ঢাকা, সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯, ৬ কার্তিক ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

চে গুয়েভারা: ইতিহাসে বিপ্লবের এক নন্দিত চরিত্র

শাহরিনা হক
প্রকাশিত: ০৯ অক্টোবর ২০১৯ বুধবার, ০৮:০০ এএম
চে গুয়েভারা: ইতিহাসে বিপ্লবের এক নন্দিত চরিত্র

ইতিহাসের এক নন্দিত চরিত্রের নাম চে গুয়েভারা। জীবন কেটেছে সংগ্রামে, বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাত আর অসংখ্য বৈচিত্রতায়। তিনি ছিলেন একজন আর্জেন্টিয়ান মার্কসবাদী, বিপ্লবী, চিকিত্সক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, গেরিলা নেতা, কূটনীতিবিদ, সামরিক তত্ত্ববিদ এবং কিউবার বিপ্লবের প্রধান ব্যক্তিত্ব। তার প্রকৃত নাম ছিল এর্নেস্তো গেভারা দে লা সের্না। তবে তিনি সারাবিশ্ব লা চে বা কেবলমাত্র চে নামেই পরিচিত। মৃত্যুর পর তার শৈল্পিক মুখচিত্রটি একটি সর্বজনীন প্রতিসাংস্কৃতিক প্রতীক এবং এক জনপ্রিয় সংস্কৃতির বিশ্বপ্রতীকে পরিণত হয়। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে নিভে গিয়েছিল জীবনপ্রদীপ। ১৯৬৭ সালের ৯ অক্টোবর তিনি চলে যান এই রহস্যভরা পৃথিবী ছেড়ে। তার মৃত্যুদিনে তাকে বিশেষভাবে স্মরণ করছি আমরা।

‘গুলি কোরো না। আমি চে গুয়েভারা। মৃত চে গুয়েভারার চেয়ে জীবিত চে গুয়েভারা তোমাদের জন্য বেশি মূল্যবান।’ বিপ্লবী নেতা চে গুয়েভারার জীবনের শেষ কথা ছিল এটিই।

ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে লেখা ছিল, ‘হাঁটুতে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাত থেকে নিজের রাইফেল খসে পড়লে বলিভিয়ার জঙ্গলে আত্মসমর্পণে বাধ্য হন চে। ঘিরে থাকা সৈন্য থেকে বাঁচতে আরনেস্তো চে গুয়েভারার শেষ আকুতি ছিল, ‘গুলি কোরো না।’

১৯২৮ সালের ১৪ জুন আর্জেন্টিনায় জন্ম নেন চে। পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন জৈষ্ঠ্যতম। ছোটবেলা থেকেই চে ছিলেন চঞ্চল। শৈশব থেকেই সমাজের বঞ্চিত, অসহায়, দরিদ্রদের প্রতি মমত্ববোধ তার ভিতর তৈরি হতে থাকে।

একটি সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারার পরিবারে বেড়ে ওঠার কারণে খুব অল্প বয়সেই রাজনীতি সম্পর্কে বিশদ জ্ঞানলাভ করেন চে।

হাঁপানিতে সারাজীবন ভোগা সত্ত্বেও তিনি দারুন মল্যবিদ ছিলেন। পছন্দের তালিকায় ছিল সাঁতার, ফুটবল,গলফ, শুটিং। চে সাইক্লিংয়ের একজন অক্লান্ত খেলোয়াড় ছিলেন। তিনি রাগবি ইউনিয়নের একজন অতি আগ্রহী সদস্য ছিলেন এবং বুয়েনস এয়ারস বিশ্ববিদ্যালয় রাগবি দলের হয়ে খেলেছেনও।

রাগবি খেলার ক্ষিপ্রতার জন্য তাকে ‘ফিউজার’ নামে ডাকা হতো। গোসলের ব্যাপারে চে ছিলেন বেশ অনিয়মিত এবং সপ্তাহে একবার মাত্র পোশাক বদলাতেন। ১২ বছর বয়সে দাবা খেলা শেখেন তার বাবার কাছে এবং স্থানীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে শুরু করেন।

