ঢাকা, শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

‘এতই গরীব হইছি যে কুরবানি দেওয়ার মতো সামর্থ্য আমার হইব না?’

নাজমুল হাসান সাগর
প্রকাশিত: ১১ আগস্ট ২০১৯ রবিবার, ০৯:৫৪ পিএম
‘এতই গরীব হইছি যে কুরবানি দেওয়ার মতো সামর্থ্য আমার হইব না?’

‘সেই সকালে হাটে আসছি, এখন বাজে বিকাল তিনটা। আসার পরে থাইকা হাটের এই মাথা থাইকা ওই মাথা পর্যন্ত কতবার যে ঘুরছি তার হিসাব এখন আমি চাইলেও মনে করতে পারমু না। সকালে আশি হাজার টাকা নিয়া গরু কিনতে বাইর হইছি বাড়ি থাইকা। পকেটের টাকা পকেটেই ছিলো, অবস্থা যা বুঝতেছিলাম সেইটা দেইখা মনে হইছে গরু না কিনা বাড়ি ফিরা যাইতে হইব। যে গরুই পছন্দ হয়, দাম জিগানের পরে আর কোন কথা কওনের থাকে না আমার। যে  গরু পছন্দ হয় না, সেইটার দাম শুনলেই মনটা খারাপ হয়া যায়, দুঃখে- কষ্টে মইরা যাইতে ইচ্ছা করে। গরীব বইলা কি এতই গরীব হইছি যে, আল্লাহর খুশির লাইগা একটা গরু কুরবানি দেওয়ার মতো সামর্থ্য আমার হইব না?’

খুব ক্ষোভ নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন গাবতলি হাটে কোরবানির জন্যে গরু কিনতে আসা আশরাফ শেখ। তাঁর সঙ্গে আলাপের সময় জানা যায় জীবনের ৬৩ বছরে এসে এবারই প্রথম কোরবানি দেবেন তিনি। সেই বছর ১৪ আগে জামালপুরের কোন এক চর থেকে নদী তাদের বিতাড়িত করেছিলো বাবার ভিটা থেকে। তারপর থেকে আশরাফ ও তার স্ত্রী ঢাকায় চলে আসেন জীবিকার তাগিদে। ভিটে-মাটি হারিয়ে নিঃস্ব অবস্থায় তাঁরা ঢাকা এসে কিছু দিন রাস্তায় কাটিয়েছেন। কিন্তু বেশ কয়েক বছর হলো তাদের ভাগ্য ফিরেছে। খেয়ে-পড়ে আর একটা ছোট্ট রুম ভাড়া নিয়ে থাকার মতো সামর্থ্য তাঁরা অর্জন করেছেন বছর সাতেক হয়। তাঁর স্ত্রী মিরপুরের মেস বাড়িতে বুয়ার কাজ করে ভালই টাকা আয় করে প্রতি মাসে। আর আশরাফ মিরপুরেরই একটি পোশাক কারখানায় লোড-আনলোডের কাজ করেন।

তাঁদের কোন সন্তানাদি না থাকায় এই সাত বছরে দুই জনের সংসারে কিছু টাকা  জমা হয়েছে। তাদের অবর্তমানে সেই টাকার মালিকানা হবার মতো কেউ নেই। তাই আশরাফ শেখের স্ত্রী একটা আবদার করেন তাঁর কাছে। আশরাফের ভাষ্যমতে তাঁর স্ত্রী তাকে একদিন বলেন, ‘আমাগো তো পোলা মাইয়া নাই। এই জমাইনা টাকা দিয়া কি করমু? যে টাকাগুলা ঘরে পইড়া রইছে সেইগুলা দিয়া যদি একটা গরু কেনা যায় এই কুরবানীতে,তাইলে কেমন হয়?’ কথা শুনে মনে ধরে আশরাফ শেখের। তাই সিদ্ধান্ত নেন আর ভাবেন, ‘যা টাকা আছে ঘরে সেইটা দিয়া একটা গরু কিনা কুরবানী দিমু এইবার। তাই এই গরু কিনতে আসা।’

জিজ্ঞেস করা হয় গরু কিনছেন কি না? হাতে ধরা গরুর দড়ি নাড়তে নাড়তে মৃদু হেঁসে বলেন, ‘হ্যাঁ, কিনছি।’ তারপর পালটা প্রশ্ন, ‘আচ্ছা আপনে কি সাংবাদিক না কি?’ উত্তরে একটা হাসি পেলেন তিনি। আবার বলতে শুরু করেন, ‘গরু কিনছি একটা ৭৭ হাজার টাকা দিয়া, তারপর হাসিল মিটায়া এখন পকেটে যা আছে সেইটা দিয়া তো গরু বাড়ি পর্যন্ত নিয়া যাওয়া সম্ভব না। আমি বয়স্ক মানুষ, এই গরু নিয়া একলা একলা যাওয়া তো সম্ভব না, তাই রাখাল খুঁজি। রাখালদের সাথে দাম দরে বনে না, এই কারণে মেজাজটা খারাপ লাগতেছে।’ এতক্ষণে বুঝতে বাকি থাকে না শুরুর দিকের কথাগুলো  কেনো এত ক্ষোভ নিয়ে বলছিলেন। রাখালরা কত টাকা চায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তারা তো দুই হাজার টাকা দাবি কইরা বইছে, আমি ১২শ টাকা কইছি কিন্তু যাইবো না। আরো লোক আছে হেরা বেশি টাকা দিবো, আমার লগে কেন যাইব তারা?’ প্রশ্ন করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি।

পড়ন্ত দুপুরের কড়া রোদ তার কপালের জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘামের উপর পড়ে চকচক করতে থাকে তামাটে মুখমণ্ডলের চামড়া। আপাতদৃষ্টে মুখ চকচকে মনে হলেও তার নিচে একরাশ বিষাদ বাসা করে আছে সেটা বোঝা যায় তার দীর্ঘশ্বাসের মাত্রা দেখে। গরু কিনে খুশি হয়েছেন কি না শেষ বারের মতো জানতে চাওয়া হয় তার কাছে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তিনি বলেন, ‘আমি আমার সবখানি উজাড় কইরা দিয়া যার খুশির লাইগা এই গরু কিনছি সে খুশি হইলেই হইল। আল্লাহ খুশি হইব কি না জানি না, আমার স্ত্রী খুব খুশি হইব। আমি বাড়িওলীরে(তার স্ত্রী) ফুন দিছি আরো কিছু টাকা নিয়া হাটে চইলা আইতে। হে আইলে গরুটা বাড়ি পর্যন্ত নিয়া যাইতে পারলে সব ঝামেলা থাইকা মুক্তি। যতক্ষণ পর্যন্ত না আহে ততক্ষণ খাড়ায়া থাকা মুশকিল।’

বাংলা ইনসাইডার