ঢাকা, রোববার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ১ পৌষ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

শেখ হাসিনার বিয়ের গল্প

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৭ নভেম্বর ২০১৯ রবিবার, ০৩:৪৪ পিএম
শেখ হাসিনার বিয়ের গল্প

রাষ্ট্রনায়ক এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে শেখ হাসিনার এই দুটি পরিচয় সবারই জানা। আর গণমাধ্যমের কল্যাণে তার জনদরদী গুণটিও প্রায় সবার জানা।

কিন্তু এর বাইরেও তার আরো অনেক গুণ রয়েছে। আছে তাকে নিয়ে অনেক ছোট ছোট সব গল্প। সেসব কিছু মিলিয়েই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কারো মা আবার কারো প্রিয় আপা।

একটি দেশের জাতির পিতার কন্যার বিয়ে কেমন হয়? নিশ্চয়ই জমকালো অনুষ্ঠান ছাড়া সে বিয়ে হয় না। নিশ্চয়ই ভরপেট খাওয়া-দাওয়া ও আলোর রোশনাই হয় সে বিয়ের অন্যতম অনুষঙ্গ। কিন্তু না, যদি এমন কিছু ধারণা করে থাকেন তাহলে আপনি ভুল করছেন।

বাঙালির জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিয়ে ছিল একদমই সাদামাটা, বাহুল্য বর্জিত।

১৯৬৭ সালের ১৭ নভেম্বর বিখ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন শেখ হাসিনা।

শেখ হাসিনা ও ড. ওয়াজেদ মিয়ার বিয়ের পেছনে কোনো চমকপ্রদ গল্প নেই। তৎকালীন গড়পড়তা বাঙালি পরিবারের রীতি মেনে পারিবারিক ভাবে বিয়ে হয়েছিল তাঁদের।

রংপুরের আওয়ামী লীগ নেতা মতিউর রহমান প্রাথমিকভাবে তাঁদের বিয়ের ঘটকালি করেন। বিয়ের পুরো প্রক্রিয়াতেই তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন।

লন্ডন থেকে সবেমাত্র পিএইচডি শেষ করে ড. ওয়াজেদ মিয়া ১৯৬৭ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকায় ফিরে আসেন এবং আণবিক শক্তি কেন্দ্রে ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার পদে যোগ দেন।

এমন সময় মতিউর রহমান নিজের গুলশানের বাসায় তাঁকে ডেকে নিয়ে জানতে চান, শীঘ্রই বিয়ে করার পরিকল্পনা আছে কিনা তাঁর। ওয়াজেদ মিয়া জানান, তিন মাসের মধ্যে বিয়ে করতে চান তিনি। সুরুচিসম্পন্ন, অমায়িক ও সদাচার স্বভাবের মেয়ে বিয়ে করতে ইচ্ছুক বলেও জানিয়ে দেন।

এর ১০ দিন পর মতিউর রহমান ড. ওয়াজেদ মিয়াকে আবার বাসায় ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি মুজিব ভাইয়ের মেয়ে হাসিনাকে দেখেছো? আমার মনে হয়, ওর সঙ্গে তোমাকে খুব মানাবে।’ প্রথমে এই প্রস্তাবে অস্বস্তিতে পড়ে যান ওয়াজেদ মিয়া।

কারণ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তিনি ভাই বলে ডাকতেন। তবে মতিউর রহমান তাঁকে বলেন, সেটা রাজনৈতিক সম্পর্ক।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, অনেকেই জানেন না যে ছাত্রাবস্থা থেকেই ওয়াজেদ মিয়া রাজনীতি সংশ্লিষ্ট ছিলেন এবং সংগঠক হিসেবেও ভালো ছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র থাকাকালে ১৯৬১ সালে তিনি ফজলুল হক হলের ভিপি নির্বাচিত হন। ছাত্রলীগের একজন নিষ্ঠাবান কর্মী হিসেবে ওই সময়েই বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতার সংস্পর্শে এসেছিলেন তিনি।

মতিউর রহমানের প্রস্তাবের দুদিন পর ১৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় মতিউর রহমানের বাসায় আসেন শেখ হাসিনার মাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, ভাই শেখ কামাল, শেখ শহীদ ও একজন মুরব্বি। সেখানেই ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে শেখ হাসিনার পরিচয় হয়।

বেগম মুজিব ওয়াজেদ মিয়াকে বলেন, জেলগেট থেকে এ বিয়েতে সম্মতি দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সেদিনই বিয়ের প্রস্তাবে সম্মতি দেন ওয়াজেদ মিয়া।

এরপর হাসিনার হাতে আংটি পরিয়ে দেন তিনি। বায়তুল মোকাররম থেকে কেনা ওই আংটিটি শেখ হাসিনার আঙুলের মাপের চেয়ে বেশ বড় ছিল।

এরপর ওয়াজেদ মিয়ার আঙুলে আংটি পরিয়ে দিয়ে দোয়া করেন বেগম মুজিব।

আজকাল সবাই বিয়ে ঠিকঠাক হলেই শপিং করতে বিদেশ ছোটেন কিংবা দেশ থেকেই লাখ লাখ টাকার শপিং করেন।

কিন্তু বঙ্গবন্ধু কন্যার বিয়েতে জমকালো কোনো শপিং হয়নি। বিয়ের দিন ড. ওয়াজেদ মিয়া স্টেডিয়াম মার্কেট থেকে একটি লাল-গোলাপি শাড়ি, মাঝারি আকারের ক্রিম রঙের নতুন ডিজাইনের একটি স্যুটকেস এবং এক জোড়া স্যান্ডেল কিনেছিলেন।

ড. ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে কোনো টাকা না থাকায় সব জিনিসপত্রের দাম দেন মতিউর রহমানের স্ত্রী। সেদিন রাত সাড়ে ৮টায় মতিউর রহমান দম্পতি ওয়াজেদ মিয়াকে নিয়ে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডে বঙ্গবন্ধুর বাসায় যান।

রাতটি ছিল শবে বরাতের রাত। সে রাতেই বিয়ে পড়ানো ও কাবিননামা স্বাক্ষরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ড. ওয়াজেদ মিয়া স্যুট পরে বঙ্গবন্ধুর বাসায় গিয়েছিলেন। বিয়ের সিদ্ধান্তের পর তিনি একটি টুপি চেয়ে নেন। এরপর ২৫ হাজার টাকা দেনমোহরে শেখ হাসিনা ও ওয়াজেদ মিয়ার মধ্যে বিয়ে পড়ানো সম্পন্ন হয়।

বরাবরের মতো পরিবারের ওই আনন্দঘন দিনে অনুপস্থিত ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কারাগারে থাকায় বড় মেয়ের বিয়েতে অংশ নিতে পারেননি তিনি। বিয়ের পরদিন বিকেলে জেলগেটের কাছে একটি কক্ষে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ওয়াজেদ মিয়ার দেখা হয়।

বঙ্গবন্ধু তাঁকে জড়িয়ে ধরে দোয়া করেন এবং তাঁর হাতে একটি রোলেক্স ঘড়ি পরিয়ে দেন। সংক্ষেপে এটাই শেখ হাসিনা ও ড. ওয়াজেদ মিয়ার বিয়ের গল্প।

ড. ওয়াজেদ মিয়া আজ আর আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু শেখ হাসিনা ও তাঁর দুই সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুল বহন করে চলেছেন বাংলাদেশের স্বপ্নের মশাল।

বাংলা ইনসাইডার/এমআরএইচ