ঢাকা, সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯, ৩ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bagan Bangla Insider

গুঞ্জন থেকে গুজব, গুজব থেকে গুরুতর কিছু

মেজর নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ (অব.) পিএইচডি
প্রকাশিত: ১২ আগস্ট ২০১৯ সোমবার, ০৮:০২ পিএম
গুঞ্জন থেকে গুজব, গুজব থেকে গুরুতর কিছু

ধরা যাক আপনাকে প্রশ্ন করা হলো- ‘আপনি কি জানেন, গুজব বলে কোনো শব্দ আসলে অভিধানে নেই?’ উত্তরে কি বলবেন? আপনার উত্তর যদি হয়, ‘তাই না কি! সত্যি?’ তাহলে দুঃখের সাথে জানাচ্ছি, যারা গুজবে কান দেয় বা গুজব ছড়ায়, আপনি তাদেরই একজন। কেননা আপনি নিশ্চয়ই নিশ্চিত রিউমার (Rumour) বা গুজব শব্দটি অবশ্যই ডিকশনারি বা অভিধানে আছে। হয়ত নিজ চোখে দেখেছেনও। তাহলে কেন বলতে পারলেন না, ‘না এটা হতে পারে না। এসব ফালতু কথা আমাকে বলবেন না।’ ক্ষমা করবেন পাঠক। আপনাকে আঘাত করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। গুজব বিষয়ক শিরোনাম দেখেই আপনি লেখাটি পড়ছেন। এজন্য আপনি অবশ্যই ধন্যবাদ প্রাপ্য। তবে আমার শঙ্কা ২৮ টি দেশের শতকরা ৬৩ জন মানুষকে নিয়ে যারা গণমাধ্যম এবং সোশ্যাল মিডিয়ার খবরে এবং সত্য-মিথ্যা যাচাই করতে পারেন না। বিশ্বের অন্যতম এবং আমেরিকার শীর্ষতম গণসংযোগ এবং বিপণন ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান এ্যাডেল মেন ইন্টেলিজেন্স (Edel Man Intelligence) ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে ২৮টি দেশে গবেষণা শেষে তাদের প্রচারমাধ্যম এ্যাডেল মেন ট্রাস্ট বেরোমিটার (Edel Man Berometer) এ এই তথ্য প্রকাশ করেছে। সুতরাং আমি আপনি বা আমরা সেই ৬৩% এর দলে থাকাটা অস্বাভাবিক নয়।

গুজবে কান দেবেন না বলাটা যত সহজ, গুজব থেকে কানটা দূরে রাখা তত সহজ নয়। ‘কাউকে বলবেন না’ শর্তে যে মনগড়া কথা বা ধারণা কাউকে বলা হয়, ডালপালাসহ তা ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের মতো। সোশ্যাল মিডিয়ার আবিস্কার গুজবকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। কোনো কোনো গুজব আবার সহিংসতা বাড়িয়ে ডেকে আনে বড় বিপদ। গুজবসৃষ্ট কিছু করুণ কাহিনী লিখেছেন মেজর নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ (অব.) পিএইচডি।

গুজব আসলে কি?

