ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bagan Bangla Insider

স্বপ্নের নায়কের চলে যাওয়ার ২৩ বছর

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ শুক্রবার, ০৮:০৭ এএম
স্বপ্নের নায়কের চলে যাওয়ার ২৩ বছর

দেশীয় চলচ্চিত্রের আকাশে ক্ষণজন্মা নক্ষত্র তিনি। একসময়ের বিপুল জনপ্রিয় এ মানুষটি আজও অনেক সোনালী স্মৃতিতে মোড়ানো। অকালে চলে যাওয়া আমাদের প্রিয় নায়ক। তিনি সালমান শাহ। আজ অবধি সিনেমা প্রেমীদের অন্তরে দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে উচ্চারিত হয়। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তার রহস্যঘেরা মৃত্যু হয়। বছর ঘুরে ফিরে এসেছে আজ আরেকটি ৬ সেপ্টেম্বর।

পারিবারিক নাম শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন। বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী ও মা নীলা চৌধুরী। দুই ভাইয়ের মধ্যে সালমান বড়। জন্ম ১৯৭১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের দারিয়া পাড়ায় নানাবাড়িতে।

তিনি ঢাকার ধানমন্ডি আরব মিশন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। সেই সময়ে বন্ধুমহলে সবাই তাঁকে কণ্ঠশিল্পী হিসেবে চিনত। ১৯৮৬ সালে ছায়ানট থেকে পল্লিগীতিতে উত্তীর্ণও হয়েছিলেন তিনি। পরবর্তীতে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট ও ধানমন্ডির মালেকা সায়েন্স কলেজ থেকে বি. কম পাস করেন। সেই সময়েই বন্ধুদের বলতেন তাঁর স্বপ্নের কথা। বলতেন একদিন অনেক বড় অভিনেতা হবেন তিনি।

ছোটবেলা থেকেই সালমান দারুণ ফ্যাশনেবল আর স্টাইলিস্ট। আশির দশকে হানিফ সংকেতের গ্রন্থনায় ‘কথার কথা’ ম্যাগাজিনে ‘নামটি ছিল তার অপূর্ব’ নামের একটি মিউজিক ভিডিও ছিল। হানিফ সংকেতের স্বকণ্ঠে গাওয়া গান নিয়ে মিউজিক ভিডিওটি বিশেষভাবে নির্মিত হয়েছিল।

একজন সম্ভাবনাময় তরুণ তার পরিবারের নানারকমের ঝামেলার কারণে মাদকাসক্ত হয়ে মারা যায়। এতে নাম ভূমিকায় অভিনয়ের মাধ্যমেই সালমান শাহ’র মিডিয়ায় আগমন। এরপর তিনি আব্দুল্লাহ আল মামুনের প্রযোজনায় ‘পাথর সময়’ নাটকে কাজ করেন, সেসময় বেশকিছু বিজ্ঞাপনচিত্রেও মডেল হয়েছিলেন।

নায়ক সালমানের আত্মপ্রকাশ ১৯৯৩ সালের ২৫ মার্চ। সময়টা ছিল রোজার ঈদের। হিন্দিতে তুমুল জনপ্রিয়তা পাওয়া ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’ ছবির কপিরাইট কিনে আনন্দমেলা সিনেমা লিমিটেড পরিচালক সোহানুর রহমান সোহানকে দিয়ে তৈরি করে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’। নায়িকা জনপ্রিয় মডেল আনন্দবিচিত্রা সুন্দরী মৌসুমীর সঙ্গে ইমন জুটি বেধে হলেন বাংলার প্রিয় নায়ক সালমান শাহ।

বাংলাদেশী ছবির প্রায় ৫০ বছরের ইতিহাসে সালমানই একমাত্র নায়ক যিনি সর্বমহলে গ্রহণযোগ্যতা এবং তরুণদের স্টাইল আইকন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছিলেন। বাংলা ছবির নায়কদের মধ্যে সালমান ছাড়া অন্য কারও ফ্যাশন, স্টাইল লোকে তার আগে বা পরে কখনোই অনুসরণ করেনি।

বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নায়িকার সঙ্গে জুটি বেধে চমক ফেলেছেন তিনি। দর্শকের সামনে নিজেকে মেলে দিলেন একেবারেই ভেঙ্গেচুরে নতুন আঙ্গিকে, অ্যাকশন রোমান্টিক হিরো হিসেবে। বৈচিত্রময় চরিত্রে নিত্যনতুন স্টাইল আর ফ্যাশনে নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন অনেক উঁচুতে।

বেশকিছু ছবিতে নায়ক হিসেবে সাফল্য পাওয়ার কয়েকমাস পরই সালমান বিয়ে করেন জাতীয় দলের প্রাক্তন উইকেটকিপার-অধিনায়ক শফিকুল হক হীরা এবং থাইল্যান্ডের নাগরিক চট্টগ্রামের বিউটিপার্লার ব্যবসায়ী লুসির কন্যা সামিরাকে।

