ঢাকা, শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২০, ২৩ শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

সমাজটা কি ভালোবাসাহীন?

শাহরিনা হক
প্রকাশিত: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০ শুক্রবার, ১১:০১ এএম
সমাজটা কি ভালোবাসাহীন?

ভালোবাসা ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না, দেখাও যায় না। একে শুধু মন দিয়ে অনুভব করতে হয়। এটা পুরনো কথা এবং অত্যন্ত সত্যি কথা। এটা যেমন জোর করে হয় না, তেমন ইচ্ছার বিরুদ্ধে ভালোবাসা বা ভালোবাসার মানুষকে উপেক্ষাও করা যায় না। কিন্তু কালে কালে বোধহয় ভালোবাসার প্রকাশের ধরনগুলো পাল্টে যায়। দিন বদলাচ্ছে, সমাজ আধুনিকতর হচ্ছে, সেই সঙ্গে পাল্টাচ্ছে ভালোবাসা ধারণ এবং প্রকাশের ধরন। আমরা মানুষগুলোও দিন দিন বদলে যাচ্ছি।

ভালোবাসা শুধুমাত্র দুজন মানুষের প্রেম নয়, সেভাবে ব্যাখ্যা দেওয়াও সম্ভব না। ভালোবাসা সবার জন্য। বাবা-মা, ভাই-বোন, বন্ধু-সহকর্মী, শিক্ষক বা যেকোনো কেউ। ভালোবাসা তৈরি হয় বলেই তো সম্পর্কগুলো একটা পরিচিতি পায়। এই একই সমাজে আমাদের ভালোবাসার তীব্রতা আজকাল কেন যেন কমে যাচ্ছে, আমরা কেন যেন বড্ড বেশি যান্ত্রিক হয়ে গেছি। অনুভূতি, ভালোবাসা, ভালোলাগার তীব্রতা কমে যাচ্ছে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক নগর সভ্যতায় ইট পাথরের শহরে এই পরিবর্তনের গতি বেড়েছে ক্রমশ। এই প্রেমিক-প্রেমিকাদের ভালোবাসার কথাই যদি ধরি, আগেরদিনে এমন ফেসবুক, সারারাত জেগে ফোনে কথা বলার কোনো চল ছিল না। মাঝেমধ্যে কোনো ভালোলাগার জায়গায় দেখা করা, নিয়মিত চিঠি লেখা, ছোটখাট উপহার আর পার্কে বসে বাদাম খাওয়া তো আছেই। আর এখনের কথা ভাবুন। রেস্টুরেন্ট ছাড়া তো প্রেম জমছেই না, ভালোবাসার সব মুহূর্তগুলো সামাজিক মাধ্যমে সবার জন্য শেয়ার করা, উপহারের পর উপহার দেওয়া, মন রক্ষা করে চলা, প্রতিদিন নিয়মিত দেখাসাক্ষাত না হলে ভালোবাসা যেন জমছে না। মাঝেমধ্যে মনে হয় এগুলো লোক দেখানোই বোধহয়, ভেতরের সেই আবেগ কোথায় যেন নেই।

বাবা-মায়ের প্রতি ভালোবাসা আজীবন অক্ষয় এবং চিরন্তন। এই ভালোবাসা অতুলনীয়। আগেরদিনে পরিবারে সবচেয়ে বড় বন্ধুই ছিল বাবা-মা ভাইবোন। সেই দিনও বদলেছে। সন্তানেরা দূরত্ব রেখে চলছে, নিজেদের সব কথা অভিভাবকদের সঙ্গে সেভাবে মন খুলে শেয়ারও করছে না। সম্পর্কের গভীরতা কমছে। একটা সময় একসঙ্গে টেলিভিশন দেখা, খাবার টেবিলে সারাদিনের আড্ডা, সবাই মিলে দূরে কোথাও ঘুরতে যাওয়া ছিল নিয়মিত, এখনকার দিনে সেগুলো কমে গেছে। যে যার মতো নিজেকে নিয়েই যেন বেশি ব্যস্ত।

