ঢাকা, রোববার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ১ পৌষ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

আজও স্মৃতিতে ভাস্বর হুমায়ূন আহমেদ

শাহরিনা হক
প্রকাশিত: ১৩ নভেম্বর ২০১৯ বুধবার, ০৮:০০ এএম
আজও স্মৃতিতে ভাস্বর হুমায়ূন আহমেদ

মাঝেমাঝেই মনে হয়, আজ তিনি বেঁচে থাকলে কেমন হতো, আরও কতোই না বিস্ময়ের জন্ম দিতেন তিনি। আবার মাঝেমাঝে তো মনে হয় তিনি তো আছেনই! কারণ মানুষটির বাস পাঠকের হৃদয়ে, তাকে এতো সহজে তো আর দূরে সরানো যায় না। তিনি বাংলাদেশের নন্দিত কিংবদন্তী কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। আজ এই কিংবদন্তীর জন্মদিন, এই দিনে তাকে আমরা আরও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।

বড়ই বৈচিত্র্যময় জীবনের অধিকারী ছিলেন তিনি। বিচিত্রতা শুরু হয় তাঁর জন্মলগ্ন থেকেই। বাবা ফয়জুর রহমানের ইচ্ছা ছিল তাঁর প্রথম সন্তানটি মেয়ে হোক। তাই সন্তান জন্মের আগেই তিনি কিনে ফেললেন মেয়েশিশুদের পোশাক আর রূপার মল। পুত্রসন্তান জন্মের খবর পেয়ে ছেলেকে দেখতে যান এসব নিয়েই। হুমায়ূন আহমেদের ছেলেবেলার শুরুর দিকটা কেটেছে মেয়েদের পোশাক পরেই!

শুধু কি পোশাক! হুমায়ূন আহমেদের নামের পেছনেও রয়েছে রহস্য। আপনি কি জানেন, হুমায়ূন আহমেদ কিন্তু তাঁর জীবনের গোড়া থেকে হুমায়ূন আহমেদ নন? ছোটবেলায় তাঁর নাম রাখা হয়েছিল বাবার নামের সঙ্গে মিলিয়ে শামসুর রহমান, ডাক নাম কাজল। ছয় বছর পর্যন্ত এই নামই ছিল তাঁর। সাত বছর বয়সে বাবা তাঁর নাম বদলে রাখেন হুমায়ূন আহমেদ।

হুমায়ূন আহমেদের লেখনীর সঙ্গে তো সবাই পরিচিত কিন্তু তাঁর আঁকার সঙ্গে? আমাদের হয়তো অনেকেরই জানা নেই, তিনি কিন্তু ছবিও আঁকতেন চমত্‍কার। অবশ্য হুমায়ূন আহমেদের পরিবারে আঁকাআঁকি তেমন নতুন কিছু নয়। বাবা-মা-ভাই-বোন নিয়ে তাঁদের পরিবারে লিখিয়ে যেমন ছিল, তেমনি আঁকিয়েও। বাবার উত্‍সাহে আঁকাআঁকি ও লেখালেখির বিষয়গুলো তাঁরা রপ্ত করেছিলেন খেলাচ্ছলেই। ছেলেবেলায় বাবার তাড়নায় ছবি আঁকার প্রতিযোগিতা বসে যেতেন তাঁরা মাঝে মাঝেই। ফয়জুর রহমান হঠাত্‍ করেই বলতেন, `অ্যাই, তোমরা কাগজ নিয়ে বসে যাও। ছবি আঁকো। তোমাদের ছবির একজিবিশন হবে। যার ছবি সবচেয়ে ভালো হবে তার জন্য চারআনা পুরস্কার।` এই কথা শোনামাত্র ভাইবোনেরা সবাই ঝাঁপিয়ে পড়তেন ছবি আঁকায়। সেগুলো পরে ঘরের দেয়ালে টাঙিয়ে প্রদর্শিত হতো। বাবা ঘুরে ঘুরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ছবিগুলো দেখতেন। তারপর সেরা ছবি নির্বাচন করে পুরস্কৃত করতেন। তাতে বরাবর প্রথম হতেন মুহম্মদ জাফর ইকবালই। আঁকাআঁকিতে তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর তিনি রেখেছেন দৈনিক গণকণ্ঠ-এর স্টাফ কার্টুনিস্ট হয়ে। আর ছোট ভাই আহসান হাবীব তো দেশের জনপ্রিয় কার্টুনিস্টদের একজন। ছোটবেলার সেই রঙের দারুণ খেলাই হয়তো তাঁদের আঁকার প্রেরণা।

