ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ জুন ২০২১, ৩ আষাঢ় ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

৭০ বছরেও তারুণ্যদীপ্ত আওয়ামী লীগ

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৩ জুন ২০১৯ রবিবার, ০৮:০০ এএম
৭০ বছরেও তারুণ্যদীপ্ত আওয়ামী লীগ

বাংলাদেশ শুধু নয়, বিশ্বের রাজনীতিতে ঐতিহ্যবাহী পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোর একটি হলো আওয়ামী লীগ। প্রতিষ্ঠার ৭০ বছর পার হলো। অথচ এখনও আওয়ামী লীগ সমান জনপ্রিয়। প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্নে আওয়ামী লীগ যেমন জনপ্রিয় ছিল, এখনও ঠিক সেরকমই জনপ্রিয়। এই জনপ্রিয়তার কৌশলটা কী?

পৃথিবীতে অনেক বড় বড় রাজনৈতিক দল আমরা দেখেছি যে, ব্যাপক জনপ্রিয় এক্সহিল কিন্তু একটা সময় পড়ে হারিয়ে গেছে। সময়ের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারে না। ওই রাজনৈতিক দলের ঐতিহাসিক মূল্য থাকে না। জার্মানির নাৎসি পার্টি যেমন একসময় দারুন প্রতাপশালী দল ছিল। কিন্ত তারা টিকে থাকতে পারেনি। আর ভারতীয় উপমহাদেশের বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে, বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো সময়ের চাহিদা মেটাতে পারেনা। জনগণের যে পরিবর্তিত মন মানসিকতা তার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে না। ফলে এই দলগুলো কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। বাংলাদেশের মুসলিম লীগ, পাকিস্তানের পিপলস পার্টি এমনকি ভারতের কংগ্রেস পর্যন্ত জনপ্রিয়তা হারিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সেখানে আশ্চর্য ব্যতিক্রম। আশ্চর্য ব্যতিক্রম এই কারণে যে, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে গত ৭০ বছরে মৌলিক আদর্শের খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু তারপরও কেন দলটা এখনও আগের মতোই আছে? বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের জনপ্রিয়তা কেন আগের চেয়েও বেশি? এটার রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, মূলত মোটা দাগে পাঁচটি কারণে আওয়ামী লীগ এখনও আগের চেয়েও বেশি জনপ্রিয়।

এর প্রথম কারণ হলো যে, এদেশের মানুষের অধিকার আদায়ের প্রত্যয় নিয়েই আওয়ামী লীগের জন্ম হয়েছিল। বাঙালি জাতির স্বাধিকার, বাঙালি জাতির মুক্তি, বাঙালি জাতির আত্ম নিয়ন্ত্রণ, বাঙালি জাতির মর্যাদা প্রতিষ্ঠার স্লোগান নিয়েই আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠার ৭০ বছর পরেও বাঙালি জাতির অধিকার পুরোপুরিভাবে অর্জিত হয়নি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা এমটি স্বাধীন ভূখণ্ড পেয়েছি, স্বাধীন দেশ পেয়েছি, নিজেদের একটি পতাকা পেয়েছি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের যে আকাঙ্ক্ষার জায়গা ছিল যে এদেশ আত্মমর্যাদাশীল এবং স্বয়ংসম্পূর্ন একটা দেশ হয়ে উঠবে সেটা আমরা এখনও অর্জন করতে পারিনি।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট একটা বড় বিপর্যয় ঘটেছে। তারপর বাংলাদেশ এখন একটা উন্নয়নের অগ্রযাত্রার পথে রয়েছে। কিন্তু সেই যাত্রা এখনও সমাপ্ত হয়নি। এখনও বাংলাদেশে বৈষম্য অনেক প্রকট। এখনও বাংলাদেশে মুক্তযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষার জায়গাগুলো পুরোপুরি অর্জন করা হয়নি। যার জন্য আওয়ামী লীগের যে কাজ যেটা এখনও সমাপ্ত হয়নি। সেজন্য এখনও দেশের জনগণ আওয়ামী লীগের প্রয়োজন উপলব্ধি করতে পারে। এ কারণে এখনও আওয়ামী লীগ জনপ্রিয়।