গুজবের সঠিক সংজ্ঞা নির্ধারণ করা বেশ কঠিন। কারণ গুজবের বিস্তৃতি ব্যাপক ও বৈচিত্রময়। প্রাচীনকাল থেকেই যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং নিজস্ব বাহিনীর মনোবল, উৎসাহ এবং তেজ বাড়ানোর জন্য সুকৌশলে গুজব রটানো হতো। রাজনীতি বা অপরাজনীতির অন্যতম হাতিয়ার গুজব যা নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য অহরহ ব্যবহৃত হয়। বাণিজ্যিক ভূবনে নিজস্ব পণ্যের পসার এবং প্রতিদ্বন্দ্বির পণ্যের কাটতি কমাতে গুজবের ওপর নির্ভর করে অনেকেই। শেয়ার বাজারে গুজব ছড়িয়ে লঙ্কাকাণ্ড বাধানো যায়। বিনোদন দুনিয়ায় গুজব ছড়িয়ে দর্শকশ্রোতার মনোযোগ আকর্ষণ করা যায়। তাই ইচ্ছে করে গুজব ছড়ানো বিনোদন তারকারা, যাদের অনেকেই পরবর্তীতে ব্যাপক সফলতা লাভ করে সুপারস্টার হয়েছেন। তবে হালের আলোচিত বিষয় সামাজিক গুজব এবং সোশ্যাল মিডিয়া র্নিভর রাজনৈতিক গুজব। পদ্মাসেতুর জন্য রক্ত এবং মানুষের মাথা প্রয়োজন কিংবা প্রধানমন্ত্রীর ক্যানসার যার অন্যতম উদাহরণ। ব্যাপক গবেষণার পর বৃটেনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্লস ওয়ান (PLOS ONE) ২০১৬ সালের ৪ মার্চ সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়ানোর ওপর একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করে এবং সবকিছু বিবেচনা করে একটি গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা উপস্থাপন করে। প্লস ওয়ানের গবেষণা মতে, ‘আপাতদৃষ্টিতে সত্য বা গ্রহণযোগ্য কিন্তু যার সত্যতা ও সঠিকতা সহজে নিরূপণ করা যায় না এবং যা অনেকরকম উত্তেজনা, দুশ্চিন্তা, কল্পনা, ধারণা ইত্যাদি তৈরি করে তা প্রকাশ বা প্রচারণাকে গুজব বলা যায়।

আমাদের অনেকের মাঝেই গুলিলিটি (Gulility) অর্থাৎ দ্রুত ও সহজে বিশ্বাস করার প্রবণতা কাজ করে। আমাদের চরিত্রের এই দূর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন উদ্দেশ্যে গুজব সৃষ্টি ও প্রচার করা হয়। আবার কোনো উদ্দেশ্য নয়, কেবল মজা করার জন্যেও অনেকে গুজব তৈরি ও প্রচার করে। এর নেপথ্যে রয়েছে এক নতুন ভোক্তাশ্রেণী যাদের পশ্চিমা বিশ্বে বলা হয় ‘তথ্যভোক্তা’ বা কনজিউমার অব ইনফরমেশন। বাংলাদেশের মিডিয়া জগতে একটা কথা চালু আছে যে ‘পাঠক খাবে না’ বা ‘দর্শক খাবে না’। বিষয়টি অনেকটা এরকমই। আরও সহজ করে বলতে গেলে বলা যায় যে, বর্তমান সমাজের একটা অংশ তথাকথিত ‘লাইক’, ‘শেয়ার’, ‘কমেন্টস’ ইত্যাদি দিতে এবং পেতে দারুণ পছন্দ করে। তাদের চাহিদা মেটাতে বা তাদের প্রতিক্রিয়া দেখতেও সমাজে গুজব ছড়ানো হয়, যার পিছনে হয়তবা রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কোনো কারণ থাকে না।

গুজব সৃষ্টির কারণ ও পরিবেশ

প্রকৃত ঘটনা বা প্রকৃত সত্য না জানা ও আংশিক তথ্য জানা।

কোনোকিছু নিয়ে দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা, উত্তেজনা

কোনো তথ্য, সংবাদ, ঘটনা যখন গুরুত্বপূর্ণ ও মুখরোচক

কোনো গুজব যখন সত্য বলে বিশ্বাসযোগ্যতা পায়

নিজের গুরুত্ব ও ইমেজ বৃদ্ধি করার আকাঙ্ক্ষা

সামাজিকভাবে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করার আকাঙ্ক্ষা

 