হুমায়ূন কিন্তু বড়বেলাতেও ছবি আঁকা ছাড়েননি। ২০০৩ সালে এক পত্রিকায় সাক্ষাত্‍কারে তাঁর বড়বেলার ছবি আঁকা নিয়ে পাঠকদের জানান মজার একটি অভিজ্ঞতা। ছবি আঁকা শুরু করার পর বন্ধুবান্ধবরা উত্‍সাহ দেওয়ার জন্য অনবরত বলতে লাগল, `চমত্‍কার হচ্ছে`। শুনতে শুনতে হুমায়ূন আহমেদের মনে হলো ছবি তাহলে ভালোই হচ্ছে। নিজের কিছু শিল্পকর্ম দেয়ালে টাঙিয়েও দিলেন। এমন সময় একদিন এলেন কলকাতার লেখক সমরেশ মজুমদার, তাঁর সঙ্গে এক বিশিষ্ট ছবি সমালোচক। হুমায়ূনের বাড়িতে ঢুকে দেয়ালে টাঙানো ছবিগুলো তিনি আগ্রহ নিয়ে দেখলেন। দেখার পর তাঁর মন্তব্য, `বাহ! আপনার ছেলের ছবি আঁকার হাত তো বেশ।`

সব শিশুরই ছোটবেলায় বড় হয়ে কিছু একটা হওয়ার বাসনা থাকে। শিশু হুমায়ূনও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। তিনি বড় হয়ে কী হতে চেয়েছিলেন জানেন? আইসক্রিমওয়ালা! আইসক্রিম খাওয়ার লোভেই আইসক্রিমওয়ালা হতে চেয়েছিলেন তিনি। তাঁর ছোটবেলায় মনে হতো, আইসক্রিমওয়ালারাই হলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সুখী মানুষ। ইচ্ছে করলেই যেকোনো সময় তার বাক্সটা খুলে সে আইসক্রিম খেতে পারে। আর এ কারণেই হুমায়ূনের জীবনের প্রথম লক্ষ্য ছিল আইসক্রিমওয়ালা হওয়া। আরেকটু বড় হয়ে জাদুকর হওয়ার বাসনাও জেগেছিল অন্তরে।

তারপর যা হয়, একটা বয়স পার হয়ে গেলে বাচ্চাদের এসব স্বপ্ন দূর হয়ে যায়। বাবা-মায়ের স্বপ্ন চেপে বসে সন্তানদের ওপর। ফলে কিছুদিন পর `বড় হয়ে কী হবে?` জিজ্ঞেস করলেই হুমায়ূন আহমেদ জবাব দিতেন, `ব্যারিস্টার।`

বাংলাদেশে এখন রবীন্দ্রসঙ্গীতের যে জনপ্রিয়তা তার কৃতিত্বের কিছু ভাগ দিতে হবে হুমায়ূন আহমেদকেও। বইয়ের নামকরণে এবং তাঁর জনপ্রিয় টিভি নাটকগুলোতে অবিরাম রবীন্দ্রসঙ্গীতের ব্যবহারের মাধ্যমে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে শ্রোতার কাছে নিয়ে গেছেন তিনি। চলচ্চিত্রে লোকসঙ্গীতের ব্যবহার করেও একই কাজ করেছেন তিনি। গানের প্রতি তাঁর এই ভালোবাসার বীজ বপন হয়েছিল সেই ছেলেবেলাতেই। আর এর পেছনেও রয়েছে বাবার অবদান। হুমায়ূনের বাবা ছিলেন গানপাগল লোক। প্রায়ই তাঁদের বাসায় বসতো গানের আসর। তখন অবশ্য গান বিরক্তিকরই মনে হতো বালক হুমায়ূনের কাছে। কারণ খেলাধুলা, হৈচৈ এসব বন্ধ হয়ে যেত গানের জন্য। বাড়িতে তাঁদের গ্রামোফোন ছিল, ছিল অসংখ্য রেকর্ডও। রাতের বেলা হঠাত্‍ ঘুম ভেঙে গেলে দেখতেন, বাবা একা একা তন্ময় হয়ে একের পর এক গান শুনছেন। বালকমনে এর প্রভাবও কম ছিল না। খ্যাতি পাবার জন্য মানুষ কত কিছুই তো করে। বিখ্যাত হওয়ার যেমন আনন্দ রয়েছে, তেমনি রয়েছে যন্ত্রণাও।

লেখকখ্যাতির বিড়ম্বনার শিকারও হয়েছেন হুমায়ূন। এমনকি বইমেলাতেও যেতে পারতেন না তিনি। একবার বাংলা একাডেমীর ডিজি তাঁকে বইমেলা থেকে চলে যেতে বলেন এ কারণে যে, তিনি থাকাতে মেলায় বিশৃঙ্খলা হচ্ছে। এ ঘটনার পর তিনি বইমেলায় যাওয়া একপ্রকার বন্ধই করে দেন। বইমেলায় তাঁর লেখা বই তরুণ-তরুণীরা `মাছির` মতো ভিড় করে কিনত বলে তথাকথিত সাহিত্যবোদ্ধারা তাঁকে ডাকতেন `বাজারি লেখক`। আর এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় লেখালেখিও কম হয়নি।

সবকিছু ছাপিয়ে তিনি সবার উর্ধ্বে। হুমায়ূন আহমেদের কথা লিখতে গেলে তৈরি হয়ে যাবে আরেকটি মহাকাব্য। আজ তিনি নেই, কিন্তু তার সৃষ্টি এখনো জ্বলজ্বল করছে।

বাংলা ইনসাইডার/এসএইচ