আওয়ামী লীগের তুমুল জনপ্রিয়তার দ্বিতীয় কারণ হলো, খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা। আওয়ামী লীগ যখন মুক্তিযুদ্ধ করেছে করেছে তখন তারা বাঙালির স্বাধীনতা, বাঙালির অধিকার, বাঙালির অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছিল। পঁচাত্তরে এটার জন্য আওয়ামী লীগ সমাজতান্ত্রিক আর্থসামাজিক নীতি-কৌশল গ্রহণ করেছিল। এই প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগ একসময় বাকশাল-এ রূপান্তরিত হয়েছিল। আওয়ামী লীগ একটা বিরল রাজনৈতিক দল। অন্য দেশের বামঘেষা রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ে আওয়ামী লীগ আগে বুঝতে পেরেছে যে, সমাজতন্ত্রের সূর্য অস্তনিত প্রায়। এই উপমহাদেশে প্রথম জাতীয়তাবাদি দল আওয়ামী লীগ যারা সমাজতান্ত্রিক নীতি থেকে খুব দ্রতই সরে এসেছে। ১৯৮২ তেই আওয়ামী লীগ সমাজতন্ত্র থেকে সরে এসেছে। যে কারণে ১৯৮৪ তে আবদূর রাজ্জাকের মতো নেতারা আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে বাকশাল গঠন করেন। আওয়ামী লীগ তখন সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে কল্যাণমুখী পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক কৌশল গ্রহণ করেন। আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারে ছিল। আবার আওয়ামী লীগই ৯৩ সালে এসে সংসদীয় গণতন্ত্রের পক্ষে আন্দোলন করেছিল। অর্থাৎ যুগের চাহিদা, সময়ের চাহিদা এবং মানুষের আকাঙ্ক্ষার সাথে আওয়ামী লিগ তার মৌলনীতি পরিবর্তন না করে আভ্যন্তরীণ কৌশল এবং রাজনৈতিক নীতির পরিবর্তন করেছে। যার ফলে জনগণের থেকে তারা কখনও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে নি। এই যেমন, বিএনপি কিংবা জামাত এরা কেউই সময়ের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে নি। জামাত একাত্তরের পর ক্ষমা চাওয়া কিংবা নিজেদের অপকর্মের জন্য ক্ষমা চাওয়া ইত্যাদি কোনোটাই তারা করেনি। যার ফলে জামাত কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তার তৃতীয় এবং সবচেয়ে বড় কারণ হলো বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তা। বঙ্গবন্ধু শুধু একজন আওয়ামী লীগের নেতা নন, তিনি হলেন জাতির পিতা এবং সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। মনে করা হয় যে, এই উপমহাদেশে যত নেতা আবির্ভূত হয়েছেন, সেই নেতাদের মধ্যে অন্যতম এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সবচেয়ে ক্যারিশম্যাটিক নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি হ্যামিলনের বংশীবাদকের মতো পুরো বাঙালি জাতিকে জাগাতে পেরেছেন। যারা বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনেন, বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে পড়েন, বা টেলিভিশনের পর্দায় বঙ্গবন্ধুর হাটা-চলা বাচনিকভঙ্গি দেখেন তাদের কাছে নেতা হলেন বঙ্গবন্ধুই। বঙ্গবন্ধুর হয়তো শারীরিক মৃত্যু হয়েছে কিন্তু বঙ্গবন্ধু এখনও লক্ষ লক্ষ মানুষের চিন্তা চেতনায় বেঁচে আছেন। এখনও রাজনীতিবিদের বৈশিষ্ট্য বা রাজনীতিবিদের আদর্শের চূড়ামণি হিসেবে বঙ্গবন্ধুকেই দেখেন অনেকে। জাতির পিতার কাল অতিক্রম করা ব্যক্তিত্বের কারণেই আওয়ামী লীগ এখনও জনপ্রিয়তার শীর্ষে। কবি রবীন্দ্রনাথে কবিতা কিংবা গান এখনও যেমন আমাদের হৃদয়ে গাঁথে। ঠিক সেরকম বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, তার নীতি-চিন্তা এখনও বাঙালিকে উজ্জীবিত করে।

আওয়ামী লীগের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার চার নম্বর কারণ হলো, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক বিন্যাস। ১৯৪৯ সালে সংগঠনটি যখন তৈরি হয়েছিল তখন থেকেই এর সাংগঠনিক বিন্যাস এমনভাবে করা হয়েছিল যে, তৃণমূলটা যেন অনেক শক্তিশালী থাকে। এটা তৃণমূলের সংগঠন হিসেবে পরিচিত। সমাজের প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে দলের একটা যোগসূত্র ছিল। দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ কখনই তৃণমূল থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। জনগণের আকাঙ্ক্ষা থেকে উৎসারিত হয়ে আওয়ামী লীগের জন্ম হয়েছিল। অথচ অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে আমরা পুরো উল্টোটাই দেখতে পাই। এই যেমন বিএনপি, ক্ষমতা ভাগ বাটোয়ারা করার জন্য ক্যান্টনমেন্টে বসে দলটির সৃষ্টি হয়েছিল। এর সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পৃক্ততাই ছিল না। বামরা যেমন সোভিয়েত ইউনিয়নে বিপ্লব হলো, সেখান থেকে তারা এদেশেও বিপ্লব আনতে চেষ্টা করলো। যাকে বলে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া। কিন্তু আওয়ামি লীগের ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে যে একেবারে তৃণমূল থেকে এটা তৈরি হয়েছে। বঙ্গবন্ধু এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন না। বঙ্গবন্ধু এটার প্রথম সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন না। জনগণের আকাঙ্ক্ষা এবং জনগণের ভালোবাসার কারণেই তিনি আওয়ামী লীগের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। যেটা অন্য দলের ক্ষেত্রে খুব কমই দেখা যায়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তৃণমূলের অংশগ্রহণ এটা আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রের মধ্যেই রয়েছে। যে কারণে চাইলেই আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করে করে ফেলা সম্ভব নয়।

আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তার পঞ্চম কারণ হলো, এর বিচিত্রতা। এই দলে বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষ রয়েছে। ভালো মানুষ, খারাপ মানুষ, বামঘেষা কিংবা ডানপন্থি, ধর্ম নিরপেক্ষ বা ধর্মভীরু সব ধরণের মানুষই এই দলটিতে রয়েছে। সব ধরণের চিন্তা, সব ধরণের মানসিকতা, সব ধর্মের লোক এখানে রয়েছে। এতো বৈচিত্রময় বৈশিষ্ট্য ও চরিত্রকে ধারণ করা রাজনৈতিক দল শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীতেই বিরল। যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের মতো পশ্চিমা দেশের দলীয় রাজনীতিতেও ধর্মকে ধারণ করা করা হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে এটা কখনই হয়নি। সব শ্রেনী পেশার এবং ধর্মের মানুষকে একসঙ্গে ধারণ করার মতো একটি দল হলো আওয়ামী লীগ। একারণেই ৭০ বছির পেরিয়েও আওয়ামী লীগ এখনও সমান জনপ্রিয়। ৭১ এ পা রেখেও আওয়ামী লীগ এখনও তারুণ্যদীপ্ত।

বাংলা ইনসাইডার/এএইচসি