তথ্যসূত্র: সোশ্যাল সাইকো অনলাইন।

হোয়াইট হাউজকে হোয়াইট ওয়াশ

এপ্রিল মাসের এক তারিখে সাধারণত মুখরোচক মিথ্যা সংবাদ প্রচার করে মজা করার একটা প্রচলন রয়েছে প্রচ্যের দেশগুলোতে কিন্তু ২০১৩ সালের ২৩ এপ্রিল দুপুর একটা সাত মিনিটে পৃথিবীর অন্যত্তম বৃহৎ ও আমেরিকার প্রভাবশালী বার্তা সংস্থা এসোসিয়েটেড প্রেস (এ পি) কোন মিথ্যা সংবাদ প্রচার করে মজা করতে পারে- তা ছিল সবার ধারনার বাইরে। ফলে এক টুইট বার্তায় এ পি যখন প্রচার করলো যে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট হিসাবে বিবেচ্য খোদ আমেরিকান প্রেসিডেন্টের সুরক্ষিত অফিস ভবন হোয়াইট হাউজে বিস্ফোরন ঘটেছে এবং এতে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আহত হয়েছেন, তখন বিশ্ববাসীর কপালে ক্ষণিকের জন্য হলেও ভাঁজ পড়ে ছিল। মূহর্তেই এই সংবাদ ভাইরাল হয় এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়ে পুজিবাজারে। ব্রিটিশ সংবাদপত্র দি টেলিগ্রাফের ২৩ এপ্রিল ২০১৩ এর তথ্য মতে এই টুইট বার্তা প্রকাশের সাথে সাথে আমেরিকার পুঁজি বাজার শেয়ারের দাম নামতে থাকে এবং  তিন মিনিটের মধ্যে বাজার থেকে ১৩৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ বর্মান বাজার মূল্যে প্রায় ১২০০ কোটি টাকা উধাও হয়ে যায়। বিশ্বের নির্ভরশীল অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ: শেয়ার মার্কেট গবেষনা সংস্থা স্ট্যান্ডর্ড এন্ড পুত্তরস্ (এস এন্ড পি)  এর এস এন্ড পি ৫০০ নামের শেয়ার বাজার সূচক ও নাটকীয়ভাবে নেমে যায়। এই ঘটনার ঠিক আট দিন আগে আর্থাৎ ২০১৩ সালের ১৫ এপ্রিল বোস্টন শহরে বাৎসরিক মেরাথন দৌড়ে চলাকলে দৌড়ের শেষ সীমায় ১২ সেকেন্ড এবং ১৯০ মিটার ব্যবধানে রান্নাঘরে ব্যবহৃত প্রেসার কুকারে রাখা দুইটি শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরিত হয়। এতে ঘটনাস্থলে ৬ জন প্রাণ হারান, ১২ জনের অঙ্গহানী হয় এবং কয়েকজন সাধারণ দর্শক আহত হয়। এই ঘটনার ৮দিনের ব্যবধানে হোয়াইট হাউজ উড়িয়ে দেওয়ার টুইট বার্তাটি তাই বিশ্বাসযোগ্যতা পায় এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে হোয়াইট হাউজের মূখপাত্র জে কারনী (Jey Carney) সংবাদমাধ্যমে উপস্থিত হন এবং এই টুইট বার্তা অসত্য এবং প্রেসিডেন্ট ওবামা সুস্থ আছে মর্মে নিশ্চিত করেন। এদিকে অ্যাসোসিয়েট প্রেস দ্রুততার সাথে তাদের টুইট আইডি হ্যাক করে হোয়াইট হাউজও প্রেসিডেন্টকে উড়িয়ে দেওয়ার গুজব ছড়ানোর বিষয়টি বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী তুলে ধরে। পরবর্তীতে অ্যাসোসিয়েট প্রেস আমেরিকার ন্যাশনাল পাবলিক রেডিও, বিবিসি এবং সিক্সটি মিনিটস এর মতো বহু প্রচার মাধ্যমের দুটি হ্যাক করার দাবী করে ‘সিরিয়াল ইলেকট্রনিক আর্মি’ নামক এক জঙ্গি সংগঠন, যা সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের সমর্থক বলে স্বীকৃত।

