ঢাকা, রোববার, ১৩ জুন ২০২১, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

বাঙালিত্বের ধারক

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৩ জুন ২০১৭ শুক্রবার, ০৮:৩০ এএম
বাঙালিত্বের ধারক


আলোর দিশারি হয়ে বাংলাদেশে তার আবির্ভাব, বাঙালি জাতিসত্বায় আদর্শবোধের সৃষ্টিকর্তা, চেতনার উজ্জীবক, নীতিতেবিশ্বাসবোধের ধারক হয়ে পুষ্ট বাংলাদেশে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। এদেশের মানুষের ভাত ও ভোটেরঅধিকার, ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকার, ধর্ম পালনের অধিকার এবং শোষণ-বঞ্চনা ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করতে করতেই এর জন্ম।

আদর্শে গণতান্ত্রিক, নীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতা, চেতনায় জাতীয়তাবাদী, মূল্যবোধে সমাজতান্ত্রিকতা নিয়ে গঠিত হয়েছিল দলটি। দেশ বিভাগের পর ১৯৪৯-এর ২৩ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে মুসলিম লীগ ভেঙে প্রথমে ‘নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিমলীগ’, চার বছর পর ‘মুসলিম’ বাদ দিয়ে যে ’নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’ ধর্মীয় দ্বি জাতি তত্ত্ব ভিত্তিক পাকিস্তানে ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সূচনা করেছিল সেটি বর্তমানে ’বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’।

প্রতিষ্ঠার পরপরই আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব ও কারাবরণের মধ্য দিয়ে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ জোরালো হয়ে ওঠা রাষ্ট্রভাষা ভাষা বাংলার দাবিকে দলীয় কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করে সংগঠনটি। এরপর ’৪৯-এর ১১অক্টোবর খাদ্য মিছিল, ’৫০-এর ২৪ এপ্রিল রাজশাহী জেলে সাত রাজবন্দিকে গুলি করে হত্যার প্রতিবাদ, ’৫০-এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বিরোধী কর্মসূচি এবং ’৫২-র ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠার তিন বছরেই বাংলার আপামর জনতার সংগঠনে পরিণত হয় আওয়ামী লীগ।

১৯৪৮-৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে আওয়ামী লীগ এবং এর ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ (১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাপালন করে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র হত্যার পূর্বে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠনে আওয়ামী লীগ মুখ্য ভূমিকা রাখে।

১৯৫৪ সালে পূর্ববাংলা প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ অন্য তিনটি বিরোধী দল এ.কে ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন কৃষকশ্রমিক পার্টি, মাওলানা আতাহার আলী নেতৃত্বাধীন নেজামে-ই-ইসলাম পার্টি এবং হাজি মোহাম্মদ দানেশের নেতৃত্বাধীন গণতন্ত্রী দল নিয়ে পূর্ব বাংলায় সরকার বিরোধী নির্বাচনী জোট ‘যুক্তফ্রন্ট’ গঠন করে। ২১ দফার ভিত্তিতে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। এই ব্যাপক সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে ‘রাষ্ট্রভাষার প্রশ্ন’ এবং ‘পূর্ববাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবি’ছিল এই রাজনৈতিক মঞ্চের মূল বিষয়।

১৯৫৪ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিপুল ভোটে জয়লাভ করে।
১৯৫৬ সালে ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত দলীয় কাউন্সিলে `মুসলিম` শব্দটি বাদ দিয়ে `বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ` নামকরণের মাধ্যমে দলটি অসাম্প্রদায়িক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হয়। এক কথায় বলতে গেলে, বাঙালি জাতির সকল মহতী অর্জনের নেতৃত্বে ছিল জনগণের প্রাণপ্রিয় সংগঠন আওয়ামী লীগ, যার মহানায়ক ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

৬২-র মৌলিক গণতন্ত্রের নামে আইয়ুব খানের একতরফা গণভোটে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে আওয়ামী লীগ। ওই বছর ৪ অক্টোবর অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের আলাদাভাবে পুনরুজ্জীবিত না করে‘ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’এনডিএফ নামে একটি ঐক্যবদ্ধ জোট গড়ে তোলে। এরপর ’৬৪-এর ২৫ ও ২৬ জানুয়ারি কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত করার সিদ্ধান্ত হয়। ৬২ এর শিক্ষা কমিশন আন্দোলন, ৬৬ বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা, ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরুঙ্কুশ জয়, ১৯৭১ এরস্বাধীনতার মধ্যে নিয়ে আওয়ামী লীগের চূড়ান্ত বিষয় ঘোষিত হয়।

