ঢাকা, শনিবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২০, ১২ মাঘ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

মি. বিন; ইঞ্জিনিয়ার থেকে পুরোদস্তুর সেলিব্রেটি

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৬ জানুয়ারি ২০২০ সোমবার, ০৩:১৮ পিএম
মি. বিন; ইঞ্জিনিয়ার থেকে পুরোদস্তুর সেলিব্রেটি

পুরো নাম রোয়ান সেবাস্টিয়ান অ্যাটকিনসন। ডাক নাম রো। পুরো দুনিয়া তাকে চেনে একেবারে অন্যনামে, অন্য পরিচয়ে। স্যুট পরিহিত হাস্যকর চেহারার একজন লোক, কখনো সরাসরি কথা বলছেন না, সবার সঙ্গে দুষ্টুমি নয়ত বাচ্চাদের মতো একের পর এক ছেলেমানুষি, অঘটন ঘটিয়েই যাচ্ছেন। পর্দায় তা দেখে আমরা হেসে অস্থির হচ্ছি। তিনি আর কেউ নন, আমাদের সবার প্রিয় মি. বিন। এই অদ্ভুত মানুষটির আজ জন্মদিন, অসংখ্য শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা তার প্রতি।

১৯৫৫ সালের ৬ জানুয়ারি ইংল্যান্ডের নিউক্যাসল শহরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে তার জন্ম। তার বাবা এরিক অ্যাটকিনসন ছিলেন একজন কৃষক। তার মার নাম এল্লা মে। তার বড় দুই ভাই, রডনি অ্যাটকিনসন ও রুপরেট অ্যাটকিনসন। রডনি ছিলেন একজন অর্থনীতিবিদ।

ডারহামের ক্যাথেড্রাল স্কুল, নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয় এবং সবশেষে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে রোয়ান অ্যাটকিনসন মাস্টার্স করেন।

ছোটবেলা থেকেই রোয়ান হাসিখুশি একজন মানুষ। তবে খুব কম কথা বলতেন। রোয়ানের ডারহামের ক্যাথেড্রাল স্কুলে একটি ফিল্ম সোসাইটি ছিলো। সেখানে ফিল্ম সোসাইটির প্রধান বিষয় ছিল হাসির ও শিশুতোষ বিষয়ক সিনেমা। স্কুলে যখন চার্লি চ্যাপলিনসহ যাদের কমেডি মুভিগুলো দেখতেন, তখন থেকেই অভিনয়ের প্রতি তার আগ্রহ জন্মে। এরপর তিনি মঞ্চের ব্যাকস্টেজে কাজও শুরু করেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি পড়াশোনা নিয়ে মনোযোগী হয়ে পড়েন।

তোতলামির কারণে বার বার অভিনয়ের সুযোগ হারিয়েছিলেন মি বিন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন অভিনয়ের প্রতি আবার আগ্রহ জন্মায় রোয়ানের, একটি কমেডি গ্রুপে যোগ দেন। কিন্তু সেখানে কথার তোতলামির কারণে ভালো করতে পারেননি। এরপর অভিনয়ের দিকে মনোযোগী হলে সেখানেও একই সমস্যার সম্মুখীন হন তিনি। তোতলামির কারণে অনেকগুলো টিভি শো থেকে তাকে অযোগ্য ঘোষণা করে ফিরিয়ে দেয়। হতাশায় তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে। কিন্তু এরপরও তিনি নিজের উপর বিশ্বাস হারাননি।

বিনের সঙ্গে পরিচয় হয় রিজার্ড কার্টিস নামের একজন নাট্যকার ও গীতিকার অভিনেতার। রিচার্ড সাধারণত কমেডি চরিত্রে অভিনয় করতেন। রিচার্ড কার্টিস ও রোয়ান অ্যাটকিনসন দুজনে মিলে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে তোলেন ‘অক্সফোর্ড নাট্যশালা’। রিচার্ড কার্টিস ও রোয়ান অ্যাটকিনসন বিবিসি রেডিও থ্রিতে ‘দ্য অ্যাটকিনসন পিপলস’ নামের একটি স্যাটারিক্যাল ইন্টারভিউধর্মী অনুষ্ঠানে পারফর্ম করতেন। ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুক্তি পায় রোয়ান অ্যাটকিনসন অভিনীত মুভি ‘Dead on Time’। একই বছরের অক্টোবরে মুক্তি পায় রোয়ান অ্যাটকিনসন অভিনীত জেমস বন্ড সিরিজের ছবি ‘Never Say Never Again’ মুভিটি। মুভিটিতে রোয়ান অ্যাটকিনসন গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রে অভিনয় করেন।

