ঢাকা, রোববার, ০৫ এপ্রিল ২০২০, ২১ চৈত্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

একটি ভাষা কেন শক্তিশালী হয়

মোস্তাকিম ভুঞা
প্রকাশিত: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ শুক্রবার, ০৮:৩১ এএম
একটি ভাষা কেন শক্তিশালী হয় ছবি: ইন্টারনেট

ইথনোলগের ২১তম সংস্করণ অনুযায়ী বিশ্বে সর্বমোট ভাষার সংখ্যা ৭০৯৭টি। প্রাতিষ্ঠানিক ভাষার সংখ্যা ৫৮০টি, বিকাশমান ভাষা ১,৫৯০টি, সংকটাপন্ন ভাষা ১,৫৫৯টি। আর বিলুপ্তির পথে যাচ্ছে, এমন ভাষার সংখ্যা তারা উল্লেখ করেন ৯২২টি। ‘সামার ইন্সটিটিউট অফ লিঙ্গুইস্টিক্স’ এর মালিকানাধীন এই প্রতিষ্ঠানটি সারা বিশ্বে ২ হাজার ৪৪৬ টি ভাষাকে শক্তিশালী ভাষা হিসেবে উল্লেখ করে।

পৃথিবীতে অসংখ্য ভাষা প্রচলিত থাকার পরও, সকল ভাষা কিন্তু শক্তিশালী হয় না। জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে শুধু ছয়টি ভাষা ব্যবহৃত হয়। আরবি, ফরাসি, ইংরেজি, স্প্যানিশ, মান্দারিন  ও রুশ ভাষা। ১৯৩ টি রাষ্ট্র জাতিসংঘের সদস্য হলেও, দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে কিন্তু সব রাষ্ট্রের ভাষা স্থান পায়নি।

আবার যখন কেউ নতুন ভাষা শিখে, যে কোন একটি ভাষা কিন্তু শিখে না। নানা প্রয়োজনে আমরা দ্বিতীয় ভাষা শিখি। কেউ শিখে উচ্চশিক্ষার জন্য, কেউ প্রবাসি হওয়ার জন্য, কেউ জীবিকার প্রয়োজনে, আর কেউ শিখে একান্তই নিজস্ব আগ্রহ থেকে। তাই, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও বাঙালির ভাষা আন্দোলনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে, আমাদের বাংলা ইনসাইডারের পাঠকদের জন্য একটি ভাষা শক্তিশালী হওয়ার ক্ষেত্রে কিছু নির্দেশক তুলে ধরছেন মোস্তাকিম ভুঞা:

ভাষার ব্যবহার

একটি ভাষা ঠিক কতটা শক্তিশালী হবে, তা নির্ভর করে ভাষাটির ব্যবহারের উপর। কেমন সংখ্যক লোক তাদের যোগাযোগের কাজে সাংকেতিক এই ভাষাটিকে ব্যবহার করে, বিভিন্ন মাধ্যম যেমনঃ বই, সংবাদপত্র, টেলিভিশনে এর ব্যবহার কি রকম ইত্যাদি বিষয়গুলো একটি ভাষা শক্তিশালী হওয়ার ক্ষেত্রে নির্ভর করে।

সামাজিক মর্যাদা

একটি ভাষা সমাজের কোন শ্রেণির মানুষ ব্যবহার করছে, তার উপর ঐ ভাষার শক্তিমত্তা নির্ভর করে। যেমনঃ হিব্রু বলতে গেলে একটি বিলুপ্ত প্রায় ভাষা। কিন্তু বর্তমান ইসরাইল রাষ্ট্র ও ইহুদিরা ব্যবহারের মাধ্যমে ভাষাটিকে প্রাণ দিয়েছে। ফলে, মৃতপ্রায় অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে জাদুঘরে চলে যাওয়া এই ভাষাটি।

রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা

একটি ভাষা শক্তিশালী হয়ে উঠার পিছনে, ঐ রাষ্ট্রের আর্থিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতা একটি বড় বিষয়। মানুষ মাত্রই অনুকরণপ্রিয় এবং প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় থাকতে ভালোবাসে। যেমনঃ আমাদের দেশ থেকে প্রতি বৎসর হাজার হাজার বাংলাদেশি চাইনিজ, জাপানিজ, জার্মানি, ফরাসি, ফারসি ইত্যাদি ভাষা শিখে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে। কারণ এই রাষ্ট্রগুলোর আর্থনীতিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতা আমাদের রাষ্ট্রের তুলনায় উপরের দিকে। কারণ, তাদের কাউকে শোনা, ত্‌সোয়ানা, জুলু,  ক্‌হোসা, কিকুয়ু, কিসুকুমা ও লুও ইত্যাদি আফ্রিকান ভাষা শিখে আফ্রিকাতে পাড়ি দিতে দেখি না।

জ্ঞান উৎপাদন

কোন একটি ভাষা শক্তিশালী হয়ে উঠার পিছনে, ঐ ভাষায় জ্ঞান উৎপাদন অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কোন একটি ভাষায় জ্ঞান উৎপাদন করা হলে, তা এমনিতেই শক্তিশালী হয়ে যায়। যেমনঃ ধরেন ইংরেজির কথা। এই ভাষাটি আন্তর্জাতিক হয়ে উঠার পিছনে জ্ঞান উৎপাদনই সবচেয়ে বড় নির্দেশক। শুধু বই পড়া কিংবা উচ্চ শিক্ষার জন্য আমাদের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের প্রায় সবাইকেই এই ভাষা আত্মীকরণ করতে হয়।