বিয়ের পরবর্তী সময়ে সালমান-শাবনূর জুটি তুমুল জনপ্রিয়তা পাওয়ায় তারা একসঙ্গে প্রচুর ছবিতে কাজ করতে থাকেন। সালমানের সর্বমোট মুক্তিপ্রাপ্ত ২৭টি ছবির ১৪টিতেই তার নায়িকা ছিলেন শাবনুর। স্বাভাবিকভাবেই এই জুটিকে নিয়ে ইন্ডাস্ট্রিতে কানাঘুষা শুরু হয়। মৃত্যুর পিছনেও এই কানাঘুষার হাত ছিল বলে জানা যায়।

সালমান চলে গেছেন, রেখে গেছেন অনেক প্রিয় মানুষ ও কাজের সহকর্মী আর ভক্তদের।

মৌসুমীর সঙ্গে প্রথম ছবিতে জুটি বাঁধলেও পরবর্তীতে শাবনূরের সঙ্গে জুটি গড়ে একের পর এক ব্যবসা সফল ছবি উপহার দেন সালমান। ১৯৯৩ সালের ২৫ মার্চ ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ মুক্তির পর মাত্র ৪ বছরের মধ্যেই করে ফেলেন ২৭টি ছবি।

সালমান শাহ অভিনীত ছবিগুলো হচ্ছে- কেয়ামত থেকে কেয়ামত, তুমি আমার, অন্তরে অন্তরে, সুজন সখী, বিক্ষোভ, স্নেহ, প্রেমশক্তি, কন্যাদান, দেনমোহর, স্বপ্নের ঠিকানা, আঞ্জুমান, মহামিলন, আশা ভালোবাসা, বিচার হবে, এই ঘর এই সংসার, প্রিয়জন, তোমাকে চাই, স্বপ্নের পৃথিবী, জীবন সংসার, মায়ের অধিকার, চাওয়া থেকে পাওয়া, প্রেম পিয়াসী, স্বপ্নের নায়ক, শুধু তুমি, আনন্দ অশ্রু, সত্যের মৃত্যু নেই এবং বুকের ভেতর আগুন।

মৃত্যুর আগে যেসব ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন কিন্তু কাজ করতে পারেননি- শেষ ঠিকানা, প্রেমের বাজি, আগুন শুধু আগুন, কে অপরাধী, মন মানে না, ঋণ শোধ, তুমি শুধু তুমি তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

ক্যারিয়ারের তুমুল জনপ্রিয়তার মাঝে ঘটে আকস্মিক দুর্ঘটনাটা। কোটি কোটি ভক্তদের শোক সাগরে ভাসিয়ে বুকের ভেতর গোপন কষ্টের চাপা অভিমান ধরে রেখে জীবনের ওপারে পাড়ি জমালেন তিনি। কি সেই অভিমান আজও সুরাহা হয়নি তার!

মাত্র ২৭ বছর বয়স ছিল তার তখন। ১৯৯৬ সালের এই দিনে চলে যান তিনি। আত্মহত্যা নাকি হত্যা, সেটা আজও সুরাহা হয়নি। মৃত্যুর আগেরদিন রাতে পরিচালক মতিন রহমানকে সালমান শাহ বলেছিলেন, ‘বাবা, আমি ভালো হয়ে গেছি। কাল থেকে আর কাউকে কষ্ট দেব না। তোমাদের চেষ্টায় আজ আমি ইমন থেকে সালমান। আগামীকালের সকাল হবে সবার জন্য প্রিয় সকাল।’

পরিচালক মতিন রহমানকে বাবা বলে ডাকত সালমান। পরেরদিন সকালবেলাটা আর চোখ মেলে দেখেনি সালমান। আমরা আজও জানিনা কেন তিনি চলে গিয়েছিলেন।

নিজের এক লেখায় পরিচালক মতিন রহমান সালমান শাহকে এভাবেই পরিচয় করিয়ে দেন, ‘সালমান চলচ্চিত্রে আসার আগে বাঙালী দর্শক একজন আধুনিক চিন্তার, যুব বা যুবাজনের পছন্দ-স্বপ্নের তারকার অভাব বোধ করছিল। এই অভাববোধের জন্ম নায়ক জাফর ইকবালের মৃত্যুর পর।’

সিলেটের শাহজালাল মাজারে সমাহিত হয়েছেন এ নায়ক। তাঁর কবরের সামনে এখনো প্রতিদিন ভিড় হয়। ১৬ বছরেও শোকের আগুনে ভাটা পড়েনি। প্রযোজক-পরিচালকরা বলেন, সালমানের বিকল্প এই এতদিনেও পাওয়া যায়নি।

২৭টি ছবিতে অভিনয় করেছেন সালমান, এর মধ্যে ২০টি ছবিই ব্যবসায়িকভাবে সফল। সর্বকালের সেরা স্টাইলিস্ট ও ফ্যাশনেবল আইকন হিরো সালমান বেঁচে থাকবেন তাঁর ভক্ত-অনুরাগীদের হৃদয়ে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। আজীবন ক্রেজ হিসেবে সালমান বেঁচে থাকুক আমাদের মাঝে।

 

বাংলা ইনসাইডার/এসএইচ