ঢাকা, সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯, ৬ কার্তিক ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেরণা যিনি

অর্চি হক
প্রকাশিত: ০২ অক্টোবর ২০১৯ বুধবার, ০৬:৪৮ পিএম
বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেরণা যিনি

যেসব রাজনীতিবিদ ইতিহাসের গতি নির্ধারণ করেছেন, শান্তি, মানবতা এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন সেই তালিকায় যে নাম দুটো একেবারে উপরের দিকে থাকবে- তারা হলেন মহাত্মা গান্ধী আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। গান্ধী এবং বঙ্গবন্ধু, এরা দুজন ছিলেন ভিন্ন সময়ের মানুষ। কিন্তু তবুও বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে মিশে আছেন গান্ধী। যে বছর বঙ্গবন্ধু জন্মগ্রহণ করেন, সে বছরই অর্থাৎ ১৯২০ সালে মহাত্মা গান্ধী তার অহিংস ও অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেন। বঙ্গবন্ধু চূড়ান্তভাবে স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু করার বহু আগেই নিহত হন গান্ধী। কিন্তু গান্ধীর চেতনা ও আদর্শ আমৃত্যু লালন করেছেন জাতির পিতা। তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে গান্ধীর কথা, শান্তির কথা।

জাতির পিতা আত্মকথায় লিখেছেন, ‘শহীদ সাহেবের সাথে কয়েক জায়গায় আমার যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। মহাত্মা গান্ধীর সাথে শহীদ সাহেব হিন্দু-মুসলমান শান্তি কায়েম করার জন্য কাজ করছিলেন। তখন মুসলমানদের উপর মাঝে মাঝে আক্রমণ হচ্ছিল। সেদিন রবিবার ছিল। আমি সকালবেলা শহীদ সাহেবের বাসায় যাই। তিনি আমাকে বললেন, “চল, ব্যারাকপুর যাই। সেখানে খুব গোলমাল হয়েছে। মহাত্মা গান্ধীও যাবেন।” আমি বললাম, ‘যাব স্যার।’ তাঁর গাড়ীতে উঠলাম, নারকেলডাঙ্গা এলাম। সেখান থেকে মহাত্মাজী, মনু গান্ধী, আভা গান্ধী ও তাঁর সেক্রেটারি এবং কিছু কংগ্রেস নেতাও সাথে চললেন। ব্যারাকপুরের দিকে রওয়ানা করলাম। হাজার হাজার লোক রাস্তার দু’পাশে ভিড় করেছে, তাদের শুধু এক কথা, ‘বাপুজী কি জয়’। ব্যারাকপুরে পৌঁছে দেখি, এক বিরাট সভার আয়োজন হয়েছে। মহাত্মাজী রবিবার কারো সাথে কথা বলেন না, বক্তৃতা তো করবেনই না। মনু গান্ধী ও আভা গান্ধী ‘আলহামদু’ সুরা ও ‘কুলহু’ সুরা পড়লেন। তারপরে রামবন্ধনা গান গাইলেন। মহাত্মাজ্বী লিখে দিলেন, তাঁর বক্তৃতা সেক্রেটারি পড়ে শোনালেন। সত্যই ভদ্রলোক জাদু জানতেন। লোকে চিৎকার করে উঠল, হিন্দু-মুসলমান ভাই ভাই। সমস্ত আবহাওয়ার পরিবর্তন হয়ে গেল এক মুহূর্তের মধ্যে। এর দু’দিন পরেই বোধহয় ঈদের নামাজ হল। মুসলমানরা ভয় পেয়ে গেছে ঈদের নামাজ পড়বে কি পড়বে না? মহাত্মাজ্বী ঘোষণা করলেন, যদি দাঙ্গা হয় এবং মুসলমানদের উপর কেউ অত্যাচার করে তবে তিনি অনশন করবেন। মহল্লায় মহল্লায় বিশেষ করে হিন্দি ভাষাভাষী লোকেরা শোভাযাত্রা বের করে স্লোগান দিতে লাগল, ‘মুসলমানকো মাত মারো, বাপুজী অনশন কারেগা। হিন্দু-মুসলমান ভাই ভাই।’ ঈদের দিনটা শান্তিতেই কাটল।’