আত্মীয়-স্বজনেরাও এখন দূরের সম্পর্কিত হয়ে পড়ছে। এখন এমনও হয় যে খুব কাছের স্বজনদেরও আমরা চিনি না। কিছুদিন আগেও দূর-দূরান্তে থাকা আত্মীয়দের বাড়িতে ঘটা করে বেড়াতে যাওয়া, একান্ত সময় কাটানো খুব নিয়মিত বিষয় ছিল। আমরা সময় পাচ্ছি না- এই অজুহাতে নিজেকে গুটিয়ে রাখছি, নিয়মিত স্বজনদের খোঁজটাও নিচ্ছি না। শুধু উৎসব আর আয়োজনেই তাদের সঙ্গে দেখা আর সৌজন্যতাবোধ।

বন্ধুত্ব এমনই একটা সম্পর্ক, যেখানে ভালোবাসা জরুরি। এখনকার দিনে পাশে থাকা বন্ধুর চেয়ে সামাজিক মাধ্যমের বন্ধুত্বই বেশি ঘনিষ্ঠ। বন্ধুরা এখন খুব কমই বিকেলের আড্ডায় মাতে, গলা খুলে সেই গান ধরা, পিকনিক, রাত জেগে সিনেমা দেখা এখনো হয়, কিন্তু সেই আগের মতো নয়। বন্ধুত্ব জমে বেশি মুঠোফোনে, সামনাসামনি দেখা বা আড্ডা না হলে নাই।

একটা সময় সহকর্মীরাও জীবনের অংশ ছিল। এখন যে তেমনটা নেই, তাও না। এখন যেন প্রতিযোগীতা বেড়ে গেছে, কথাবার্তা আর যোগাযোগ কিছুটা ভার্চুয়াল হয়ে গেছে। সেই সৌহার্দ্য, আড্ডা, অফিস শেষে আলাদা সময় কাটানো এখন খুব একটা হয় না। কাজের খাতিরে যা হচ্ছে হয়, এর বাইরে কিছু নয়, সেই সময়টাই বা কই আমাদের!

প্রতিবেশীরা জীবনের অন্যতম অংশ। সুখে-দুঃখে এরাই সবার আগে এগিয়ে আসবে, পাশে থাকবে। কিন্তু একটা কথা এখন সবাই জানি, পাশের বাড়িটিতে কে বা কারা থাকে, সেটার খোঁজও আমরা অনেক সময় রাখি না। কারণ আমাদের সেই প্রয়োজনও ফুরিয়েছে।

আমরা নিজেদের এখন এতো বেশি গুটিয়ে রাখি আর নিজস্বার্থের কথা চিন্তা করি তাতে করে মন থেকে ভালোবাসা কমে যাওয়াটা স্বাভাবিক। আর এই ফাঁকে আমরা যে কখন সমাজটাকে ভালোবাসাহীন করে ফেলেছি, সেটা বুঝতেও পারিনি। কারো পাশে দাঁড়ানোকে কখনো কখনো মনে হয় বিপদ ডেকে আনা। মনে মনে বলি, কি দরকার খামাখা নিজের বিপদ বাড়িয়ে! নিজেকে নিয়ে এত বেশি ব্যস্ত যে পাশে থাকা মানুষ আর সম্পর্কগুলো যে হারিয়ে যাচ্ছে, সেটাই টের পাচ্ছি না। এটাই এখনকার সমাজের বাস্তবতা, স্বার্থপর সমাজ আমাদের নিজের হাতেই তৈরি। ভালোবাসা এখানে অধরা নয়, উপেক্ষিত।

নিজের পাশাপাশি আশেপাশের সবকিছুকে ভালোবাসতে হবে একটা সুন্দর সমাজ আর একটা সুন্দর পৃথিবীর জন্য। তা না হলে এতো আয়োজন করে ভালোবাসা দিবসেরই বা কি মানে আছে! ভালোবাসা বাড়ুক, দূরত্ব কমুক সব সম্পর্কের। সহিংসতা আর দ্বিধাবোধ যেন ভালোবাসাকে গ্রাস না করে, ভালোবাসার দিনে এই হোক আমাদের প্রত্যাশা।