চাঁদ নিয়ে চাপাবাজি

বর্তমান যুগে এসে আমরা চাঁদে মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর মূখ দেখার গুজব শুনেছি এবং এ নিয়ে উত্তেজনা এবং ভাংচুর প্রত্যক্ষ করেছি। অথচ অষ্টদশ শতকে আয়ারল্যান্ডের রাজধানী এডিনবার্গ থেকে প্রকাশিত পত্রিকা ‘দি এডিনবার্গ কোয়ারান্ট’ এ রীতিমত দাবি করা হয় চাঁদে ভীন গ্রহের প্রাণী বা এ্যালিয়েন (Aline) এবং  এ্যালিয়েনদের বাসস্থান ও সভ্যতা রয়েছে এই সূত্র ধরে ১৮৩৫ সালের ২১ আগস্ট আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা ‘দি সান’(The Sun) অচিরেই চাঁদে জীবের উদ্ভিত্ব ও সভ্যতা খুঁজে পাওয়া সংক্রান্ত খবর প্রকশের ঘোষণা দেয়ে। এরপর ইংল্যান্ডের জন্ম নেওয়া লেখক, বিজ্ঞনী, গনিতবিদ, রসায়নবিদ এবং ব্লু প্রিন্টের জনক স্যার জন ফ্রেডিক ইউলিয়াম হার্সেল (Sir John Fedrick Herschel) এর ছয় পর্বের লেখা প্রকাশ করে। এই লেখা প্রকাশের আগে বৃটিশ জ্যোতিষী এবং খৃষ্টানদের চার্চ বিষয়ক কর্নধার থমাস ডিক (Thomas Dick) সৌর জগতে প্রায় বাইশ ট্রিলিয়ন বা বাইশ হাজার কোটি বাসিন্দা রয়েছে বলে দাবী করেন, যার মধ্যে শুধু চাঁদেই চারশত বিশ কোটিবাসিন্দা আছে বলে প্রকাশ করেন। তাঁর লেখা সে সময় বেশ জনপ্রিয় পায় ইউরোপ জুড়ে, অন্যদিকে জার্মানীর মিউনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিদ্যার অধ্যাপক ফ্রাঞ্জ ভন পাউলা গ্রুইথুসেনা (Frang Von Paula Gruithuisen) ১৮২৪ সালে  এক লেখায় চাঁদের জীবের অস্তিত্ব এমনকি এসব জীব থাকার জন্য বিল্ডিং এবং সবুজ চত্ত্বরও আছে বলে দাবি করেন। এই লেখা’ও প্রবল জনপ্রিয়তা লাভ করে। এর দশবছর পর দি সান পত্রিকার সাংবাদিক রিচার্ড এ্যাডামস্ লকী (Richard Adams Locke) চাঁদে এ্যালিয়েন থাকার এই ছয় পর্বের ধারাবাহিক প্রকাশ করেন ২৪ আগস্ট ১৮৩৫ সাল থেকে। পরবর্তীতে জানা যায়, এই ধারাবাহিকের জনক স্যার জন হার্সেল অপর বিজ্ঞানী ও ভ্রমণসঙ্গী ড. এনড্রিও গ্রান্ট (Andrew Grant) কে ব্যাখ্যা করেন এবং পিকটেশন দেন। পরে তা দি সান রিপোর্টার রিচার্ড এ্যাডাম লকী’র বরাতে পত্রিকায় লেখা হয়। এই লেখাটিকে চাঁদে জীবের বা প্রাণের অস্তিত্ব সংক্রান্ত সকল ধারণাকে বাতিল এবং পত্রিকার বিক্রি বাড়ানো তথা মুনাফা বৃদ্ধির কৌশল হিসেবে গণ্য করা হয়। এই ধারাবাহিক রিপোর্টে চাঁদে ছাগল, বন্য গরু, শিংযুক্ত ঘোড়া, উটপাখির মতো পাখি, বাঁদুড়, লেজবিহীন বড় ইঁদুর ইত্যাদির অস্তিত্ব থাকার তথ্যও প্রকাশ করা হয়। বিভিন্ন ধরনের দূরবীক্ষণ যন্ত্রে স্যার জন হার্সেল এসব পশুপাখির পাশাপাশি চাঁদে গাছ, সমুদ্র ও বেলাভূমি দেখেছেন বলে দাবি করা হয়। এই ধারাবাহিক রিপোর্ট প্রকাশের পর ‘দি সান’ পত্রিকার চাহিদা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায় এবং এই বিক্রি বেশ কিছুদিন চলতে থাকে। অন্যদিকে প্রশ্নবানে জর্জরিত হতে থাকেন স্যার জন। প্রশ্নকারীদের অধিকাংশের ধারণা ছিল সত্যিই চাঁদে জীবের অস্তিত্ব রয়েছে।

