ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২০, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

আইজ্যাক নিউটন: সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পদার্থবিদ

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪ জানুয়ারি ২০২০ শনিবার, ০৮:১১ এএম
আইজ্যাক নিউটন: সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পদার্থবিদ

সর্বকালের সেরা বিজ্ঞানীর নাম বলতে বললে নিশ্চয় প্রথমেই আসবে আলবার্ট আইনস্টাইনের বা আইজ্যাক নিউটনের নাম। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বিজ্ঞানে এরকম বিজ্ঞানীদের অবদানের কথা আমাদের কল্পনার বাইরে। বিশেষ করে আইজ্যাক নিউটন। এই মহান ব্যক্তিটির জন্মদিন আজ। ১৬৪৩ সালের ৪ জানুয়ারি লিংকনশায়ারের উল্‌সথর্পম্যানরে এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।

নিউটন না থাকলে বিজ্ঞান আজকের অবস্থানে আসতো না। নিউটন না থাকলে আইনস্টাইন তার যুগান্তকারী আবিষ্কার করতে পারতেন না। নিউটন না থাকলে মানবজাতি আজ রকেটে চড়ে মহাকাশ চষে বেড়ানোর কথা কল্পনাও করতে পারতো না। হ্যাঁ, নিউটন না থাকলে এমন আরও অনেক কিছুই হতো না, যা ছাড়া আজকের বিশ্ব কল্পনাও করা মুশকিল। তার আগে পর্যন্ত বিজ্ঞানের সীমানা ছিল ছোট। তিনি সেটাকে প্রশস্ত করে দিয়ে গেছেন। তিনি পদার্থবিজ্ঞানের আমূল পরিবর্তন করে দিয়ে গেছেন। আর তার অবদানের জন্যই আজ আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পদার্থবিজ্ঞানের উপস্থিতি খুঁজে পাই।

পৃথিবীর ইতিহাসে অনেকেই আছেন যারা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ণ উন্নতি সাধন করেছিলেন। যাদের ভুল-শুদ্ধ দিয়েই সাজানো হয়েছে বিজ্ঞানের ভিত্তি। তাদের মধ্যে একজন হলেন স্যার আইজাক নিউটন। বিজ্ঞানের প্রায় প্রতিটি শাখায় যিনি গবেষণা করে গেছেন। বলা যায়, তিনি যেখানে হাত দিয়েছেন সেখানেই যেন রত্ন ফলেছে। অংকশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা এবং পদার্থবিদ্যায় তাঁর গবেষণাকে কেন্দ্র করে এককালে সারা বিশ্বে সৃষ্টি হয়েছিল বিরাট আলোড়ন। প্রকৃতপক্ষে তিনি তিনটি শাস্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করে গেছেন যেগুলো গতিসূত্র নামে পরিচিত।

তাঁর পিতার নামও ছিল আইজ্যাক নিউটন। তার জন্মের কয়েকমাস আগেই পিতার মৃত্যু হয়। তাঁর মা হ্যানা নিউটন, স্বামীর স্মৃতি হিসেবে পুত্রের নাম রেখেছিলেন আইজ্যাক নিউটন।

নিউটনের যখন দু’বছর বয়স, তখন তাঁর মা নিকটস্থ গীর্জার পাদ্রী বার্নাবাস স্মিথকে বিয়ে করেন। এই বিবাহকালে তিনি তাঁর সকল সম্পত্তি নিউটনের নামে লিখে দেন । বিধবা মায়ের সঙ্গে জীবনের প্রথম তিন বছর কেটে যায়। এসময় তাঁর মা বিয়ে করেন। একরকম অবাঞ্চিত হিসেবে নিউটন তাঁর দিদিমার কাছে লালিত-পালিত হন। একরকম এতিম অবস্থায় বিজ্ঞানী নিউটনের শৈশব-কৈশোর কাটে। এই গ্রামের পাঠশালাতে তাঁর শিক্ষাজীবনের শুরু হয়। ১২ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি এই স্কুলে লেখাপড়া করেন।

এরপর তিনি নিকটস্থ প্যানথাম শহরে গিয়ে কিংসনামক একটি স্কুলে ভর্তি হন। এসময় তাঁর অসাধারণ মেধার পরিচয় পাওয়া যায়। বালক নিউটনের জ্ঞান প্রতিভায় শিক্ষকগণ মুগ্ধ হয়ে যান।

