ঢাকা, বুধবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২০, ১৬ মাঘ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

বিশ্ব তখন কী বলেছিল, এখন কী বলছে?

অর্চি হক
প্রকাশিত: ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯ সোমবার, ১০:০০ এএম
বিশ্ব তখন কী বলেছিল, এখন কী বলছে?

১৯৭৪ সালের ৩০ অক্টোবর। স্বাধীনতা অর্জনের পর তিন বছর পেরিয়ে গেছে। ধ্বংসস্তুপ থেকে মাথা তুলে দাড়াতে সংগ্রাম করছে বাংলাদেশ। সেই সময়টাতেই বাংলাদেশকে ‘বটমলেস বাস্কেট’ বা ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র তকমা দিলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার। যার মানে হচ্ছে, এখানে যত অর্থই ঢালা হবে, তলা না থাকায় কোনো কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না। কিসিঞ্জারের সেই ভবিষ্যদ্বাণীকে দুমড়েমুচড়ে দিয়ে বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিক উন্নয়নের রোল মডেল।

কিসিঞ্জারের সেই ভবিষ্যদ্বাণীর চার দশক পর তার দেশেরই পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বাংলাদেশ সফরে এসে বলে যান, ‘বাঙালি জাতির মেধা, পরিশ্রম আর একাগ্রতার মাধ্যমে বাংলাদেশ আজ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এই সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে একসঙ্গে কাজ করতে চায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।’

 

১৯৭২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। সেখানে বাংলাদেশ নিয়ে হতাশার কথাই ছিল বেশি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ‘সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশ একটি নাজুক ও জটিল উন্নয়ন সমস্যার নাম। দেশের মানুষেরা গরীব। মাথাপিছু আয় ৫০ থেকে ৭০ ডলার, যা গত ২০ বছরেও বাড়েনি। একটি অতি জনবহুল দেশ (প্রতি বর্গমাইলে জনসংখ্যা প্রায় এক হাজার ৪০০) এবং জনসংখ্যা আরও বাড়ছে (বছরে ৩ শতাংশ হারে জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধি) এবং দেশটির মানুষ অধিকাংশই নিরক্ষর (সাক্ষরতার হার ২০ শতাংশের কম)।’

সেই বিশ্বব্যাংকই এখন বলছে, গত চার দশকে অনেক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে শূন্য থেকেও অনেক কিছু অর্জন করা যায়। আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি দেশের একটি। বিশ্বব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ক্রিস্টালিনা জর্জিভা গত জুলাইয়ে বলেছেন, ‘বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন-সহযোগী হিসেবে পেয়ে বিশ্বব্যাংক গর্বিত। বাংলাদেশ বিশ্বকে দেখিয়েছে অভিযোজন ও দুর্যোগ মোকাবেলার প্রস্তুতি কিভাবে নেয়া যায় । আমি বাংলাদেশের সফল উন্নয়ন উদ্ভাবনগুলো এবং তা কিভাবে অন্যান্য জায়গায় প্রয়োগ করা যায় তা আরো গভীরভাবে জানতে চাই।’

 

স্বাধীনতার ঠিক পাঁচ বছর পর ১৯৭৬ সালে নরওয়ের অর্থনীতিবিদ জাস্ট ফ্যালান্ড এবং ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ জে আর পারকিনশন ‘বাংলাদেশ: দ্য টেস্ট কেস ফর ডেভেলপমেন্ট’ নামের একটি গবেষণামূলক বইয়ে লিখেছিলেন, ‘বাংলাদেশের পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে, যদি এই দেশটি উন্নতি করতে পারে, তাহলে নিঃসন্দেহে বলা যায়, পৃথিবীর যেকোনো দেশ উন্নতি করতে পারবে।’

জাস্ট ফ্যালান্ড এবং জে আর পারকিনশনের কেউই এখন বেঁচে নেই। তবে তাদের দেশ নরওয়ে এবং যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করছে। ২০১৬ সালে বাংলাদেশে এসেছিলেন নরওয়ের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী ডিলেক আইহান। তিনি বলেন, ‘বিকাশমান অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশের বাজার অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে চায় নরওয়ে।’

আর বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাই কমিশনার বলছেন, বাংলাদেশের অসাধারণ উন্নয়ন অর্জন করে দেখিয়েছে। বাংলাদেশের মতো দেশের সঙ্গে কাজের মাধ্যমে কীভাবে সম্পর্ক আরও বাড়ানো যায়, সেজন্য তার সরকার উদগ্রিব হয়ে আছে।’

জে আর পারকিনশনের দেশের দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান বলছে, ২০৫০ সালে বাংলাদেশ প্রবৃদ্ধির বিচারে পশ্চিমা দেশগুলোকেও ছাড়িয়ে যাবে।

 

একাত্তরে পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদরা বলেছিলেন, স্বাধীনতার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী হবে। বাংলাদেশ স্বাধীন হলে সেই অর্থনীতি টিকে থাকতে পারবে না। বাংলাদেশের পক্ষে দ্রুত বর্ধমান জনসংখ্যা হ্রাস করা সম্ভব হবে না। ফলে জনসংখ্যার চাপে ক্ষুদ্র ভূখণ্ডে বাংলাদেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে।

বলাই বাহুল্য, পাকিস্তানি অর্থনীতিবিদদের এই ভবিষ্যদ্বাণীগুলো শুধু মিথ্যাই প্রমাণিত হয়নি, বরং উল্টে গেছে। এখন পাকিস্তানি অর্থনীতিবিদরাই বলছেন, বাংলাদেশ অর্থনীতিতে রোল মডেল। দেশটির সাংবাদিক ও উন্নয়নকর্মী জাইঘাম খান প্রকাশ্যে টক শো’য়ে এসে বলেছেন, পাকিস্তানকে তিনি এক টুকরো বাংলাদেশ হিসেবে দেখতে চান। পাকিস্তানের বিভিন্ন রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের কথাতেও এই একই আকুতি ফুটে উঠছে।

যেই দেশটিতে একসময় মানুষ অনাহারে, অর্ধাহারে দিন কাটাতো সেই দেশটিই আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অশিক্ষা এখন এই দেশ থেকে প্রায় বিতাড়িতই বলা চলে। ৪৮ বছর আগে যেই দেশের বাজেটের আকার ছিল ৭৮৬ কোটি টাকার, সেটাই এখন ৫ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা। মোট দেশজ উৎপাদন, বিনিয়োগ, রাজস্ব, রপ্তানি আয়, রেমিটেন্স, রিজার্ভ সব ক্ষেত্রেই ঈর্ষণীয় সফলতা দেখিয়েছে বাংলাদেশ। দেশী-বিদেশী নামীদামী বহু পণ্ডিতের হিসাব-নিকাশ বদলে দিয়ে কিসিঞ্জারের সেই ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ আজ বিশ্বের বিস্ময়।

বাংলা ইনসাইডার/এএইচসি