ঢাকা, রোববার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ১ পৌষ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

শহীদ নূর হোসেন: গণতন্ত্রের অন্য নাম

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০ নভেম্বর ২০১৯ রবিবার, ০৮:০১ এএম
শহীদ নূর হোসেন: গণতন্ত্রের অন্য নাম

‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ – স্লোগানটির সঙ্গে আমরা সবাই পরিচিত। এ স্লোগানটি বুকে ও পিঠে ধারণ করে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর অর্থাৎ এ দিনে শহীদ হয়েছিলেন অকুতোভয় এক মানুষ। নূর হোসেন তাঁর নাম। সেই থেকে তিনি যেন গণতন্ত্রের আরেক নাম।

১৯৬৪ সালের কোনো এক পড়ন্ত বিকেলে ঢাকার নারিন্দায় মজিবুর রহমান ওরফে কাঞ্চন মিয়া ও মরিয়ম বেগমের কোলে আসে তাদের তৃতীয় পুত্র। হয়তো ভেবেছিলেন এই সন্তান তাদেরকে নূরের মতোই আলোকিত করবে। সে কারণে সন্তানের নাম রাখলেন নূর হোসেন। ঢাকার নারিন্দায় জন্মগ্রহণ করলেও তার পৈতৃক নিবাস ছিল পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার সাপলেজা ইউনিয়নের ঝাটিবুনিয়া গ্রামে।

দুরন্ত ও চঞ্চল স্বভাবের নূর হোসেনের শৈশব কাটে দরিদ্রতার মধ্য দিয়েই। অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি হবার পর পড়াশোনা ছেড়ে মোটর মেকানিকের কাজ শুরু করতে হয়েছিল। তবে জ্ঞানের অন্বেষণ থেমে থাকেনি তার। নিয়মিতই পড়তেন পত্রিকা, রাখতেন দেশ-বিদেশের সব রকমের খবরাখবর। তারই ফলস্বরূপ নিজের প্রচেষ্টায় কাজের বিরতিতে অবসর সময়কে কাজে লাগিয়ে এবং যে দারিদ্র্যের কারণে তার পড়াশুনা বন্ধ হয়েছিল, তাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সদরঘাটের কলেজিয়েট নৈশ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাশ করেন।

পড়াশোনার পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবেও বেশ সচেতন হয়ে উঠছিলেন নূর হোসেন। দেশের সঙ্কটের কথা বুঝতে পেরে তখন থেকেই স্থানীয় রাজনীতিতে যোগ দেন তিনি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে গিয়ে ধীরে ধীরে বিভিন্ন মিটিং, মিছিলে হয়ে ওঠেন সক্রিয় এবং একটা সময় এই মিটিং, মিছিল, আন্দোলনই হয়ে যায় তার প্রাণ।

১৯৮৬ সালের নির্বাচন পরবর্তী সময়ে শুরু হয় সরকার পতনের আন্দোলন। ক্রমেই আন্দোলন হতে থাকে বিস্তৃত। দেশের হাজার হাজার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয় এই আন্দোলনে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর ঢাকা মহানগর অবরোধের ডাক দেয় পাঁচ, সাত ও আট দলীয় জোট। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার সে বছরের ৯ – ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় সবধরনের সভা-সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ করে। এমনকি চারজনের বেশি মানুষের একসাথে চলাফেরার ওপরেও নিষেধাজ্ঞা জারি করে। অবরোধে অংশগ্রহণের জন্য দু’দিন আগেই বাসা থেকে পালিয়ে যান নূর হোসেন। অবরোধের দিন সকালে বাবা-মা তাকে খুঁজতে বের হলে মতিঝিলে নির্মাণাধীন ডিআইটি মসজিদের (বর্তমানে রাজউক মসজিদ) দোতলায় তাকে খুঁজে পান। মিছিলে অংশগ্রহণের পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে আগেই নিজের বুকে-পিঠে স্লোগান লিখে রেখেছিলেন। বাবা-মাকে দেখে তা ঢেকে ফেললেও মায়ের চোখকে ফাঁকি দিতে পারেননি। আতঙ্কগ্রস্ত মা তাকে বাড়ি ফিরে যেতে বললেও তিনি বাড়ি ফিরে যাননি।

‘স্বৈরাচার নীপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ সাদা রঙ দিয়ে নূর হোসেনের তামাটে গায়ের বুকে-পিঠে স্লোগানটি লিখে দিয়েছিল তার বন্ধু মোঃ ইকরাম হোসেন। কেডস, জিন্সের প্যান্ট পরে খালি গায়ে বুকে-পিঠে তার অমর স্লোগান লিখে সেদিন সেই মসজিদ থেকে বের হয়ে গিয়েছিলেন তিনি।

স্বৈরাচারী সরকার পতনের জন্য সংগঠিত সুবিশাল মিছিলের প্রধান ফোকাস ছিলেন সাধারণ বেবিট্যাক্সি চালকের ছেলে, অদম্য সাহসী বীর নূর হোসেন। সেদিন তার চোখেমুখে যেন ছিলো আগুনের ফুলকি। বুকে-পিঠে লেখা ছিল স্বাধীন বাংলার জনগণের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি। সত্যিই জনতার মাঝে সেদিন এক অন্য রকম মুখ ছিলেন তিনি। সকলের চোখে পড়েছিলো তা। ফাঁকি দিতে পারেননি স্বৈরশাসকের লেলিয়ে দেয়া পুলিশ বাহিনীর চোখকেও। মিছিলটি যখন গুলিস্তান জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি পৌঁছায়, ঠিক তখনই শুরু হয় মিছিলের উপর পুলিশের গুলিবর্ষণ। একটি গুলি এসে ছিদ্র করে দেয় নূর হোসেনের বুক।

বায়তুল মোকাররমের মূল গেটের কাছে মুহূর্তের মধ্যে লুটিয়ে পড়েন নূর হোসেন। মরণ যন্ত্রণায় ছটফট করা নূর হোসেনকে সুমন নামে এক যুবক রিকশায় করে হাসপাতালের দিকে যান। গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজারের কাছে পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়ায় স্বৈরাচারীর পুলিশ বাহিনী। তাদের কয়েকটি গাড়ি এসে রিকশাটিকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে। গুলিবিদ্ধ নূর হোসেনকে টেনে হিঁচড়ে রিকশা থেকে নামিয়ে পুলিশ গাড়িতে তুলে নেয়। একজন নিষ্ঠুর পুলিশ সদস্য পায়ের বুট দিয়ে তাঁর বুকে চেপে ধরে। এরপর নূর হোসেনকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে নিতে বাধ্য হন বাংলার এই সাহসী বীর সন্তান।

শহীদ নূর হোসেনের রক্তদানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন তীব্রতর হয় এবং অব্যাহত লড়াই সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটে। মুক্তি পায় গণতন্ত্র।

নুর হোসেনের আত্মত্যাগের পর তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রাজধানীর জিরো পয়েন্ট এলাকার নাম শহীদ নূর হোসেন স্কয়ার করা হয় এবং ১০ নভেম্বরকে শহীদ নূর হোসেন দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।  আওয়ামী লীগ ১০ নভেম্বরকে প্রথম নুর হোসেন দিবস হিসেবে পালন শুরু করে। সেইসঙ্গে বুকে পিঠে ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক, স্বৈরাচার নিপাত যাক’ স্লোগান লেখা তার ছবিটি পৃথিবীর সকল স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদের এক অমূল্য প্রতীক হয়ে উঠেছে।

বাংলা ইনসাইডার/এএইচসি