ঢাকা, রোববার, ২১ জুলাই ২০১৯, ৫ শ্রাবণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bagan Bangla Insider

নারীর গায়েই কেন বার বার কাদা ছোড়া?

শাহরিনা হক
প্রকাশিত: ৩০ জুন ২০১৯ রবিবার, ০১:০১ পিএম
নারীর গায়েই কেন বার বার কাদা ছোড়া?

প্রেরণা দিয়েছে, শক্তি দিয়েছে বিজয় লক্ষী নারী- এ কথা আমরা কবিতাতে খুব মন দিয়ে পড়ি। কিন্তু নারীকে বিজয় আনতে দেই কোথায় আমরা? নারীকে তো আমরা আর আমাদের প্রিয় সমাজই উপরে উঠতে দেয় না, উল্টো অবদমিত করে রাখে। তার কাঁধে দোষ চাপিয়ে দিতে দিতে সমাজ একটা ভালো সুযোগও পেয়ে গেছে।

কথাগুলো বলার কারণ হলো, এই যে রিফাত খুন হলো, কারা খুন করলো তার সবার পরিচয় সবার সামনেই রয়েছে। অথচ আমরা পড়ে রয়েছি রিফাতের স্ত্রী মিন্নির অতীত আর বর্তমানের পিছনে। মিন্নি অতীতে কাকে বিয়ে করেছে, কোথায় বিয়ে করেছে তার মাপকাঠিতে মাপছি সবকিছু। রিফাতকে প্রকাশ্যে খুন করা হলো এমন নির্মমভাবে, তার কোনো ফয়সালা আমাদের নেই। আমরা ব্যস্ত মেয়েটির গায়ে দোষ চাপিয়ে দিতেই ব্যস্ত। কারণ আমাদের সমাজ জানে, মেয়েদের ঘাড়ে দোষ বা কালিমা লাগানো খুব সহজ। মেয়েদের চরিত্র নিয়ে দুটো বাজে কথা, দুর্নাম বদনাম সমাজ খুব দ্রুত হজম করে নেয়।

এমন ঘটনা আমাদের সমাজে অহরহ ঘটছে। সমাজই সেটার পথ করে দিচ্ছে। আমাদের এমন অভিজ্ঞতা রয়েছে প্রচুর। নারী নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন, খুনের মতো ঘটনা প্রচুর ঘটছে এবং প্রতিদিন তা বাড়ছে। সংসারে যে নারীটিকে সবাই মিলে নির্যাতন করছে, তার পেছনেও দোষ দেওয়া হয়ে নারীকে। তার দোষেই সে নির্যাতিত। আবার যৌন নিপীড়ন ঘটছে কেন সেটার কারণ খুঁজতে গেলেও কত কাহিনীই তো উঠে আসে। নারীটি ভালো ছিল না, তার চরিত্র, তার চলাফেরা বা নীতিনৈতিকতা কোনোটাই ভালো না। এজন্য তাকে এই পরিণতি মেনে নিতে হয়েছে। চরিত্র যখন খারাপই, তার এমন পরিণতি তো হবেই।

এই পর্যন্ত দেশের ইতিহাসে নারী নির্যাতন, যৌন নিপীড়নের পর খুনের ঘটনা প্রচুর। ফিরে যাই ২৫ বছর আগের এক ঘটনায়। ইয়াসমিন আক্তার নামক ১৪ বছরের এক মেয়ে ঢাকায় একজন গৃহকর্মী হিসেবে কর্মরত ছিল। ১৯৯৫ সালে ঢাকা থেকে দিনাজপুরের দশমাইল এলাকায় নিজ বাড়িতে ফিরছিল। পথিমধ্যে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা তাকে পুলিস ভ্যানে করে গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গণধর্ষণ করে হত্যা করে। প্রথমেই গুঞ্জন উঠলো মেয়েটি খারাপ। তারপর ধীর পদক্ষেপে চললো বিচারপ্রক্রিয়া। এরপর কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে সোহাগী জাহান তনুকে ধর্ষনের পর নৃশংসভাবে খুন করা হলো। বিচার তো হলোই না, তনুর চরিত্রের গায়ের লেপে দেওয়া হলো বিভিন্ন ধরনের দুর্নাম। অর্থাৎ বলা হলো তনু ভালো মেয়ে নয়। ভালো মেয়ে নয় বলেই কি তার হত্যার কোনো বিচার হলো না?

আবার আসি ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে মারার ঘটনায়। নিরাপরাধ মেয়েটি ক্রমাগত নির্যাতনের বিচার চেয়ে তো পেলোই না, বিচার চাওয়ার অপরাধে তাকে পুড়িয়ে মেরে ফেলা হলো। কত লোকে কত কথা বললো, খারাপ মেয়ে না হলে এমন পরিণতি কারো হয় নাকি? এমন অনেক কথাই ভেসে বেড়াতে লাগলো। অথচ মেয়েগুলো যে কত যন্ত্রণা সয়ে মারা গেলো, তার বিচার কেউ করলো না? এই প্রশ্ন সবার আগে করা উচিৎ আমাদের বিবেককে।

এই যে রিফাত শরীফের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে নিয়ে এতো আলোচনা সমালোচনায় আমরা মুখর, একবারও কি ভাবছি না যে মেয়েটি যত খারাপই হোক না কেন, তার সামনে যে এমন নৃশংস ঘটনা ঘটলো, তার মানসিক অবস্থা এখন কেমন। তাকে বিভিন্ন সময়ে হুমকি, ভয় দেখানো হচ্ছে- এতে তার পরিস্থিতি কি হচ্ছে। তার নামে গণমাধ্যম আর সামাজিক মাধ্যমগুলোতে যেসব কথাগুলো ছড়াচ্ছে, তাতে তার সম্মান আর ভবিষ্যত যে ধুলোয় মিশছে, সে ভাবনা আমাদের নেই। তার আগের বিয়ের কাবিনের ছবি দেখছে এখন পুরো দেশের মানুষ। যারা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তারাও বুঝেশুনে এটা ঘটিয়েছে। সমাজে তারা প্রভাবশালী, তাদের দাপটও অনেক। আগেও নাকি এমন ঘটনা ঘটানোর নজিরও আছে তাদের। তাদের সবার সামনে তুলে না ধরে এনে মেয়েটিকে নিয়ে এমন টানাহ্যাচড়ার কোনো মানে আছে বলে মনে হয় না। তার অতীত যা-ই থাকুক না কেন, সেটা নিয়ে আমরা বা আমাদের সমাজের নাক গলানো কি খুব জরুরি?

বিয়ে, সম্পর্ক বা ব্যক্তিগত যেকোনো বিষয়ে একটি মেয়েরও সাধারণ স্বাধীনতা রয়েছে। সে যা করবে সেটা তার নিজের ইচ্ছা। এটা নিয়ে সমাজ কেন এগোবে? একটা মানুষকে প্রকাশ্যে কোপানো হলেও আমরা সেটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখি, আর কারো বদনাম ছড়াতে আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে যাই। কি অদ্ভুত আমরা!