ঢাকা, রোববার, ০৫ এপ্রিল ২০২০, ২১ চৈত্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

সাংবাদিকতা শিক্ষার্থীদের যত চাকরি

মোস্তাকিম ভুঞা
প্রকাশিত: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ মঙ্গলবার, ০৪:৫৫ পিএম
সাংবাদিকতা শিক্ষার্থীদের যত চাকরি প্রতীকি ছবি

বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক সাংবাদিকতা শিক্ষার যাত্রা শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৬২ সালে। এর বাইরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পরিচালিত বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনাল’স ইত্যাদি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হচ্ছে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সাংবাদিকতা পড়ানো হয় ষ্টেট ইউনিভার্সিটি, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি, গ্রীন ইউনিভার্সিটি, ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ডেভলাপমেন্ট অল্টারনেটিভ, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসে।

বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর শিক্ষার এই বিষয়টির নাম গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা। স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের পুরো সিলেবাস জুড়ে থাকে যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়টি। তাত্ত্বিক পড়াশোনার পাশাপাশি, হাতে কলমে শেখানো হয় নানাবিধ কাজ। এর মধ্যে বাংলা ও ইংরেজি টাইপিং, পত্রিকার পৃষ্ঠাসজ্জা, সহ সম্পাদনা, ছবি ও ভিডিও সম্পাদনা, সরেজমিনে প্রতিবেদন তৈরিকরণ, প্রয়োজনীয় কম্পিউটার সফটওয়্যারের ব্যবহার ইত্যাদি কাজগুলো ৪-৫ বৎসরের শিক্ষাজীবনে হাতেকলমে শেখানো হয়।

মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরাই মূলত সাংবাদিকতায় পড়তে আসে। অবশ্য বিজ্ঞান বা ব্যবসা শিক্ষা থেকে আসা শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কম নয়। তাই বলা যায়, মানবিক, বিজ্ঞান, ব্যবসা শিক্ষা সকল বিভাগ থেকেই শিক্ষার্থীরা এখানে পড়তে আসে। আমাদের অনেকেরই ধারণা এই বিষয়ে পড়াশোনা করলে, সাংবাদিকই হওয়া লাগে। অন্য পেশায় যাওয়া যায় না। এমনকি এই বিষয়ের অনেক শিক্ষার্থীরও স্বচ্ছ ধারণা নেই। পড়াশোনা শেষে তাদের কোন পেশায় যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তাই বলে রাখা ভালো, সাংবাদিকতা শিক্ষার্থীদের চাকরির সুযোগ কলা বা সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অন্য যে কোন বিষয়ের চেয়ে বেশি। আইন বা অর্থনীতির চেয়েও কোন অংশে কম নয়। তাই, বাংলাদেশের জাতীয় চাকরি ‘বিসিএস’ এর বাইরে গিয়ে, সাংবাদিকতার শিক্ষার্থী হিসেবে আপনার কোন কোন চাকরিতে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে, তাই নিয়ে আজকের এই ফিচার। লিখেছেন বাংলা ইনসাইডারের সহ-সম্পাদক মোস্তাকিম ভুঞা।   

সাংবাদিক

শুরুতেই বলছি সাংবাদিকতার কথা। এই বিষয়ে পড়াশোনা করলে, সবাই আগে থেকে ধরেই নেয় আপনি সাংবাদিক হবেন। বাংলাদেশের বিস্তৃত ‘গণমাধ্যম শিল্প’ সাংবাদিকতা পেশার জন্য আপনার সবচেয়ে বড় সুযোগ।

কিন্তু, সাংবাদিকতা পেশায় জীবিকা গড়ার পথটা সবসময়ই বন্ধুর ছিল। আর সাম্প্রতিক সময়ে এই বন্ধুরতার মাত্রা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি, কিছু টেলিভিশন চ্যানেল তাদের বার্তা বিভাগ বন্ধ করে দিয়েছে। কম বেশি প্রায় সকল গণমাধ্যমেই হয়েছে কর্মী ছাঁটাই। তাছাড়া, বেতন আটকে থাকা কিংবা আশানুরূপ বেতন না দেওয়া, ইত্যাদি অভিযোগ তো চিরন্তন সত্য হয়ে গেছে।