দ্বিতীয়বার নিউটনের মা বিধবা হলে তাঁর মা ও সৎ ভাইবোনসহ আবার একত্রে বসবাস শুরু করেন। তখন মায়ের একার পক্ষে ক্ষেত-জমিজমা তদারকি করা সম্ভব হল না। অবশেষে মা স্কুল ছাড়িয়ে চৌদ্দ বছরের নিউটনকে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে এলেন। কিন্তু নিউটন তাঁর ক্ষেত খামারের কাজের পাশাপাশি তাঁর বন্ধুর বাড়ির পারিবারিক লাইব্রেরিতে গিয়ে পড়াশুনা চালিয়ে যান।

ভাগ্যের চাকা হঠাৎই সচল হলো। কাকা উইলিয়াম ভাইপোর জ্ঞানতৃষ্ণায় মুগ্ধ হয়ে নিজের কাছে নিউটনকে রেখে দিলেন। কাকা কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আবার নিউটন স্কুলে ভর্তি হলেন। এবার সম্পূর্ণ কাকার উদ্যোগে। একবছর পর নিউটন ট্রিনিটি কলেজে ভর্তি হলেন। শুরু হলো নতুন জীবন।

অঙ্কে ছিল নিউটনের বেশ ভালো দখল। যেকোনো জটিল অঙ্কের সহজ সমাধান করে দিতেন তিনি। প্রকৃতির দুর্জেয় রহস্য তাঁকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করত। নিউটনের এ বিশ্বাস ছিল প্রবল, একমাত্র বিজ্ঞানের মাধ্যমেই প্রকৃতির এই গোপন রহস্যকে উদঘাটন করা সম্ভব।

১৬৬৫ সালে নিউটন স্নাতক ডিগ্রি লাভ করলেন। কলেজে ছাত্র থাকাকালীন তিনি কিছু জটিল তথ্যের আবিষ্কার করেন- বাইনমিয়াল থিওরেম Binomial theorem), ফ্লাক্সসন (Fluxions) যা বর্তমানে ইন্টিগ্রাল ক্যালকুলাস (Interegal Calculus) নামে পরিচিত। এছাড়াও তিনি আবিষ্কার করেন কঠিন পদার্থের ঘনত্ব (The method for Calculating the area of curves or the volume of slides)| ১৬৬৬ সালে Fluxions পদ্ধতি উদ্ভাবনের পরপরই মাধ্যাকর্ষণ শক্তি সন্বন্ধে চিন্তা-ভাবনা করতে শুরু করেছেন। অবাক করা বিষয়, এসময় নিউটনের বয়স তখন মাত্র ২৪ বছর।

মধ্যাকর্ষণ তত্ত্বের একটি ঘটনা। কলেজ ছুটিতে মায়ের কাছে গিয়েছেন। প্রকৃতির পরিবেশে প্রেমিকাকে নিয়ে বসে আছেন বাগানে। সেই মুহূর্তে হঠাৎ খসে পড়ল একটা আপেল মাথা বরাবর। মগ্ন হলেন অন্যচিন্তায়। ঠোঁটের কোণায় অজান্তে জলন্ত সিগারেট ধরলেন প্রেমিকার হাতে। ফলে প্রেমিকা দৌড়ে পালালেন। এদিকে বিজ্ঞানী নিউটনের মাথায় খুরপাক খেলো, কেন আপেলটি আকাশে না উঠে মাটিতে এসে পড়ল? এভাবে মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্বের সৃষ্টি হলো। যদিও এই চিন্তার সূত্রপাত হয়েছিল বহু পূর্বেই। নিউটন গবেষণা প্রকাশ করলেন তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ “Mathmetical principles of Nature philosophy”।

তখন তিনি ২৫ বছরের এক তরুণ। এসময় তিনি চাঁদ ও অন্য গ্রহ-নক্ষত্রের গতি নির্ণয় করতে সচেষ্ট হলেন। কিন্তু তাঁর উদ্ভাবিত তত্ত্বের মধ্যে কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকা সত্ত্বেও তাঁর কৃতিত্বের অবদানস্বরূপ ট্রিনিটি কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁকে ফেলো হিসেবে নির্বাচিত করলেন। এ যেনো এক দুর্লভ পাওয়া। এবার তিনি আলোর প্রকৃতি ও তাঁর গতিপথ নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন। আর এই কাজের প্রয়োজনেই তিনি তৈরি করলেন প্রতিফলক টেলিস্কোপ (Reflecting telescope)। পরবর্তীকালে মহাকাশ সংক্রান্ত গবেষণার কাজে যে উন্নত ধরনের টেলিস্কোপ আবিষ্কৃত হয়। তিনিই তাঁর অগ্রগামী পথিক।

