ঢাকা, মঙ্গলবার, ০৩ আগস্ট ২০২১, ১৯ শ্রাবণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

আওয়ামী লীগের কাউন্সিল: ইতিহাসের পাতা থেকে

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৩ জুন ২০১৭ শুক্রবার, ০১:৩০ পিএম
আওয়ামী লীগের কাউন্সিল: ইতিহাসের পাতা থেকে

আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রথম থেকে স্বাধীনতার পর পর্যন্ত যত কাউন্সিল অধিবেশন হয়েছিলো তার সংক্ষিপ্ত তথ্য ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও নির্বাচিত দলিল’ গ্রন্থে বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে।

মুসলিম লীগের দঃশাসন ও প্রচণ্ড দমননীতির মুখে এক প্রবল বৈরী পরিবেশে ১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন ঢাকার কেএম দাশ লেনের কেএম বশির হুমায়ুনের বাসভবন ’রোজ গার্ডেনে’ ( হুমায়ুন সাহেবের বাড়ি বলে সমধিক পরিচিত) মুসলিম লীগের খাজা নাজিমউদ্দিন ও অফিসিয়াল নেতৃত্বের বিরোধী প্রগতিশীল অংশটি গণতান্ত্রিক কর্মী সম্মেলন আয়োজন করে।

এই কর্মী সম্মেলনের প্রথম দিনেই একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল, ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ গঠনের সিদ্ধিান্ত গ্রহণ করা হয়। কর্মী সম্মেলনে নবগঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের মেনিফেস্টোর একটি খসড়া প্রণয়নের দায়িত্ব অর্পিত হয় শামসুল হকের ওপর। সম্মেলনের পরে ওই খসড়া মেনিফেস্টো প্রকাশিত হয়। তবে সম্মেলনে শামসুল হক প্রণীত ‘মূল দাবি’ বলে একটি ১২-দফা দাবিনামা সম্মেলনে গ্রহণ করা হয়।

মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সম্মেলনে সভাপতি। সহ-সভাপতি: আতাউর রহমান খান, অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন, আলী আহম্মদ এমএলএ, অ্যাডভোকেট আলী আমজাদ খান ও অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম খান, টাঙ্গাইলের শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং জেলে বন্দি শেখ মুজিবুর রহমান যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন।

ভাষা আন্দোলনের বিজয়ের পটভূমিতে ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের জন্য প্রতিষ্ঠার পর ১৯৫২-এর ১৪ নভেম্বর ঢাকার মুকুল সিনেমা হলে আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এই কাউন্সিলে গঠিত কমিটিতে ছিলেন সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবর রহমান।

১৯৫৫ সালের ২১ সেপ্টম্বর ঢাকার সদরঘাটে রূপমহল সিনেমা হলে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে দেশে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এই কাউন্সিলে আওয়ামী লীগকে একটি অসাম্প্রদায়িক দলে পরিণত করার লক্ষ্যে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ রাখা হয়। অনুষ্ঠিত এই কাউন্সিলে সভাপতি হন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। আর সাধারণ সম্পাদক হন শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৫৭ সালের ৭-৮ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইলের কাগমারীতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের বিশেষ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এই কাউন্সিলের সভাপতি হন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। আর সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৬৬ সালের ১৮ মার্চ হোটেল ইডেনে অনুষ্ঠিত কাউন্সিল অধিবেশনে পুস্তিকাকারে ছয়-দফা বিতরণ করা হয়। কাউন্সিল ৬-দফা অনুমোদন করে। ওই বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সভায় ৬-দফা উৎত্থাপিত হলে দলের সভাপতি মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগিশ এর বিরোধীতা করেন। কাউন্সিলে মওলানা তর্কবাগিশ অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। সভাপতির পদ পাওয়ার আশায় ৬-দফা সমর্থন না করলেও সালাম খান দলে থেকে যান এবং ৬-দফার পক্ষে বক্তৃতা দেন। এই কাউন্সিলে আওয়ামী লীগের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়। নতুন ওয়ার্কিং কমিটির সভাপতি হন শেখ মুজিবর রহমান। আর সাধারণ সম্পাদক পদে নিযুক্ত হন তাজউদ্দিন আহমদ।

১৯৬৭ সালের ২৭ আগষ্ট ঢাকার নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল আহ্বান করা হয়। কাউন্সিলে একটি নতুন কমিটি গঠিত হয়। যার সভাপতি হন শেখ মুজিবর রহমান আর সাধারণ সম্পাদক এএইচএম কামারুজ্জামান।