 

কুষ্ঠরোগ নিয়ে কুকথা

১৩৪৭ থেকে ১৩৫১- এই পাঁচ বছরে ইউরোপ এবং এশিয়ার সাড়ে ৭ থেকে ২০০ কোটি মানুষের মৃত্যু ঘটে এক ধরণের প্লাগ বা কুষ্ঠশ্রেণির রোগে। এই মহামারি ইতিহাসে ‘কালোমৃত্যু’ বা (Black Death), মহাপ্লাগ (Great Plague) এবং কালো প্লাগ (Black Plague) হিসাবে ঠাঁই পেয়েছে। এই রোগের কারণ ও প্রতিকার নিয়ে তখন অনেক গুজব, কুসংস্কার ও কল্পকাহিনী প্রচারিত হয়। এছাড়াও মধ্যযুগে রোগমুক্তি ও সুস্থ থাকার আশায় ইহুদিরা খ্রিস্টান শিশুদের রক্তে গোসল করে বলে এক ধরণের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। যা বহু হৃদয়বিদারক রক্তপাত, দাঙ্গা ও ধর্মযুদ্ধ উসকে দেয়। তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে করুণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় ১৩২১ সালে ফ্রান্সে। এ সময় গুজব রটে যে শরীরের মাংস পচে যাওয়া বা বা এক ধরনের কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত ইহুদি রোগীরা ইচ্ছাকৃতভাবে পানিতে বিশেষত পানির কুয়ায় এই মাংস পচন বা কুষ্ঠরোগের জীবাণু মিশিয়ে দিচ্ছে। এতে আরও বলা হয় যে, মুসলমানদের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং ইহুদিদের অর্থায়নে কুষ্ঠরোগীরা পানিতে রোগের জীবাণু ও বিষ মিশিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে একাধারে মুসলমান, ইহুদি, কুষ্ঠরোগী, অপরিচিত কোনো ব্যক্তি নির্বিশেষে অসংখ্য মানুষকে নানা কায়দায় বিশেষত আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। বিভিন্ন বর্ণনামতে, ১৩২১ সালের জুন মাসে ফ্রান্সের তৎকালীন সম্রাট পঞ্চম ফিলিপ সংবাদ পান যে কুষ্ঠরোগীরা ফ্রান্স ও জার্মানীর খ্রিষ্টানদের হত্যা কিংবা কুষ্ঠরোগের বিস্তার ঘটানোর জন্য কুয়া, নদীনালা ইত্যাদির পানিতে বিষ প্রয়োগ করছে বা কুষ্ঠ জীবাণুযুক্ত কাপড়, তৈজসপত্র, তোয়ালে, বিছানার চাদর ইত্যাদি ধুচ্ছে। এই অপরাধে অনেককে আটক, হত্যা বা পুড়িয়ে মারার তথ্য পান সম্রাট পঞ্চম ফিলিপ। তিনি ২১ জুন ১৩২১ তারিখে সকল কুষ্ঠরোগীকে বন্দী ও তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার আদেশ দেন। এতে পরিস্থিতি আরও উতপ্ত হয়ে উঠে। এসময় ফ্রান্সের এ্যাকুইটেন অঞ্চলে কুষ্ঠ রোগী এবং ইহুদীদের বেশ কিছু বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়। পরে তাদের ধন-সম্পদ বা বাড়িঘর দখল করে নেয় অন্যরা। আরও গুজব রটানো হয় যে কুষ্ঠ রোগীরা তাদের প্রসাব, শরীরের পুঁজ ও রক্ত মিশিয়ে বিষ তৈরি করে পানির মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে যেন খৃষ্টান সম্প্রদায় ধ্বংস হয়ে যায়। একাজে স্বয়ং শয়তান জড়িত বলেও অপপ্রচার চালান হয়। এ গুজবের শাখা-প্রশাখার বিস্তার ঘটিয়ে আরও প্রচার করা হয় যে, কুষ্ঠ রোগীদের জন্য নির্ধারিত কলোনিতে ড্রামভর্তি রুটি পাওয়া গেছে যা ছিল বিষ ও জীবানু মিশানো এবং কুয়ার পানিতে ফেলার উদ্দেশ্যে প্রস্তুতকৃত। এই গুজব দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন স্থানে দাঙ্গা শুরু হয়। এই গুজবের পর ঠিক কতজন কুষ্ঠ রোগী বা ইহুদী প্রাণ হারায়, তার সঠিক কোন সংখ্যা জানা যায় নি। তবে বিভিন্ন এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে তাদেরকে বেঁধে গায়ে আগুন দেয়ার তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে একটি ঘটনায় সর্বোচ্চ ১৬০ জন হত্যার তথ্য পাওয়া যায়। এই গুজবের রেশ কাটতে অনেক বছর লেগেছিল।