নিউটন ট্রিনিটি কলেজের গণিতের অধ্যাপক হিসেবে নির্বাচিত হলেন। এ সময় তিনি আলোর বর্ণচ্ছটা নিয়ে গবেষণার কাজে আত্মমগ্ন হলেন। ইংল্যান্ডের রয়াল সোসাইটিও নিউটনের বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজ শুরু হলে তাঁকে সোসাইটির সদস্য নির্বাচিত করলেন। তখন তাঁর বয়স ২৯ বছর মাত্র। ইংল্যান্ডের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের পাশে তাঁর স্থান হলো। সোসাইটির প্রথম সভায় নিউটন তাঁর আলোকতত্ত্ব নিয়ে একটি প্রবন্ধ পাঠ করলেন। তাঁর বিষয়বস্তুর সঙ্গে একমত না হতে পারলেও সোসাইটির অন্য সদস্যগণ উচ্চকণ্ঠেই তাঁর বৈজ্ঞানিক নিবন্ধের প্রশংসা করলেন।

মানুষের জানা ছিল না চন্দ্র-সূর্যের সঠিক আয়তন। নিউটন তা নির্ণয় করলেন। প্রতিষ্ঠা হল মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব। আর এই তত্ত্বের যাবতীয় বিবরণ লিখলেন তাঁর Pricipia Mathmetical গ্রন্থে। বইটি প্রকাশের ফলে অধিকাংশ মানুষের কাছেই মনে হলো এই বই জটিল দুর্বোধ্য। এজন্য নিউটনের এক দার্শনিক বন্ধু একদিন জিজ্ঞাসা করলেন, কিভাবে তোমার লেখার অর্থ বোঝা সম্ভব। নিউটন তাকে একটি বইয়ের তালিকা দিয়ে বললেন, এই বইগুলো আগে পড়ুন তাহলে আমার তত্ত্ব বোঝা সম্ভব।

১৬৭১ সালে তিনি লন্ডনের রয়াল সোসাইটির সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৬৭২ সালে তাঁর প্রথম বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ ‘আলোক বিজ্ঞান’ প্রকাশিত হয়। ১৬৮৪-১৬৮৬ সালে তিনি লেখেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘প্রিন্সপিয়া’। ১৬৮৯ সালে তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্লামেন্ট সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৬৯৬ সালে তিনি সরকারি টাকশালের ওয়ার্ডেন এবং পরে প্রধান পদ লাভ করেন। ১৭০৩ সালে নিউটন পেলেন এক অভূতপূর্ব সম্মান। তিনি রয়াল সোসাইটির সভাপতি। আমৃত্যু তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৭০৫ সালে রানী এয়ানি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এলেন। রানীর পক্ষ থেকে নিউটনের নাইটহুড উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

নিজেই নিজের বিরাট তত্ত্বকে সঠিকভাবে চিনতে পারেননি বিজ্ঞানী নিউটন। তার ভাষায় তিনি বলেন ‘আমি এতদিন কেবল নুড়ি পাথর কুড়িয়েছি।’ অসাধারণ আবিষ্কারের পরও তিনি ছিলেন অসুখী মানুষ। মৃত্যুর আগে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। এই মহান বিজ্ঞানী মৃত্যুবরণ করেন ১৭২৭ সালের ২০ মার্চ। সাতদিনের মাথায় ওয়েস্ট মিনিস্টার এরিতে সমাধিস্ত করা হয় তাকে।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী বলেই তার পরিচয় শেষ করা যায় না। তিনি এসকল বিশেষণের উর্ধ্বে। শেষ করছি কালের আরেকজন শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীর তার সম্বন্ধে করা উক্তিটি দিয়ে।

‘প্রকৃতি ছিল নিউটনের কাছে একটি খোলা বইয়ের মতোই, যার পাতাগুলো নিউটন কোনোরকম কষ্ট ছাড়াই পড়তে পারতেন।’

–আলবার্ট আইনস্টাইন।