ঢাকা, রোববার, ১৮ আগস্ট ২০১৯, ২ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bagan Bangla Insider

এই দিনেই ‘বঙ্গবন্ধু ভবন’ ফিরে পেয়েছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২ জুন ২০১৯ বুধবার, ০৮:০০ এএম
এই দিনেই ‘বঙ্গবন্ধু ভবন’ ফিরে পেয়েছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা

১৯৬০ সালের ১ অক্টোবর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জেল থেকে মুক্ত হয়ে আলফা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে কন্ট্রোলার অব এজেন্সিস পদে চাকরি নেন। বঙ্গমাতা ফজিলাতুনন্নেসা তখন ছেলেমেয়েদের নিয়ে একটু মাথা গোঁজার একটা ঠাই নিশ্চিত করতে ভীষণ মরিয়া হয়ে উঠেন। কেননা তার চিন্তার কারণ ছিলো বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের অনিশ্চয়তা তার ছেলেমেয়েদের জীবনে এসে না পড়ে!

সেই উৎকণ্ঠা থেকেই বঙ্গবন্ধুর বন্ধুবান্ধব, হাউস বিল্ডিং ফাইনান্স কর্পোরেশন প্রভৃতি জায়গা থেকে ঋণ নিয়ে শুরু হয় ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু ভবনটি! এ বাড়ি নির্মাণকাজে নানাভাবে সহযোগিতা করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক ও দাপ্তরিক সহকর্মীরা। এমনকি তাঁর কর্মক্ষেত্র- আলফা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, সেখানে বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ সহকর্মী চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের নূরুল ইসলাম। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিল তাঁর আত্মিক এবং পারিবারিক সম্পর্ক। ওই অফিসে ক্রস ওয়ার্ড লটারি খেলা সবার জন্য ছিল বাধ্যতামূলক। একদিন লটারিতে ব্যবহার করেছিলেন শেখ রেহানার নাম। সেই দিনই তিনি পেয়ে যান ছয় হাজার টাকা। এই টাকা তিনি গচ্ছিত রাখেন বেগম মুজিবের কাছে। পরে বাড়ি নির্মাণের সময় টাকার শর্ট পরে এবং বেগম মুজিবের কাছ থেকে এই টাকাগুলো ধার হিসেবে নেয়া হয়!

কিন্তু কতোদিন ছিলেন এতো শখের, স্বপ্নের আর এতো কষ্টে নির্মিত নিজের বাড়িটিতে? বেশিদিন থাকতে পারেননি এ বাড়িতে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার। ১৯৬১ সালের ১ অক্টোবর তিনি এ বাড়িটিতে ওঠেন পরিবারসহ। আর ১৯৭৫সালের ১৫আগস্ট পর্যন্ত এ বাড়ির মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু পরিবার।

একতলা এ বাড়িটিতে তখন ছিল দুটি বেডরুম। এক রুমে থাকতেন বঙ্গবন্ধু ও বেগম মুজিব। অন্য রুমে থাকতেন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। তার পাশে ছিল আর একটি কক্ষ। সে কক্ষটি রান্নাঘর হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এই রান্নাঘরের এক পাশে থাকতেন শেখ কামাল ও শেখ জামাল। বাড়িতে ঢুকতেই ছিল একটি ছোট রুম। এ রুমটিকে ড্রয়িং রুম হিসেবে ব্যবহার করা হতো।

বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ৩২ নম্বরের এ বাড়িটিকে তিলে তিলে গড়ে ১৯৬৬ সালের শুরুর দিকে দুই তলার কাজ শেষ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু এই বাড়িতে আসার পর বাংলাদেশের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সভা এ বাড়ীতেই অনুষ্ঠিত হতো!