এমনকি উচ্চ শিক্ষার জন্য বাংলাদেশের কোন বিষয় নিয়ে গবেষণা করবেন, তাও প্রকাশ করা হয় ইংরেজিতে। গবেষণাটি যাদের নিয়ে করা, যাদের জন্য করা তাদের ভাষা ইংরেজি নয়, বাংলা। তাতে সমস্যা নেই। এই গবেষণা পড়ে, যারা উচ্চ শিক্ষার সুযোগে আপনাকে বৃত্তি দিবে; তারা তো ইংরেজি ভাষা না হলে তা পড়তে পারবে না।

প্রযুক্তি পণ্য

ভাষা শক্তিশালী হয়ে উঠার পিছনে প্রযুক্তি পণ্য আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শুধু প্রযুক্তি পণ্য ব্যবহার করার জন্যই অনেকেই ইংরেজিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠে। চীনারা এই কারণে নিজেদের প্রযুক্তি পণ্য তাদের মাতৃভাষা মান্দারিনে তৈরি করে। তারা ভাষাগত কিংবা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার হতে চায় না।

আমরা ইংরেজি শিখি দেশের কিংবা বাইরের প্রতিষ্ঠানে চাকরি বা কাজ করার জন্য। আর তারা বাইরের দেশেও কাজ করে নিজেদের ভাষা মান্দারিনে। যে দেশের জন্য কাজ করে ঐ দেশ, তারা কি বলছে তা বোঝার জন্য নিজেদের টাকা খরচ করে দোভাষী নিযুক্ত করেন। আমরা অতিরিক্ত সামাজিকতায় অভ্যস্ত হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ফেইসবুক’ দিনরাত ব্যবহার করি। আর চীন দেশে আপনি ফেইবুক পাবেন না, তারা নিজেদের ভাষায় নিজেরা ‘উইচ্যাট’ তৈরি করেছে।    

পৃষ্ঠপোষকতা

একটি ভাষাকে শক্তিশালী করতে হলে দীর্ঘ সময় নিয়ে এর পৃষ্ঠপোষকতা করতে হয়। এর জন্য যেমন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা করতে হয়, তেমনি এগিয়ে আসতে হয় সচেতন নাগরিকদের। যেমনঃ আপনি যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক ভাষা ইন্সিটিউটে গিয়ে থাকেন, দেখবেন সেখানে হিন্দি ভাষা শেখানোর জন্য ভারত সরকার রাষ্ট্রীয়ভাবে নানা রকম সহায়তা বা উপহার দেয়। সেখানে শিখানো হয়, এমন প্রত্যেকটা ভাষার জন্যই ঐ নির্দিষ্ট রাষ্ট্র তাদের অ্যাম্বাসির মাধ্যমে পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকে।

কোন ভাষা কিভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠে, এমন প্রশ্নের উত্তরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. নাদির জুনাইদ বলেন, “ভাষা শক্তিশালী হয়ে উঠার পিছনে মাধ্যম অনেক গুরুত্বপূর্ণ, যেমনঃ সিনেমা, গণমাধ্যম, বই ইত্যাদি। কোন ব্যক্তি যে মাধ্যমে যে ভাষার আধেয় গ্রহণ করে, ঐ নির্দিষ্ট ভাষার প্রতি তার একটা নির্দিষ্ট ঝোঁক তৈরি হয়। এটা ব্যক্তির একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়”। তিনি আরও বলেন এখানে রাষ্ট্রের সরাসরি কর্তৃত্ব না থাকলেও, কিছু সূক্ষ্ম বিষয় থাকে। যেমনঃ একসময় ইংরেজরা কিংবা ফরাসিরা সাম্রাজ্যবাদী ছিল, ফলে এই ভাষাগুলো শক্তিশালী।

আমাদের উপমহাদেশের প্রচলিত ভাষাগুলো ইন্দো-ইউরোপীয়ান ভাষা গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এবং উৎপত্তিও একই শাখা থেকে। তাই, এই ভাষাগুলোর মধ্যে কিছু সাধারণ শব্দ রয়েছে, যা এখানে প্রচলিত অন্যান্য ভাষাগুলোর মধ্যেও বিদ্যমান। ফলে, বাংলা বা হিন্দির মধ্যে যেমন কিছু সাদৃশ্য রয়েছে। তেমনি, কিছু সাদৃশ্য উপমহাদেশের অন্যান্য ভাষাগুলোর মধ্যেও রয়েছে।

ধরেন, আপনি ইউটিউবে কোন একটি সিনেমা দেখতে গেলেন, সিনেমাটি ভিনদেশি ভাষার হওয়ার কারণে আপনি খুব একটা আরামবোধ করছেন না। বাংলা ডাবিং পাওয়ার সম্ভাবনাও খুব ক্ষীণ। এমন সময়, হিন্দিতে একটা ডাবিং পেয়ে গেলেন। সম্ভাবনার হিসেব করলে, বেশি সম্ভাবনা থাকে আপনি হিন্দি ডাবিংটা দেখবেন। আর এভাবেই, আমরা ‘ভাষাগত সাম্রাজ্যবাদ’ বা ‘Linguistic Imperialism’ এর শিকার হই। আপনি, আমি, আমরা কেউই এই ভাষাগত সাম্রাজ্যবাদের বাইরে না। আর এই বিষয়গুলো আপনি একটু সচেতন হলেই খুব সহজে বুঝতে পারবেন। একটু তলিয়ে পর্যবেক্ষণ করলেই বের করতে পারবেন অসংখ্য নেতিবাচক দিক।