ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২০, ১৬ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

মকর সংক্রান্তি না বিহুর লগণ!

নিজস্ব প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৫ জানুয়ারি ২০২০ বুধবার, ০১:২৮ পিএম
মকর সংক্রান্তি না বিহুর লগণ!

আজ পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি, বাংলাদেশের ঢাকার আশেপাশে যাকে বলা হয় সাকরাইন বা অসমের ভাসায় বিহু উৎসব। যাই বলি না কেন দিনটি বাঙালি সংস্কৃতিতে একটি বিশেষ উৎসবের দিন। বাংলা পৌষ মাসের শেষের দিন এই উৎসব পালন করা হয়। সংক্রান্তি মূলত জ্যোতিষশাস্ত্রের একটি ক্ষণ। ‘মকর সংক্রান্তি’ শব্দটি দিয়ে নিজ কক্ষপথ থেকে সূর্যের মকর রাশিতে প্রবেশকে বোঝানো হয়ে থাকে। ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী সংক্রান্তি’ একটি সংস্কৃত শব্দ, এর দ্বারা সূর্যের এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে প্রবেশ করাকে বোঝানো হয়ে থাকে। ১২টি রাশি অনুযায়ী এরকম সর্বমোট ১২টি সংক্রান্তি রয়েছে।

নানা দেশে এই উৎসবের নানা নাম

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ায় এই দিবস বা ক্ষণকে ঘিরে উদযাপিত হয় উৎসব। নেপালে এই দিবসটি মাঘি নামে, থাইল্যান্ডে সংক্রান, লাওসে পি মা লাও, মিয়ানমারে থিং ইয়ান এবং কম্বোডিয়ায় মহাসংক্রান নামে উদযাপিত হয়। আবশ্যিকভাবে দেশ ভেদে এর নামের মতোই উৎসবের ধরনে থাকে কিছু পার্থক্য।

বাংলাদেশের পুরান ঢাকায় পৌষসংক্রান্তি সাকরাইন নামে পরিচিত। ভারতবর্ষের মতো একটি উষ্ণ অঞ্চলে ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে আরামপ্রদ সময় শীতকাল। এখানে বিভিন্ন ধরনের খাবার এবং অন্যান্য উপহার ছাড়াও পৌষমেলার মাধ্যমে পৌষসংক্রান্তি উদযাপিত হয়। বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিশেষ করে বাউল গানের আসর বসে।

পৌষ সংক্রান্তির দিন বাঙালিরা সারাদিনব্যাপি ঘুড়ি উড়ায়। এইদিন ঘুড়ি উড়ানোর জন্য তারা আগে থেকে ঘুড়ি বানিয়ে এবং সুতায় মাঞ্জা দিয়ে প্রস্তুতি নেয়। ঘুড়ি উৎসব বাংলাদেশের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী একটি উৎসব। মুঘল আমল থেকে এই উৎসব পালিত হয়ে আসছে। এই উৎসবে প্রচুর লোক সমাগম ঘটে। পুরান ঢাকার অধিবাসীদের কাছে এটি অত্যন্ত উৎসবমুখর দিন।

ভারতের নানা রাজ্যে একই দিনে উদযাপিত অনুষ্ঠান

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে মকর সংক্রান্তি বা পৌষসংক্রান্তি-তে মূলত নতুন ফসলের উৎসব `পৌষ পার্বণ’ উদযাপিত হয়। নতুন ধান, খেজুরের গুড় এবং পাটালি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী পিঠা তৈরি করা হয়, যার জন্য প্রয়োজন হয় চালের গুঁড়া, নারিকেল, দুধ আর খেজুরের গুড়। মকরসংক্রান্তি নতুন ফসলের উৎসব ছাড়াও ভারতীয় সংস্কৃতিতে `উত্তরায়ণের সূচনা হিসেবে পরিচিত। অন্য দিকে বীরভূমের কেন্দুলী গ্রামে এই দিনটিকে ঘিরে ঐতিহ্যময় জয়দেব মেলা হয়। বাউল গান এই মেলার অন্যতম আকর্ষণ। অসমে এই দিনে হয় বিহু উৎসব। ভারতের উত্তর এবং পশ্চিম প্রদেশগুলোতে উৎসবটি প্রবল আগ্রহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে সংক্রান্তি দিবস হিসেবে পালিত হয়। প্রাচীন মহাকাব্য মহাভারতেও এই দিনের তাৎপর্য সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে। তাই সামাজিক এবং ভৌগোলিক গুরুত্ব ছাড়াও এই দিনটি ঐতিহাসিক এবং ধর্মীয় গুরুত্ব বহন করে।