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। ২৯ শ্রাবণ ১৩৮২। এই বাড়ির সামনের রাস্তায় হঠাৎ সামরিক জিপ, ট্যাংক ও ভারী ট্রাকের ছোটাছুটি শোনা গেল। তারপর গুলি আর গুলি। তারপর সব শেষ! পুরো পরিবারকে একইসাথে একই জায়গায় এক এক করে গুলি করে হত্যা করলো এ বাড়িতেই! তারপর থেকে কোলাহলপূর্ণ এ বাড়ির দরজাটি বন্ধ হয়ে যায় পুরো ৬বছরের জন্য। কেউ আর এখানে আসছেও না, আলোও জ্বালছেনা এখানে, আড্ডা-সভা-সমিতি সবই একরাতে হাওয়া হয়ে গেছে এ বাড়ি থেকে।

সরকার সিলগালা করে দেয় বাড়িটিকে। কিন্তু এ বাড়ির দুজন সদস্য তখনো বেঁচেছিল পৃথিবীতে। তারা খুব চেষ্টা করেও তাদের দেশ, তাদের বাড়িতে কিছুতেই ফিরতে পারছিলো না তখনকার সরকারের ষড়যন্ত্রপূর্ণ নিষেধাজ্ঞায়। এভাবে ছয় বছর কেটে গেলো! এলো ১৯৮১। এ বাড়ির বড় মেয়েটি সমস্ত নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ১৯৮১ সালের ১৭ মে ফিরে আসে নিজ দেশে। জনগণ বুকে টেনে নেয় তাঁকে।

তিনি সবার সাথে সমস্ত দেখা সাক্ষাৎ শেষে ছুটে যান স্মৃতিময় সেই বাড়িতে যেখানে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে তাঁর পিতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ মা, দুটি বড়ভাই, ভাইদের স্ত্রী এবং ১১বছর বয়েসী শিশু ভাইকে।

কিন্তু তাকে ফিরতে দেয়া হয়না তার বাবা-মাসহ পরিবারের একমাত্র স্মৃতিসৌধে! তিনি রাগে-ক্ষোভে-দুঃখে উপায়ান্তর না দেখে সেই বাড়ির সামনে বসে দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে মা-বাবার নামে মিলাদ মাহফিল করেন। এসময় তিনি প্রায় প্রতিদিনই এই বাড়ীটির সামনে বসে কুরআন তেলোয়াত করতেন! কিন্তু পাষাণ সরকারের মন কিছুতেই গলেনি। প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছিলো না বঙ্গবন্ধুকন্যা, বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামীলীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে তার বাবা মায়ের স্মৃতিঘেরা ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে!

কিন্তু হঠাৎ করেই বদলে যায় রাজনৈতিক পট-চেহারা! ১৭মে তে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মাত্র ১৩দিন পরেই এক সেনা অভ্যুত্থানে তৎকালীন সরকার জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা হয় চট্টগ্রামে। এসময় মাত্র ১ ঘণ্টার নোটিশে শেখ হাসিনাকে ধানমণ্ডির ৩২নম্বর বাড়িটি হস্তান্তর করা হয়!

শেখ হাসিনা বলেন, “দেশে ফিরে আমি যখন ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িতে প্রবেশ করতে যাই, আমাকে ওই বাড়িতে যেতে দেওয়া হয়নি। পিতা-মাতা,ভাইয়ের জন্য একটু দোয়া করার সুযোগ দেয়া হয়নি। পুলিশ পাহারা ও গেটে তালা দিয়ে আমার পথ রুদ্ধ করা হয়। আমি রাস্তার উপর বসে পড়ি এবং আমাদের নেতাকর্মীদের নিয়ে মিলাদ ও দোয়া পড়ি। ১৯৮১ সালের ১২ জুন পর্যন্ত ওই বাড়িতে আওয়ামী লীগের কোনো মানুষকে ঢুকতে দেয়া হয়নি।

তারপর চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে নিহত হন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়া। জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর ১৯৮১ সালের ১২ জুন হঠাৎ করে ১ ঘণ্টার নোটিসে বাড়িটি আমাকে তাড়াহুড়া করে হস্তান্তর করা হয়”।