি পাওয়ার জন্য শুদ্ধ জার্মান ভাষা জরুরী ছিলো। তাই কাফকা ও তার বোনদেরকে জার্মান ভাষাও শিখে নিতে হয়েছিল। কাফকার দাদা ইয়াকব কাফকা তাঁদের এই মধ্যবিত্ত পরিবারটিকে প্রথম ইহুদি অধ্যুষিত একটি গ্রাম থেকে তুলে আনেন এই রাজধানী শহর প্রাগে। এরপরই কাফকার বাবার এই শহরে টিকে থাকার কঠিন সংগ্রাম শুরু তিনমেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে।

কিন্তু ২য় বিশ্বযুদ্ধের নাৎসি বন্দিশিবিরে কাফকার এই তিনবোনের তিনজনই মারা যান। যুদ্ধের শুরুতেই তারা তিনজন তাদের স্বামীদের ঘর ছেড়ে বাবা মায়ের কাছে চলে আসেন কিন্তু শেষরক্ষা আর হয়না! কাফকা নিজেও যুদ্ধের জন্য বারবার ডাকের শিকার হন, কিন্তু তার কর্মক্ষেত্র থেকে তার পক্ষে বলা হয় যে তিনি এই অফিসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই তাকে আর যুদ্ধে যেতে হয়না। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তার ডায়েরিতে তিনি লিখেছেন- ‘জার্মানি যুদ্ধ ঘোষণা করেছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে, বিকেলে সাঁতার।’

তার এই নির্লিপ্ততাকে অনেকেই ভেবে নিয়েছেন তার দায়হীন মনমানসিকতার স্বরূপ হিশেবে। কিন্তু মূলত এটি ছিলো যুদ্ধের মতো বিধ্বংসী বিষয়কে পুরো পৃথিবীর নিশ্চুপ উদযাপনের যে দৃশ্য সেসবের প্রতি কাফকার স্যাটায়ার। কেননা তার জীবনী থেকেই জানা যায়, তিনি ১ম বিশ্বযুদ্ধের আগে ক্লাব ম্লাদিচ্ নামের চেক এক নৈরাজ্যবাদী, সামরিকতন্ত্র-বিরোধী সংগঠনের বেশ কিছু মিটিংয়ে অংশ নিয়েছিলেন। হুগো বার্গম্যান নামক তার একজন সহপাঠি সমাজতান্ত্রিক মনোভাবের জন্য তার সাথে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। কিন্তু খুব দ্রুতই কাফকা চেক নৈরাজ্যবাদীদের সঙ্গ ত্যাগ করেন, তিনি এ সম্পর্কে পরে লিখেছেন- “এরা সবাই মানুষের সুখ আদায় করার সংগ্রাম করছে, এজন্য এরা কোনো ধন্যবাদও পাবে না। আমি এদের বুঝি। কিন্তু…এদের পাশে দাঁড়িয়ে আমার পক্ষে আর মিছিল করে যাওয়া সম্ভব নয়"

রাজনীতি, আমলাতন্ত্রের বিরোধিতা, বিচ্ছিন্নতাবোধ প্রভৃতি কারণে কাফকার সাহিত্যকর্ম চেকোস্লোভাকিয়ায় কম্যুনিস্ট শাসনের সময় পুরো মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের কম্যুনিস্ট ব্লকের দেশগুলোতে নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা করা হয়! কিন্তু তারা বুঝে উঠতে পারছিলো না আসলে কাফকা কীসের বিরোধিতা করেছে! পরে তারা বিচ্ছিন্নতাবোধের দোহাই দিয়ে এই অঞ্চলে কাফকার সাহিত্য নিষিদ্ধ করেন।

কাফকা সারাজীবনে ৩ থেকে ৪টি প্রেমই করেছেন। প্রথম এবং শেষ প্রেমিকাই ছিলেন তার জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ! তার দ্বিতীয় প্রেমিকাকে তিনি বিয়ে করতে চাইলে তার বাবা তাকে বিকল্প হিশেবে পতিতাপল্লীর খোঁজ দেন এবং চিনতে না পারলে সাথে নিয়ে যাবেন এমন কথাও বলেন। কাফকার প্রায় সকল বিষয়েই তার বাবার ছিল ভিন্নমত, মাও কখনো তার কোন মতামতকে শ্রদ্ধা না করে বরং প্রার্থনা করতেন এরকম মানসিকতা থেকে যেন কাফকা মুক্তি পান! কাফকা তার বাবা মায়ের কাছ থেকে প্রাপ্ত শাসনে অসন্তুষ্ট ছিলেন পুরো জীবন, কিন্তু তার কবর হয়েছিল বাবা-মায়ের কবরের সাথেই।

তিনি মৃত্যুবরণ করেন ১৯২৪ সালের ৩ জুন। আজ তার মৃত্যুবার্ষিক! তার সাহিত্যের অনুবাদ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে অত্যন্ত কদরের সাথে কিন্তু তার নিজ দেশেই তিনি হয়ে আছেন নিষিদ্ধ! বিখ্যাত মানুষ হিশেবে তার কবরটিও অনেক বেশি সম্মানিত অবস্থানে রয়েছে তার দেশে কিন্তু তার সাহিত্য সেই সম্মান থেকে বঞ্ছিত!

শিল্পী মানেই অন্যসবার চেয়ে কিছুটা আলাদা। কিন্তু কাফকা ছিলেন একেবারেই আলাদা! তিনি যেন ছিলেন তার নিজের থেকেও আলাদা। ভেতরে বাহিরে নিজের সাথে নিজেরই লেগে যেত ভীষণ কোনো দ্বন্দ্ব! আবার সেই দ্বন্দ্বগুলোও প্রতিমুহূর্তে বদলে যেত! যার সমাধান তিনি নিজেই কিছু খুঁজে পেতেন না! পৃথিবীতে তার আবির্ভাবকে কেবলই তার মনে হতো এক বিশাল ধাঁধায় পড়েছেন তিনি!