স্বাধীনতার আগে সর্বশেষ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭০ সালের ৪ জুন। হোটেল ইডেন প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত এই কাউন্সিলে ১১৩৮ জন কাউন্সিলর ছিলেন। এতে সভাপতি হন শেখ মুজিবর রহমান। সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তাজউদ্দিন আহমদ।

১৯৭২ সালের ৮ এপ্রিল। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় সভাপতি নিযুক্ত হন শেখ মুজিবর রহমান আর সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান।

১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের দশম কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বপরিবারে নিহত হওয়ার আগে এটিই ছিল আওয়ামী লীগের শেষ কাউন্সিল। দলীয় গঠনতন্ত্রে গণতান্ত্রিক ভাবধারা প্রণয়নের জন্য শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ ছেড়ে দেন। কারণ নতুন গঠনতন্ত্র অনুসারে সরকারের দায়িত্বে থাকা কেউ দলের দায়িত্বে থাকতে পারবে না। ফলে এএইচএম কামারুজ্জামানকে সভাপতি ও জিল্লুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।

এরপর ঢাকার হোটেল ইডেনের প্রাঙ্গণে আয়োজিত এই কাউন্সিলে আসলে নির্দিষ্ট কোন কাউন্সিলর ছিল না। তার পরিবর্তে সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনকে আহ্বায়ক করে ৪৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি সাংগঠনিক কমিটি গঠন করা হয়।

১৯৭৮ সালের ৩, ৪ ও ৫ এপ্রিল দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আবদুল মালেক উকিলকে সভাপতি ও আবদুর রাজ্জাককে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

দলে নেতৃত্ব শূন্যতা ছিল দীর্ঘদিন। তার পূরণ হয় শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে। তাই ১৯৮১ সালের ১৩-১৫ ফেব্রুয়ারি তিনদিন ব্যাপী এই কাউন্সিলে সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করা হয় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন আবদুর রাজ্জাক। আওয়ামী লীগের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই কাউন্সিলে দলের `নীতি-নির্ধারণের` দায়িত্ব অর্পিত হয় `সভাপতিমণ্ডলি`র ওপর।

১৯৮৭ সালের ১ থেকে ৩ জুন পর্যন্ত চলা এই কাউন্সিলে শেখ হাসিনা সভাপতি ও সাজেদা চৌধুরী সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন। সেই সঙ্গে নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়।

সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১৯৯২ সালের ১৯ থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আওয়ামী লীগ তার জাতীয় কাউন্সিল করে। সেখানে ২০ সেপ্টেম্বর নতুন অর্থনৈতিক নীতিমালার আলোকে সর্বসম্মতিক্রমে দলের ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্রে সংশোধনী আনা হয়। এখানেও সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব লাভ করেন জিল্লুর রহমান।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জয় লাভের পর ১৯৯৭ সালের ৬ ও ৭ মে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এখানেও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সভাপতি ও জিল্লুর রহমান সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন।

বিএনপি ও স্বাধীনতার বিরোধী শক্তি জামায়াত ইসলাম ক্ষমতায় থাকাকালে ২০০২ সালের ২৬ ডিসেম্বর একদিনের জন্য জাতীয় কাউন্সিলে বসে আওয়ামী লীগ। এখানে নতুন প্রাণ পায় দলটি। এ সময় শেখ হাসিনা সভাপতি ও মো. আবদুল জলিল সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার পরবর্তী ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা আসার পর ২৪ জুলাই জাতীয় কাউন্সিলের আয়োজন করে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সভাপতি ও সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচন করা হয়।

বঙ্গবন্ধু কনভেনশন সেন্টারে ২০১২ সালের ২৯ ডিসেম্বর একদিনের জন্য জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। ঘোষণাপত্রের সংশোধনী এখানে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। এবারও সভাপতি হিসেবে শেখ হাসিনা ও সাধারণ সম্পাদক পদে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম নির্বাচিত হন।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দুদিনব্যাপী ২০তম জাতীয় কাউন্সিল ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ২২ ও ২৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয়। এতে শেখ হাসিনাকে সভাপতি ও ওবায়দুল কাদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন করা হয়।

বাংলা ইনসাইডার/টিআর


 

বিষয়: আওয়ামী-লীগ