ফলে, অনেক সময় এই পেশায় থাকা জ্যৈষ্ঠরা কনিষ্ঠদের সাংবাদিকতায় আসতে নিষেধ করে। আপনার ভবিষ্যৎ কতটা অনিশ্চিত, তার চূড়ান্ত পরীক্ষা হিসেবে এই পেশাটা মন্দ না।

দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকায় স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কাজ করছেন গোলাম রাব্বানি। স্নাতক সম্পন্ন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে। পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাকে বেছে নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন,“বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় অনেক প্রতিকূলতা ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এটাকে শুধু চাকরি হিসেবে নিলে এখানে না আসাটাই ভালো”। তিনি আরও বলেন, এই পেশার জন্য ঝুঁকি নেওয়ার সাহস ও ধৈর্য থাকলে ভালো হয়।

জনসংযোগ কর্মকর্তা/ কমিউনিকেশন অফিসার

তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ তে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে একজন করে জনসংযোগ কর্মকর্তা রাখার কথা বলা হয়েছে। সরকারি চাকরির এই পদে আপনি কর্মজীবন শুরু করবেন নবম গ্রেড থেকে। তবে প্রতিষ্ঠানভেদে, পদোন্নতির হিসেবে একটু ভিন্নতা রয়েছে। এখানে ইনক্রিমেন্ট, পেনশন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সরকারের ওয়েজ বোর্ড অনুযায়ী।   

প্রতিষ্ঠানের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গণমাধ্যমে তুলে ধরার পাশাপাশি নেতিবাচক বিষয়গুলোকে ইতিবাচক করে উপস্থাপন করাই হবে আপনার প্রধান কাজ। সেইসাথে প্রতিষ্ঠানের মাসিক কিংবা বার্ষিক প্রতিবেদন, প্রকাশনা ইত্যাদি তৈরির পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের আরোপিত কিছু কাজ করতে হবে আপনাকে।  

ইশতিয়াক আহমেদ, জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে আছেন বাংলাদেশ কারিগরি শিল্প সহায়তা কেন্দ্রে। সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটিতে জনসংযোগ কাজের বিষয়ে তিনি বলেন,“সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য জনসংযোগ একটি ভাল কাজের ক্ষেত্র। অন্যান্য চাকরির চেয়ে এখানে উদ্ভাবনী কাজের সুযোগ অনেক বেশি”।

তিনি আরও জানান, জনসংযোগের কাজের জন্য সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীদের নতুন করে কিছু শেখা লাগে না। তাছাড়া, অন্যান্য চাকরির চেয়ে এখানে কাজের চাপ তুলনামূলকভাবে অনেক কম।

আমাদের সরকারি বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেমন ‘জনসংযোগ কর্মকর্তা’ নিযুক্ত থাকেন। তেমনি, এনজিও, আন্তর্জাতিক দাতব্যসংস্থা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে একই কাজটি করে থাকেন ‘কমিউনিকেশন অফিসার’। অবশ্য প্রতিষ্ঠানের ধরণ ও নীতিমালার ভিত্তিতে কাজ-কর্ম ও দায়িত্বে অল্প বিস্তর ভিন্নতা থাকে।

‘কমিউনিকেশন অ্যাসিসটেন্ট’, ‘কমিউনিকেশন এসোসিয়েট’ ‘কমিউনিকেশন এক্সপার্ট’ ইত্যাদি বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। আর বেসরকারি এই চাকরিগুলো চুক্তিভিত্তিক বলে, তারা আপনাকে বেতনও দিবে আকর্ষণীয়। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে ‘কমিউনিকেশনস এসিস্ট্যান্ট’ পদে কাজ করছেন ওয়াহিদা জামান সিথি। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)র এই যোগাযোগ কর্মকর্তা বলেন, “ভালো ফলাফলের পাশাপাশি প্র্যাক্টিকাল কাজের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা এই পেশায় গুরুত্ব পায়। সৃজনশীল হওয়ার কোন বিকল্প নেই। সেইসাথে ভালো করতে চাইলে প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে থাকাটাও জরুরি”।

তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহে যোগাযোগ ক্ষেত্রে বাড়ছে চাকরির সুযোগ। প্রতিনিয়ত নতুন চিন্তা নিয়ে আসা ও নতুন কিছু তৈরি করার আনন্দ, এই কাজে কখনো একঘেয়েমি আসতে দেয় না।

তথ্য কর্মকর্তা

‘জনসংযোগ কর্মকর্তা’র বাইরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ কিংবা ছোট বড় সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘তথ্য কর্মকর্তা’ পদে নিয়োগ দিয়ে থাকে। তাছাড়া, ব্যাংকসহ প্রায় প্রতিষ্ঠানেরই থাকে মুদ্রণ ও প্রকাশনা দপ্তর। সেখানেও সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীদের স্বল্প পরিসরে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।

গবেষক

সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অন্যান্য বিষয়ের মতো, সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীরাও গবেষক হিসেবে কাজ করতে পারে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। ‘গবেষণা সহকারি’, ‘গবেষণা সহযোগী’ ইত্যাদি পদে সরকারি, বেসরকারি, এনজিও ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে থাকে।

সংখ্যা, গুণগত ও আধেয় বিশ্লেষণ সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণার ইত্যাদি সকল প্রকার গবেষণা কাজে অভ্যস্ত থাকেন সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীরা। ফলে, এই ভালোও করছেন তারা।

ফটোগ্রাফি বা ভিডিওগ্রাফি

আর যদি ফটোগ্রাফি কিংবা ভিডিওগ্রাফির প্রতি কারো আগ্রহ থাকে। তাইলে তো কোন কথাই নেই।  উদ্ভাবনী এই শিল্পে গড়তে পারেন আপনার ক্যারিয়ার। এক্ষেত্রে, একাডেমিক কোর্সের পাশাপাশি সাংবাদিকতা শিক্ষার্থীদের দরকার শুধু একটু অনুশীলন।

সৃষ্টিশীল এই কাজে যদি নান্দনিক শিল্পদৃষ্টি ও সম্পাদনা দক্ষতা দেখানে পারেন, তাইলে পেশায় আপনার সফলতা নিশ্চিত। অবদান রাখতে পারেন, বাংলাদেশের ধ্বসে পড়া চলচ্চিত্র শিল্পে।

ফারজানা তাসনিম পিংকি শিক্ষকতা করছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে। সাংবাদিকতা শিক্ষার্থীদের পেশা বাছাইয়ের বিষয়ে তিনি জানান, “সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীরা একটি বিস্তৃত সিলেবাসে পড়াশোনা করে থাকে। তথ্য, যোগাযোগ ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা তাদের যে কোন পেশায় তাদের এগিয়ে রাখবে”। তিনি আরও বলেন, সাংবাদিকতায় পড়াশোনা করেছেন বলে, আপনাকে সাংবাদিকতায়ই আসতে হবে, এমন তো কোন কথা নেই।

এর বাইরে শিক্ষকতা, চলচ্চিত্র, লেখালেখি ইত্যাদি নানা উদ্ভাবনী বিষয়ে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ রয়েছে সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীদের।

তবে আপনি যেই পেশায়ই যেতে চান না কেন। শুরুটা কিন্তু করতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একেবারে প্রথম থেকে। বাংলা ও ইংরেজি ভাষা আত্মীকরণ, কম্পিউটার টাইপিং, দরকারি সফটওয়্যারগুলোর ব্যবহারিক কাজ জানা, ভালো পড়তে জানা কিংবা লিখতে পারা, আঞ্চলিকতা কাটিয়ে শুদ্ধ উচ্চারণ ইত্যাদি দক্ষতাগুলো অর্জন করতে পারেন বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকে। কারো যদি আগে থেকেই এ সমস্ত দক্ষতা থেকে থাকে, তাহলে তো ভাল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা শেষে এসব দক্ষতা অর্জন এবং কোন পেশায় যাবেন, এসব নিয়ে না ভাবাই বুদ্ধিমানের কাজ।