পশ্চিম ভারতীয় প্রদেশ গুজরাটে উৎসবটি আরো অনেক বড় আকারে উদযাপিত হয়। মানুষ, সূর্য দেবতার কাছে নিজেদের ইচ্ছা বা আকূতিকে সুন্দর সুন্দর ঘুড়ির মাধ্যমে প্রকাশ করতে পালন করে ঘুড়ি উৎসব, যা মূলত প্রিয় দেবতার কাছে পৌঁছানোর জন্য একটি রূপক বা প্রতীক হিসেবে কাজ করে। গ্রামগঞ্জে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ হিসেবে মোরগ লড়াই অনুষ্ঠিত হয়। মকরসংক্রান্তি সম্মান, অভিলাষ এবং জ্ঞানের দেবী সরস্বতীকে সম্মান প্রদানের মাধ্যমেও প্রকাশিত হয়। যেহেতু উৎসবটি শীতের মাঝামাঝি সময়ে উদযাপিত হয়, সেহেতু এই উৎসবে এমন ধরনের খাবার তৈরি করা হয়, যা শরীরকে উষ্ণ রাখে এবং বেশ শক্তি জোগায়। গুড় দিয়ে তৈরি তিলের লাড্ডু এই উৎসবের অন্যতম উপাদেয় খাবার। মহারাষ্ট্রে একে বলা হয় `তিলগুল’। কর্ণাটকে একে বলা হয় `ইল্লু বিল্লা’। অন্য কিছু প্রদেশে গবাদিপশুকে নানা রঙে সজ্জিত করা হয় এবং আগুনের ওপর দিয়ে ঝাঁপ দেওয়ানো হয়।

বাঙ্গালী যারা উৎসব, পার্বণের নাচ গানের সাথে পরিচিত তাদের অনেকেই এই মজার গানের সাথে নাচ দেখে থাকবেন। সেটি হলো-

বিহুরে লগন মধুরে লগন,// অকাশে বাতাসে লাগিল রে// চম্পা ফুটিছে চামলী ফুটিছে,// তার সুবাসে ময়না আমার ভাসিল রে//হলুদ বরন মেঘলা এ তার যৌবন উছলায়// লাল ওরনার আড়াল দিয়া চক্ষু দুটি চায়// খোপায় টগর ময়না বুঝি আমায় খুঁজে হায়//বসন্তে এ বিহুর লগন উত্তাল হয়ি যায়//....................................।

কিন্তু আমাদের অনেকের মনেই প্রশ্ন আছে যে, এই বিহু কী? এর লগন কেনই বা মধুর হয়। আসলেই সব উৎসবের ক্ষণ মধুর যে হয় তাতে কনই সন্দেহ নেই। উৎসবে জীবনের রঙ বদলায়, মনের রঙ বদলায়। বিহু আসলে অসমের জাতীয় উৎসব। কিন্তু জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে অবিভক্ত বাংলা ও তার আশেপাশের বাঙ্গালীদের মাঝে এর প্রভাব পড়েছে দারুণভাবেই। আসলে এটা কৃষিভিত্তিক উৎসব। শস্যের উৎপাদন ভালো করা বা উৎপাদিত ফসল দেবতার নামে উৎসর্গ করার লক্ষ্যেই এই বিহু অনুষ্ঠান মানে প্রার্থনা অনুষ্ঠান করা হয়। যাতে থাকে নাচ, গান আর বিভিন্ন ধরনের খাবারের ব্যবস্থা। বিহু নাচ ঠিক কবে শুরু হয়েছিল তা সঠিক জানা যায় না, তবে কথিত আছে যে ১৬৯৪ সালে অহম রাজা রুদ্র সিংহের আমলে এই নাচ প্রথম হয়।

