ঢাকা, শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯, ৯ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bagan Bangla Insider

বঙ্গবন্ধুর ছায়াসঙ্গী যিনি

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৩ জুলাই ২০১৯ মঙ্গলবার, ০৮:৪৭ এএম
বঙ্গবন্ধুর ছায়াসঙ্গী যিনি

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের ক্ষেত্রে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পর যে নামটি অনিবার্যভাবে এসে যায় তিনি বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদ। বাংলাদেশের চব্বিশ বছরের স্বাধিকার আন্দোলন, স্বাধীনতার যুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার পথেও জাতির পিতার ছায়াসঙ্গী হয়ে থেকেছেন তাজউদ্দীন আহমদ।

স্কুলজীবন থেকেই তাজউদ্দীন ছিলেন রাজনীতি-সচেতন। শান্ত, সংযমী, মিতভাষী, দায়িত্বশীল ও স্নেহপরায়ণ এক অনন্য গুণাবলিসম্পন্ন হিসেবে শৈশব-কৈশোরে বেড়ে ওঠেন তিনি। কাপাসিয়া মাইনর ইংলিশ প্রাইমারি স্কুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক মফিজউদ্দীন সাহেব তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াকালে তাজউদ্দীন সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করে সব শিক্ষকের উদ্দেশে বলেছিলেন, `সে হলো গ্রেট স্কলার। সে হলো রত্ন। তার মাঝে আমি বিরাট ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছি।` প্রধান শিক্ষক মফিজউদ্দীন সাহেবের সেই ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা হয়নি। ১৯৪৪ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় বাংলা প্রদেশের একমাত্র বোর্ড কলিকাতা বোর্ডে তিনি ১২তম স্থান অর্জন করেন। ১৯৪৮ সালে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায়ও তিনি ঢাকা বোর্ড থেকে চতুর্থ স্থান অর্জন করেছিলেন। ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাজউদ্দীন আহমদ অর্থনীতিতে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি লাভ করেন।

মাত্র ২৮ বছর বয়সে তাজউদ্দীন আহমদ জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হন। ১৯৫৫ সালে তার কর্মতৎপরতায় মুগ্ধ হয়ে মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমান তাকে আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক নির্বাচিত করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। ছয় দফা আন্দোলনে তাজউদ্দীন ঘনিষ্ঠভাবে সহযোগিতা করেন শেখ মুজিবকে। শেখ মুজিব যেদিন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি হন, সেদিনই তাজউদ্দীন হন সাধারণ সম্পাদক। শুরু হয় বাংলার রাজনৈতিক আকাশে বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীন জুটির ঘনিষ্ঠভাবে পথচলা। আর এই রাজনৈতিক জুটির ঘনিষ্ঠতা দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর। তাজউদ্দীনকে ভয় পেত। ভয় পেত তার প্রখর মেধা, প্রজ্ঞা, বুদ্ধি এবং কৌশলকে। বস্তুত বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীন ছিলেন যেন একে অন্যের পরিপূরক। বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দীনের স্ত্রী জোহরা তাজউদ্দীনকে আপন ছোট বোনের মতো স্নেহ করতেন। তাজউদ্দীনের দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রমের বিষয়টি বঙ্গবন্ধু ভালো করেই জানতেন। তাই তিনি জোহরা তাজউদ্দীনের ডাক নাম ধরে বলতেন, `লিলি, তাজউদ্দীনের দিকে খেয়াল রেখো, ওকে ছাড়া কিন্তু সব অচল।`

একাত্তরের ১৭ এপ্রিল বর্তমান মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে তাজউদ্দীনের নেতৃত্বেই গঠিত হয় স্বাধীন বাংলার প্রথম সরকার। বঙ্গবন্ধুর প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতিত্বের নিদর্শনস্বরূপ তাজউদ্দীন এই সরকারের নামকরণ করেছিলেন `মুজিবনগর সরকার`। শপথ গ্রহণ শেষে সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, `আজ থেকে আমাদের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে এই মেহেরপুরের নাম হবে বাঙালি জাতির সর্বশেষ্ঠ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামানুসারে `মুজিবনগর` এবং এই মুজিবনগর আজ থেকে হবে বাংলাদেশের রাজধানী।`