শৈশব থেকেই তিনি কার্ল মার্কস, উইলিয়াম ফকনার, এমিলিও সরগারির বইয়ের পাশাপাশি জওহরলাল নেহরু, আলবার্ট ক্যামাস, ভ্লাদিমির লেলিন, রবার্ট ফ্রস্টের বইও পড়েছেন। কোনো ধর্মে বিশ্বাসী না হয়ে এভাবেই নিজেকে একজন সমাজসচেতন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন।

যুবক বয়সে মেডিসিন বিষয়টি নিয়ে পড়ার সময় চে দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করেন। আর এটিই তাকে অসহায় মানুষের দুঃখ কষ্ট অনুধাবন করার সুযোগ এনে দেয়। সেসময় চে বুঝতে পারেন ধনী গরিবের এই ব্যবধান ধ্বংসের জন্য বিপ্লব ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তখন থেকেই তিনি মার্কসবাদ নিয়ে পড়ালেখা শুরু করেন এবং স্বচক্ষে এর বাস্তব প্রয়োগ দেখার জন্য গুয়াতেমালা ভ্রমণ করেন।

এই বিশ্বাস নিয়েই চে রাষ্ট্রপতি জাকোবো আরবেনজ গুজমানের নেতৃত্বাধীন গুয়াতেমালার সামাজিক সংস্কার আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৫৪ সালে সিআইএ এর ষড়যন্ত্রে গুজমানকে ক্ষমতাচ্যুত করা হলে চে`র বৈপ্লবিক আদর্শ চেতনা বদ্ধমূল হয়। পরবর্তীকালে মেক্সিকো সিটিতে বসবাসের সময় তার সঙ্গে রাউল ও ফিদেল কাস্ত্রোর আলাপ হয়।

চে তাদের `ছাব্বিশে জুলাই` আন্দোলনে যোগ দেন। মার্কিন মদদপুষ্ট কিউবান একনায়েক ফুলজেনসিও বাতিস্তাকে উৎখাত করার জন্য সমুদ্রপথে কিউবায় প্রবেশ করেন। খুব অল্পদিনেই চে বিপ্লবী সংঘের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। 

সেকেন্ড ইন কমান্ড পদে তার পদোন্নতি হয় এবং বাতিস্তা সরকারকে উৎখাত করার লক্ষ্যে দুই বছর ধরে চলা গেরিলা সংগ্রামের সাফল্যের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

কিউবার বিপ্লবের পর চে নতুন সরকার দলে একাধিক ভূমিকা পালন করেছিলেন। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য, বিপ্লবী আদালতে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্তদের আপিল পুনর্বিবেচনা ও ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড প্রদান, শিল্পোদ্যোগ মন্ত্রী হিসেবে খামার সংস্কার আইন প্রবর্তন, কিউবার জাতীয় ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ও সামরিক বাহিনীর ইনস্ট্রাকশনাল ডিরেক্টরের ভূমিকা পালন, এবং কিউবান সমাজতন্ত্রের প্রচারে বিশ্বপর্যটন করেন।

এই পদাধিকারের কল্যাণে তিনি মিলিশিয়া বাহিনীকে প্রশিক্ষণ প্রদানের সুযোগ পান। এর ফলে এই বাহিনী পিগ উপসাগর আক্রমণ করে তা পুনর্দখলে সক্ষম হয়। কিউবায় সোভিয়েত পরমাণু ব্যালিস্টিক মিসাইল আনার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এই সময় তিনি বিভিন্ন নিবন্ধ ও বই রচনা করেন। গেরিলা যুদ্ধের ওপর তিনি একটি ম্যানুয়েল রচনা করেন। পরে ১৯৬৫ সালে চে মেক্সিকো ত্যাগ করেন। তার ইচ্ছা ছিল কঙ্গো-কিনশাসা ও বলিভিয়াতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা।