বিহু উৎসব মূলত তিন প্রকার। এগুলো হচ্ছে বহাগ বিহু বা রঙ্গালী বিহু, কাতি বিহু বা কঙ্গালী বিহু আর মাঘ বিহু বা ভোগালি বিহু।

বহাগ বিহু বা রঙ্গালী বিহু

অসমের মূল বিহু উৎসব বসন্তের শুরুতে উদযাপন করা হয়। রঙ্গালী বিহু যৌবনের উৎসব। বহাগ বা রঙ্গালী বিহু সাতদিন ধরে উদযাপন করা হয়। চৈত্র সংক্রান্তির দিন থেকে আরম্ভ করে পরের মাসে ৬ তারিখ পর্যন্ত এই উৎসব হয়ে থাকে। এই সাতদিনে প্রত্যেকদিনে বিহুর পৃথক নাম রয়েছে। রঙ্গালী বা বহাগ বিহু হচ্ছে আনন্দের বিহু। বৈশাখ মাসের প্রথমদিন থেকেই গান-বাজনা ও বিহু নৃত্যের মাধ্যমে রঙ্গালী বিহু অনুষ্ঠান পালন করা হয়। রঙ্গালী বিহু মূলত অসমিয়া জাতির সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কিন্তু এখানে অসমের বিভিন্ন জনজাতি যেমন: বড়ো, তিবা, কছাড়ি ইত্যাদি জনজাতিরা নিজেদের সাংস্কৃতি প্রকাশ করার সুযোগ পায়। অসমীয়া সংস্কৃতির বাদ্যযন্ত্র ঢোল, পেপা, বাঁশি ব্যবহার করে গাওয়া গান ও বিহু নর্তকদের নাচ বিহু মঞ্চকে সুমধুর করে তোলে।

কাতি বিহু বা কঙ্গালী বিহু

কার্তিক সংক্রান্তির দিনে কাতি বিহু উদযাপিত হয়৷ এইসময় আঊশ ধানের চাষ শেষ হয়। এই বিহুকে কঙ্গালী বিহুও বলা হয়ে থাকে। এই সময় কৃষকদের শস্যভান্ডার প্রায় শূন্য থাকে এবং শস্য মাঠে ফলনশীল অবস্থায় থাকে। ফলনশীল ধানকে রক্ষা করার জন্য কৃষক একটি বাঁশদন্ড ঘুরিয়ে রোয়া-খোয়া নামক মন্ত্র উচ্চারণ করে অশুভ শক্তি ও পোকামাকড়কে দূরে সরানোর চেষ্টা করেন। এই বিহুতে লম্বা বাঁশদন্ডের ডগায় আকাশ বন্তি বা আকাশ গঙ্গা নামক প্রদীপ জ্বালিয়ে মৃতদের আত্মার স্বর্গের রাস্তা দেখানোর রীতিও প্রচলিত।

মাঘ বিহু বা ভোগালী বিহু

মাঘ মাসে ভোগালী বিহু বা মাঘ বিহু পালন করা হয়। ভোগালী শব্দটি ভোগ বা খাদ্য থেকে এসেছে। এই বিহু তিনদিন ধরে পালন করা হয়। পৌষ সংক্রান্তির দিনের বিকেলবেলায়, যা উরুকা নামেও পরিচিত, যুবকেরা নদীর তীরে মাঠে উৎপাদিত শস্যের খড় দিয়ে ভেলাঘর নামক কুটীর নির্মাণ করেন এবং তা দিয়ে রাত্রে মেজি নামক আগুন জ্বালিয়ে উৎসব পালন করেন। রাত্রিবেলায় তারা মেজির চারপাশে জড়ো হয়ে বিহুগীতের গান করেন, ঢোল আদি বাদ্যযন্ত্র বাজান এবং সমবেত ভাবে খাবার খান। এই দিন সারাদিন ধরে মোষের লড়াই, মোরগের লড়াই প্রভৃতি ক্রীড়া চলতে থাকে। নাচ বিহু উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ।

বাংলা ইনসাইডার