স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনালগ্ন থেকে একেবারে অন্তিম পর্ব পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গতাজ ছিলেন একে অন্যের পরিপূরক। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তাজউদ্দীন আহমদ তীব্রভাবে বঙ্গবন্ধুর অভাববোধ করতেন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে সবসময় স্মরণ এবং সামনে রেখে দৃপ্ত প্রত্যয়ে মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিকামী জনতাকে সর্বদা সজাগ রাখতে তিনি ছিলেন সচেষ্ট। তিনি তীব্র আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলতেন, বাংলার মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, স্বাধীনতার রূপকার বঙ্গবন্ধুকে আমাদের মাঝে আমরা ফিরিয়ে আনবই। তার সেই আত্মবিশ্বাস বৃথা যায়নি। যেদিন বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেছিলেন, সেদিন পরম মমতায় তাজউদ্দীনকে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলেন। সেই মাহেন্দ্রক্ষণে যেন বাংলার স্বাধীনতা পূর্ণতা পেয়েছিল, এ কথা নির্দি্বধায় বলা যায়।

স্বাধীনতাবিরোধীশক্তি দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও বসে ছিল না। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা গোপনে কাজ করে যাচ্ছিল। চক্রান্তকারীরা এটা ভালো করেই বুঝতে পেরেছিল যে বঙ্গবন্ধু এবং তাজউদ্দীন একত্রে থাকলে তাদের স্বপ্ন কোনোদিন পূরণ হবে না। তাই তারা  বঙ্গবন্ধুকে ভুল বুঝিয়ে তাজউদ্দীনকে দূরে সরিয়ে দিতে সচেষ্ট হয়। ষড়যন্ত্রকারীদের এই প্রচেষ্টা সফল হয়েছিল। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাজউদ্দীনের দূরত্ব তৈরি করাতে সফল হয়েছিল তারা। একসময় বঙ্গবন্ধুর প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে অভিমানি হয়ে তাজউদ্দীন মন্ত্রিসভা থেকে দূরে সরে আসেন। তাজউদ্দীন আহমদের এই দূরে সরে যাওয়া বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের জন্য ছিল এক বিরাট ক্ষতি।

নির্মোহ, নির্লোভ এবং নিরহঙ্কার এক অনন্য রাজনৈতিক ছিলেন তাজউদ্দীন। তাজউদ্দীনের জীবদ্দশায় তার সবচেয়ে বড় দুঃখ ছিল মুক্তিযুদ্ধকালীন নয় মাসের বিচিত্র ঘটনাপ্রবাহ বঙ্গবন্ধুকে শোনাতে না পারা। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তাজউদ্দীন আহমদ বড় আক্ষেপ নিয়ে বলেছিলেন, আজ আমি যদি মন্ত্রিসভায় থাকতাম তাহলে কেউ বঙ্গবন্ধুর গায়ের লোম পর্যন্ত স্পর্শ করতে পারত না। তিনি আরও বলেছিলেন, মুজিব ভাই জেনে যেতে পারলেন না কারা তার বন্ধু ছিল আর কারা তার শত্রু ছিল। সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মাত্র দুই মাস ১৮ দিনের মাথায় সংঘটিত হয় বাঙালির ইতিহাসের আরেক নির্মমতার করুণ কাহিনী- ৩ নভেম্বরের জেল হত্যাকাণ্ড। নির্মমভাবে শহীদ হন বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদ। বুকের রক্ত দিয়ে বঙ্গতাজ প্রমাণ করে যান যে, কোনও প্রলোভনেই তিনি জাতির পিতার সঙ্গে বেইমানি করেননি।

আজ এই কীর্তিমান মহান নেতার ৯৪তম জন্মবার্ষিকী। এ উপলক্ষে দেশব্যাপী নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাঙালি জাতির জন্য বঙ্গতাজ রেখে গেছেন অনন্য নজির, যা তাকে চিরকাল স্মরণীয় করে রাখবে।

বাংলা ইনসাইডার/এএইচসি