বলিভিয়াতে থাকার সময় তিনি সিআইএ মদদপুষ্ট বলিভিয়ান বাহিনীর কাছে ধরা পড়েন। বলিভিয়ার সেনাবাহিনীর ভাষ্যমতে তারা গুয়েভারাকে ৭ অক্টোবর গ্রেপ্তার করে এবং তার মৃত্যু হয় ৯ অক্টোবর ১৯৬৭ সাল বেলা ১টা ১০ মিনিটে।

মৃত্যুর এ সময়কাল এবং ধরণ নিয়ে মতভেদ এবং রহস্য এখনো আছে। ধারণা করা হয় ১৯৬৭ সালের এই দিনটিতে লা হিগুয়েরা নামক স্থানে নিরস্ত্র অবস্থায় নয়টি গুলি করে হত্যা করা হয় বন্দি চে গুয়েভারাকে।

পরে বলিভিয়ার সেনাবাহিনী ঘোষণা করে যে বন্দি অবস্থায় নয়টি গুলি চালিয়ে সেই আর্জেন্টাইন ‘সন্ত্রাসবাদী’কে মেরে ফেলতে পেরেছে এক মদ্যপ সৈনিক। তবে আরেকটি মতামত হচ্ছে, এইদিন যুদ্ধে বন্দি হলেও তাকে এবং তার সহযোদ্ধাদের হত্যা করা হয় কিছুদিন পর। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার বিভিন্ন প্রতিবেদনে পরবর্তীতে এইসব দাবির স্বপক্ষে কিছু প্রমাণ পাওয়া যায়।

চে গুয়েভারাকে গোপনে গণকবরে সমাহিত করার আগে বলিভীয় সৈন্যরা তার হাড্ডিসার দেহ ভ্যালেগ্রেরান্ডি নামের একটি গ্রামে নিয়ে যায়। মরদেহটি একটি হাসপাতালের লন্ড্রির সিঙ্কে রাখা হয়।

এসময় ফটোগ্রাফাররা তার যেসব ছবি তোলেন, তা পরে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। বলিভীয় সেনা অধিনায়ককে বলা হয় তার দুটি হাত কেটে রাখতে। যাতে কর্তৃপক্ষ তার আঙুলের ছাপ নিতে পারে এবং প্রমাণ হিসেবে ফিদেল কাস্ত্রোকে দেখাতে পারে যে তার বন্ধু এখন মৃত।

চে গুয়েভারার মৃত্যুর খবর সঙ্গে সঙ্গে নয়, কিছুদিন পর যুক্তরাষ্ট্রে আসে। প্রেসিডেন্ট জনসনের উপদেষ্টা ওয়াল্ট রোসটো ১৯৬৭ সালের ১৩ অক্টোবর একটি সংক্ষিপ্ত স্মারকপত্র লেখেন,

‘সব ধরনের সন্দেহ দূরীভূত করে বলা যায় যে চে গুয়েভারা মৃত।’

১৯৬৭ সালের ১২ অক্টোবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল-

‘গুয়েভারা’স ডেথ, দ্য মিনিং অব ল্যাটিন আমেরিকা’।

এতে গুয়েভারাকে কিউবা বিপ্লবের সুদক্ষ রণকৌশলী ব্যক্তিত্ব ও বিপ্লবের আদর্শ হিসেবে প্রশংসা করা হয় এবং তিনি বীরোচিত মৃত্যুবরণ করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়।

নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকা তখন লিখেছিল, ‘একজন মানুষের সঙ্গে সঙ্গে একটি রূপকথাও চিরতরে বিশ্রামে চলে গেল।’

১৯৯৭ সালে ভ্যালেগ্রান্দের একটি গণকবরে চে ও তার সহযোদ্ধাদের দেহাবশেষ আবিষ্কৃত হয়। চে গুয়েভারা’র মৃত্যুর এতোবছর পরও দেশে দেশে বিপ্লবীদের আজও প্রেরণার উৎস চে গুয়েভারা।

বাংলা ইনসাইডার/এসএইচ