৭২-এর সংবিধানে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্র। আওয়ামী লীগ তার মূলনীতি গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করতে ’৭৩-এ নির্বাচন ঘোষণা করলে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৭৩.১৭ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়লাভ করে। বাঙালি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে এগিয়ে যায় বাংলাদেশ।
 
এরপর ১৯৭৫। রাজনীতির কালো অধ্যায়ের সূচনা লগ্ন। স্বপরিবারে নিহত হন জাতির পিতা। ১৫ আগস্টের পর পরবর্তী শাসকরা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের কারাগারে আটক, অত্যাচার-নির্যাতন, আওয়ামী লীগ ভাঙার চেষ্টা, নিষিদ্ধকরণ,পাল্টা আওয়ামী গঠন, নানা তৎপরতার মধ্য দিয়ে সংগঠনটিকে নিঃশেষ করার চেষ্টা করে। কিন্তু তারা আওয়ামী লীগের আদর্শ, চেতনা ও মূল্যবোধের সাথে জনগণের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কে চিঁড় ধরাতে পারেনি। চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও আওয়ামীলীগ তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়নি। গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে চরম বৈরী পরিবেশ ও স্বৈরশাসনামলেও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে।

সামরিক শাসন, কারাবন্দি নেতাকর্মী, দলে ভাঙন— এমন বিরূপ পরিস্থিতিতেও ’৭৮-এর ৩ জুনের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে‘গণতান্ত্রিক ঐক্যজোটে’র অন্তর্ভুক্ত হয়ে জেনারেল ওসমানির পক্ষে ভোটযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে আওয়ামী লীগ। রাষ্ট্রপতিনির্বাচনে প্রশাসনের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ ও কারচুপির শিকার হওয়ার পরও ’৭৯-এর ১৮ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকরেছে দলটি। ভঙ্গুর দল নিয়েও সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩৯টি আসন লাভ করে। সংসদে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতকরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অব্যাহত রাখে।

এরপর ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। দীর্ঘ ছয় বছরের নির্বাসন জীবন শেষে ১৭ মে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন আওয়ামী লীগ সভাপতিশেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধু-কন্যার নেতৃত্বেই গতি ফিরে পায় আওয়ামী লীগ। স্বদেশ প্রত্যার্বতনের পর তিনি স্বৈরাচার-বিরোধীআন্দোলন গড়ে তোলেন।

১৯৮৬-এর ৭ মে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এরশাদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে অন্যান্য দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলেওআওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৫ দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলনকে আরও গতিশীল করে তোলে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দুর্বার আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য হয় জেনারেল এরশাদ। প্রকৃতপক্ষে, গণতন্ত্রেরপ্রতিষ্ঠায় আওয়ামী লীগের আত্মত্যাগের মানসিকতা স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলনকে চূড়ান্ত লক্ষে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছিল।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনী নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্বগ্রহণ করলে সকল সংকীর্ণতা জয় করে সাফল্যের পথে এগিয়ে যায় বাংলাদেশ।

তারপর ২০০৮ সালের নির্বাচনে রেকর্ড সংখ্যক আসনে জয়লাভ করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে আওয়ামীলীগ। এরপর ২০১৪ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বের গত সাত বছরেউন্নয়নের সমৃদ্ধির নবতরঙ্গে জেগে ওঠা সম্ভাবনার আলোকোজ্জ্বল ইতিহাসের দ্বারপ্রান্তে এখন বাংলাদেশ।

বিশ্বের মানচিত্রে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সঙ্গে রাজনৈতিক দল হিসেবেআওয়ামী লীগের ইতিহাস অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় অনেক ঘাত-প্রতিঘাত, চড়াই-উৎরাই ও প্রাসাদ ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে দলটি আজ এ দেশের গণমানুষের ভাব-ভাবনার ধারক-বাহকে পরিণত হয়েছে। অসাম্প্রদায়িকও গণতান্ত্রিক ভাব-ধারার আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে দলটি। জন্মের পর থেকে অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে ঐতিহ্যবাহী দলটি বেঁচে আছে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসাবে।

এই দলটিকে বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধপূর্ব বাংলাদেশের ৪৬ বছরের গণতন্ত্র, স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার সংগ্রাম এবং ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনার অর্থ রামকে বাদ দিয়ে রামায়ণ রচনার মতো। শুধু বাংলাদেশ বা দক্ষিণ এশিয়া নয়, সমগ্র এশিয়ার ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগ্রামের ইতিহাসে আওয়ামী লীগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায় সৃষ্টি করেছে। একটি নিয়মতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল প্রয়োজন হলে দেশ ও জাতিকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদিতে পারে- এশিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের ইতিহাসে এর দ্বিতীয় নজির নেই।

বাংলা ইনসাইডার/টিআর

 

বিষয়: আওয়ামী-লীগ