ঢাকা, সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ২ পৌষ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

বটগাছটা মানুষ খুঁজে ফেরে

মীর রাকিব হাসান
প্রকাশিত: ৩০ নভেম্বর ২০১৯ শনিবার, ০৮:০০ এএম
বটগাছটা মানুষ খুঁজে ফেরে

আনিসুল হক পৃথিবী ছেড়ে গেছেন দুই বছর হলো। এই সময়েই কত কিছুই না ঘটে গেছে। উত্থান-পতন হয়েছে। কিন্তু তার অভাব পুরণ হয়নি। আসলে সময়ই শোক, কষ্ট, দুঃখ, বেদনা উপশম করে। মানুষকে জীবন যাপনে উৎসাহিত করে। সামনে এগিয়ে যাবার তাড়না দেয়। নিত্যদিনের ব্যস্ততা। কিন্তু প্রায় প্রতিদিন ঢাকাবাসী আনিসুল হককে অনুভব করে। সংকট, আনন্দ, উপমায় তাকে খুঁজে ফিরে। তার স্মৃতিচারণে কাটে অনেক আড্ডা।

তিনি বলতেন, ‘অর্থ নয়, জীবনের পেছনে ছোটো। মাথা উঁচু রাখো সবসময়। জীবনে সমঝোতা করে চলতে শেখো। যাই ঘটুক মন ছোট করবে না। সময়কে কাজে লাগাও। টাকা দিয়ে লাক্সারি কিনতে পারবে, সময় নয়। এমনকি টাকা তোমাকে সুখীও করতে পারবে না।’ তরুণদের তার বলা কথাগুলো উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দেয়।

আনিসুল হক এ দেশের ইতিহাসে অন্যতম সেরা একজন উপস্থাপক। অসম্ভব সুদর্শন। তার সময়ের লাখ লাখ তরুনীর ক্রাশ। সফল ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ীদের নেতা। মেয়র। সাহসী মানুষ। ফ্যাশন আইকন। তার অনেকগুলো কাজের ক্ষেত্র। যার সবগুলোতেই তিনি সফল।

সবাইকে মরতে হবে কিন্তু বেঁচে থাকে ক’জন? একজন আনিসুল হক ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। কারণ, তিনি মৃত্যু নয়, জীবন আলিঙ্গন করেছিলেন শক্তভাবে। এমন আত্মবিশ্বাসী, সদালাপী মানুষ কমই দেখা যায়। ভালোবাসতেন মানুষ। সবাইকে বলার সুযোগ দিতেন। কিন্তু যখন বলতেন, অন্যরাও ভালো শ্রোতা হয়ে যেতেন। কারণ তিনি বলতেন চমৎকার। এই শহরে তার মতো উচ্চস্বরে, প্রাণখুলে কাউকে হাসতে কে দেখেছেন? ভবিষ্যতে দেখবেন সেই আশাও হয়তো অনেকে করে না।

একদিন নায়িকা পরীমণি বলছিলেন, বনানীতে তার বাসা। বনানীতে ঢুকে দেখছেন গাছ কাটছে কিছু লোক। চোখটা ভিজে এলো। আনিস ভাই থাকলে হয়তো এভাবে গাছ কাটতে দিতেন না।

আনিসুল হক ছিলেন বহুমাত্রিক মানুষ। অকৃত্রিম ব্যবহার। তার হৃদয় থাকতো মানবিকতা ও উচ্ছ্বলতায় পরিপূর্ণ। ভালোবাসাময় তার জগত। বন্ধু, স্বজন, পরিচিতজনরা যেন ভালো থাকে সেদিকে নজর রাখতেন। যে কোনো সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধা ও দায়বদ্ধতা অনুভব করতেন। এসব কারণেই তার প্রতি মানুষের এতো মুগ্ধতা, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

তার চলে যাওয়ার ক্ষতি অপুরনীয়। হক পরিবার তো বটেই নগরবাসীর জন্যও। তাকে হারিয়ে, উত্তরহীন ঢাকা উত্তর। বেঁচে থাকতে মেয়র আনিসুল হককে যখন তখন ফোন করা যেতো। সরাসরি অভিযোগ-অনুযোগ জানানো যেতো। ফেসবুক, ই-মেইল, নাগরিক অ্যাপ কার্যকরী ছিলো। অনেক সমস্যার তাৎক্ষনিক সমাধানও মিলতো।

ডিএনসিসিকে অল্প সময়ের মধ্যেই মোটামুটি শৃংখলার মধ্যে আনতে পেরেছিলেন। ঘুষ, দুর্নীতি এবং লাল ফিতার দৌরাত্ন্য খানিকটা কমাতে পেরেছিলেন। সংস্থাটির প্রতি জনআস্থা তৈরিতে সক্ষম হয়েছিলেন।

আনিসুল হক ছিলেন সাধারন কিন্তু ব্যতিক্রমী মানুষ। আগে লক্ষ্য ঠিক করে প্রস্তুতি নিতেন, শেষে কাজ করতেন। অভিভাবকের মতো, পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের পিঠে হাত রেখে কথা বলতেন। যতদিন দায়িত্বে ছিলেন, সামর্থ্যের সবটুকু নিয়ে নাগরিকদের পাশে দাড়িয়েছেন। গঁৎবাধা জিনিসে আস্থা ছিলো না। যা করতেন তাতেই ভিন্ন মেজাজ, বৈচিত্র্য ও নতুনত্ব থাকতো। তার এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে রুবানা হকসহ আরো কিছু মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত হলেও, কাজটা ভালো হতো।

আনিসুল হকের সকল সফলতা, কৃতিত্ব ও অর্জনের পেছনের কারিগর রুবানা হক। তাকে ছাড়া আনিসুল হক অসম্পুর্ণ। দু’ জন দুজনকে আগলে রাখতেন। এখন রুবানা হক, ছেলে নাভিদুল হক মিলে আগলাচ্ছেন ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য, পরিবার এবং শোক। আর ওপার থেকে ছায়া দিচ্ছেন আনিসুল হক। স্ত্রী রুবানা হককে নিয়ে অকপটে গর্ব করতেন। পরিবার বিশেষত সন্তানদের বিষয়ে ছিলেন ভীষণ সংবেদনশীল। তাদের ভালো ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন।

 

বাংলা ইনসাইডার