জাতির পিতা তাঁর স্মৃতি হাতড়ে আরও লিখেছেন, ‘আমি আর ইয়াকুব নামে আমার এক ফটোগ্রাফার বন্ধু পরামর্শ করলাম, আজ মহাত্মাজীকে একটা উপহার দিব। ইয়াকুব বলল, “তোমার মনে আছে আমি আর তুমি বিহার থেকে দাঙ্গার ফটো তুলেছিলাম?” আমি বললাম, “হ্যাঁ মনে আছে।” ইয়াকুব বলল, “সমস্ত কলকাতা ঘুরে আমি ফটো তুলেছি। তুমি জান না তার কপিও করেছি। সেই ছবিগুলি থেকে কিছু ছবি বেছে একটা প্যাকেট করে মহাত্মাজীকে উপহার দিলে কেমন হয়।” আমি বললাম, “চমৎকার হবে। চল যাই, প্যাকেট করে ফেলি।” যেমন কথা, তেমন কাজ। দুইজনে বসে পড়লাম। তারপর প্যাকেটটা এমনভাবে বাঁধা হল যে, কমপক্ষে দশ মিনিট লাগবে খুলতে। আমরা তাঁকে উপহার দিয়েই ভাগব। এই ফটোর মধ্যে ছিল মুসলমান মেয়েদের স্তন কাটা, ছোট শিশুদের মাথা নাই, শুধু শরীরটা আছে, বস্তি, মসজিদে আগুনে জ্বলছে, রাস্তায় লাশ পড়ে আছে, এমনই আরও অনেক কিছু। মহাত্মাজী দেখুক, কিভাবে তাঁর লোকেরা দাঙ্গাহাঙ্গামা করেছে এবং নিরীহ লোককে হত্যা করেছে।
আমরা নারকেলডাঙায় মহাত্মাজীর ওখানে পৌঁছালাম। তাঁর সাথে ঈদের মোলাকাত করব বললাম। আমাদের তখনই তাঁর কামরায় নিয়ে যাওয়া হল। মহাত্মাজী আমাদের কয়েকটা আপেল দিলেন। আমরা মহাত্মাজীকে প্যাকেটটা উপহার দিলাম। তিনি হাসিমুখে গ্রহণ করলেন। আমরা অপরিচিত সেদিকে তাঁর ভ্রুক্ষেপ নাই। তবে বুঝতে পারলাম, তাঁর নাতনী মনু গান্ধী আমার চেহারা দেখেছে ব্যারাকপুর সভায়, কারণ আমি শহীদ সাহেবের সাথে প্লাটফর্মে বসেছিলাম। আমরা উপহার দিয়ে চলে এলাম তাড়াতাড়ি হেঁটে। শহীদ সাহেব তখন ওখানে নাই। বন্ধু ইয়াকুবের এই ফটোগুলি যে মহাত্মা গান্ধীর মনে বিরাট দাগ কেটেছিল তাতে সন্দেহ নাই।’

এভাবেই বঙ্গবন্ধুর বহু লেখা, বক্তৃতা এবং আলোচনায় বারবার চলে এসেছেন গান্ধী এবং তার অহিংস নীতির প্রসঙ্গ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ক্ষেত্রেও বঙ্গবন্ধু সবসময় চেয়েছিলেন, বাঙালি অথবা পাকিস্তানি যে ই হোক না কেন, কারও যেন কোনো রক্ত না ঝরে।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির জন্য পৃথক রাষ্ট্রের চিন্তা করেছিলেন। এ জন্য তাকে সুদীর্ঘ ২৩ বছর সংগ্রাম করতে হয়েছে, আন্দোলন করতে হয়েছে। তাঁর এ আন্দোলন ছিল সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক উপায়ে। শান্তিপূর্ণ হরতাল, অবরোধ, মিছিল, মিটিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তিনি কখনও আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে বেছে নেননি। বরং গণতান্ত্রিক উপায়ে আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করাই ছিল মূল লক্ষ্য। এই শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রেরণাটা তিনি পেয়েছিলেন গান্ধীর কাছ থেকে। এজন্য বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রাণপুরুষ যেমন বঙ্গবন্ধু, তেমনি আমাদের মুক্তির আন্দোলনের প্রেরণাপুরুষ হয়ে আছেন মহাত্মা গান্ধী।

বাংলা ইনসাইডার/এএইচসি