গুজবের শিকার শিশুরা

পৃথিবীর বহুদেশে প্রাচীনকাল থেকেই শিশুদের গুম এবং হত্যা করার নানারকম ঘটনা এবং গুজবের তথ্য পাওয়া যায় বিভিন্ন সূত্রে। বিভিন্ন কারণে শিশুদের গুম এবং হত্যা করা হলেও মূলত নির্মাণ কাজ বিশেষত বড় কোনো স্থাপনা এবং সুনির্দিষ্টভাবে বড় কোনো সেতু নির্মানের সঙ্গে শিশুদের গুম এবং হত্যার যোগসূত্র পাওয়া যায় বিভিন্ন দেশে। প্রাচীনকালে ধারণা করা হত যে মাটি দেবতার সৃষ্টি। তাই এই মাটি খুঁড়তে হলে দেবতাকে তুষ্ট করতে হবে। মাটিই একটি ভারী বা সুউচ্চ স্থাপনার ভার বহন করে বিধায় বিভিন্ন ধর্মের মানুষ মাটির দেবতাকে তুষ্ট করতে গিয়ে বিভিন্ন আচার ও আরাধনা করতো। ল্যাটিন আমেরিকার বহুদেশে মাটির নিচে খনিতে কাজ করা শ্রমিকরা আজও মাটির দেবতার প্রতি সম্মান জানায় প্রতিনিয়ত। ডিসকভারি, ন্যাশনাল জিওগ্রাফি ও ইউটিউব চ্যানেলে খনির ভিতরে শ্রমিকদের মাটির দেবতার পূজা করার দৃশ্য দেখা যায়। প্রাচীনকালে পূজারীদের ধারণা ছিল যে, দেবতাকে তুষ্ট করার সবচেয়ে বড় উপকরণ হল তার প্রতি মানুষের বিশুদ্ধ রক্ত নিবেদন করা। যেহেতু শিশুদের পাপ ও পংকিলতার উর্ধ্বে বিবেচনা করা হয়, সেহেতু তাদের রক্ত বিশুদ্ধ এবং এই বিশুদ্ধ রক্তে দেবতা বেশি খুশী হবেন বিবেচনা করা হত। এ থেকেই শিশুদের গুম ও হত্যা করার কাহিনী, কল্পকাহিনী ও গুজবের সৃষ্টি ও প্রচার।