১৯৯০ সালে ‘মি. বিন’ নিয়ে টেলিভিশন পর্দায় হাজির হন রোয়ান অ্যাটকিনসন। ‘মি. বিন’ মূলত ১৪ পর্বের একটি হাস্যরসাত্নক ব্রিটিশ টিভি ধারাবাহিক। ‘আইটিভি’ টেলিভিশন চ্যানেলে এর প্রথম পর্ব প্রচারিত হয়।

মি. বিনের চতুর্থ ও শেষ পর্বটির নাম ‘Hair by Mr. Bean of London’। প্রথমে শুধু টিভি সিরিয়াল থাকলেও মি. বিন নিয়ে অসংখ্য সিনেমা এবং কার্টুনও নির্মিত হয়েছে। মিস্টার বিন প্রতিটি ক্ষেত্রেই অসম্ভব জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। টানা বিশ বছর রোয়ান এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন।

২০১২ সালের নভেম্বরে রোয়ান অ্যাটকিনসন ডেইলি টেলিগ্রাফকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে বিন চরিত্রে আর না আসার ঘোষণা দেন। কারণ এই চরিত্রটি তাকে দিনে দিনে শিশুতে রূপান্তর করে দিচ্ছে। এই চরিত্রটি ফুটিয়ে তোলার জন্য যে শারীরিক শক্তির প্রয়োজন হয়, সেটিও তিনি পাচ্ছেন না। এছাড়া তার মতে, ‘একজন পঞ্চাশ ঊর্ধ্বের ব্যক্তিকে শিশুসুলভ অভিনয় করাটা একেবারেই বেমানান। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি এখন থেকে আমি সিরিয়াসধর্মী চরিত্রগুলোতেই শুধু অভিনয় করবো।’

কিন্তু পরবর্তীতে তার সিদ্ধান্ত থেকে তিনি সরে আসেন। ব্রিটেনের ডেইলি স্টার পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে রোয়ান বলেন, ‘প্রবীণ বয়সের মি. বিনকে নিয়ে আমরা কি কি করাতে পারি আর ঠিক কি রকমের হাস্যরস তার থেকে বের করে আনতে পারি, সেটা সত্যিই বেশ মজার ব্যাপার হবে। আর একজন বৃদ্ধের চরিত্রে অভিনয় করা আমার জন্যও হবে এক দারুণ অভিজ্ঞতা।’

২০১৭ সালে মুক্তি পায় তার মি. বিন সিরিজের নতুন সিনেমা ‘Huan Le Xi Ju Ren’।

১৯৯০ সালে রোয়ান অ্যাটকিনসন মেকআপ আর্টিস্ট সুনেত্রা শাস্ত্রির সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বেঞ্জামিন এবং লিলি নামের তাদের দুটি সন্তান রয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনে রোয়ান খুবই চুপচাপ স্বভাবের। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা বলেন না। তার শখ হলো স্পোর্টস কার সংগ্রহ করা। মজা পান নিজের টেনিস কোটের চারপারশে তার ছোট রেসিং কার নিয়ে ঘুরে বেড়াতে। ব্রিটিশ কার ম্যাগাজিনেও নিয়মিত লিখেন তিনি।

রোয়ান অ্যাটকিনসনের সঙ্গে সুনেত্রা শাস্ত্রির ২০১৫ সালে দুইযুগের সংসার ভেঙে যায়। সংসার ভাঙার কারণ নাকি রোয়ানের আবার প্রেমে জড়ানো। বিচ্ছেদের জন্য সুনেত্রা লন্ডনের সেন্ট্রাল ফ্যামিলি কোর্টে আবেদন করলে মাত্র ৬৫ সেকেন্ডের শুনানিতে তার আবেদন মঞ্জুর করেন আদালত।

২০০৫ সালে রম্য দর্শকদের ভোটে ব্রিটিশ কমেডি ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ৫০ কমেডিয়ানের তালিকায় নাম উঠে রোয়ানের। ইংল্যান্ডের রাজনীতি এবং রাজপরিবারের বিয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ডারহামের ক্যাথেড্রাল স্কুলে রোয়ানের সঙ্গী ছিলেন টনি ব্লেয়ার।