এবছর ৬ মার্চ মার্কিন সংবাদপত্র ওয়াশিংটন পোষ্টের তথ্যে জানা যায় যে, একদল গবেষক ৬ বছরের খনন কাজ শেষে ল্যাটিন আমেরিকান দেশ পেরু তে চীমু (Chimu) নামক একটি প্রত্নতাত্বিক স্থানের সন্ধান পেয়েছে যেখানে একসাথে ১৪০ জন শিশু এবং ২০০ পশুর কঙ্কাল রয়েছে। গবেষকদের ধারণামতে আনুমানিক ১৪৫০ সালের দিকে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ অথবা উগ্র আবহাওয়া থেকে পরিত্রাণ পেতে এভাবে শিশুদের হত্যা করা হয়। ২০১৮ সালের ২জুলাই ভারতের মহারাষ্ট্রের একটি গ্রামে বেদে বা যাযাবর ধরনের ৫ ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। গ্রামবাসীর মতে তাদের একজন একটি ছোট মেয়ের সঙ্গে কতাহ বলছিল। এতে গ্রামবাসীর মনে সন্দেহ হলে তাঁরা এই দলটিকে আটক করে ও জিজ্ঞাসাবাদ করে। কিন্তু সন্তোষোজনক জবাব না পাওয়ায় তাদের একজনকে একটি ঘরে আটক করে লাঠি ও পাথর দিয়ে পিটানো হয়। এই দৃশ্য হোয়াটস অ্যাপে ছড়িয়ে পড়লে গ্রামবাসী বাকীদের ওপর চড়াও হন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে হাজির হ্লে গ্রামবাসী পুলিশকেও আক্রমণ করে। একই বছর ভারতে এপ্রিল মাসে ১জন, মে মাসে ৬ জন এবং জুন মাসে ৫জন গণপিটুনিতে মারা যায় (সূত্র বিবিসি)। উইকিপিডিয়ামতে ২০১৭ সালের মে মাসে ভারতের জাহড়খণ্ডে হোয়াটস আপে ছড়ানো শিশু অপহরণ ভিত্তিক গুজবের কারণে গণপিটুনিতে ৭জন প্রাণ হারায়। ২০১৮ সালের ১৮জুলাই দিল্লি-পাটনা রুটের একটি ট্রেনের বগিতে শিশু পাচারকারী দল সন্দেহে যাত্রীদের আক্রমণ করে বিহারের জনতা। মৃতপ্রায় অবস্থায় তাদের ২৯জনকে পুলিশ উদ্ধার করে। বাংলাদেশে গুজব ছড়িয়ে মানুষ হত্যা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ কোনো নতুন বিষয় নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ের এ সংক্রান্ত কিছু ঘটনা বিশ্ব মিডিয়ায় সমালোচিত হচ্ছে। বিবিসি ২৪ জুলাই ২০১৮ তারিখে শিশু অপহরনের অভিযোগ তুলে ৩৮ জনকে পিটিয়ে হত্যার সংবাদ প্রকাশ করে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সাথে যোগাযোগের সুবিধার্থে নির্মানাধীন পদ্মা ব্রীজের মানুষের বিশেষত শিশুদের মাথা প্রয়োজন বলে সোশ্যাল মিডিয়া ও লোকমুখে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এতে বিভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন ঘটনায় ৮ জনকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করে উত্তেজিত জনতা। বর্তমানে অপরাধী সনাক্তকরণ এবং বিচার প্রক্রিয়া চলছে। বন্ধ করা হয়েছে বেশকিছু সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট।

শেষ কথা

লেবাননে জন্ম নেয়া আমেরিকার অর্থনীতি বিষয়ক গবেষক এবং শেয়ার বাজার বিশেষজ্ঞ জিয়াদ কে আব্দেল নূরের মতে মানুষকে যারা ঘৃণা করে, তারা গুজবের বহন করে, বোকারা তা প্রচার করে আর মূর্খরা তা বিশ্বাস করে। আসুন আমরা ঘৃণা ছড়ানো মানুষ, বোকা বা মূর্খের দলে না ভীড়ে সত্যের আলোয় উদ্ভাসীত হই।

বাংলা ইনসাইডার