ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২০, ১৯ চৈত্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

এক মানবিক পুলিশের গল্প

মোস্তাকিম ভুঞা
প্রকাশিত: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ বৃহস্পতিবার, ০৩:০৭ পিএম
এক মানবিক পুলিশের গল্প

বারোটায় অফিস আসি, দু’টোয় টিফিন। তিনটেয় যদি দেখি সিগন্যাল গ্রীন। চটিটা গলিয়ে পায়ে নিপাট নির্দ্বিধায়, চেয়ারটা কোনো মতে ছাড়ি। কোনো কথা না বাড়িয়ে, ধীরে ধীরে পা বাড়িয়ে চারটেয় চলে আসি বাড়ি। আমি সরকারি কর্মচারী। আমি আমি সরকারি কর্মচারী। কি ভাবছেন, এগুলো আমার কথা। নাহ, কথাগুলো আমার নয়। এটা নচিকেতার একটি বিখ্যাত গান। সরকারি চাকরিজীবীদের নেতিবাচক দিকগুলো এভাবেই তুলে ধরেছিলেন বাংলা গানের এই শিল্পী।

সরকারি চাকরি! কারও কাছে ক্ষমতা। কারও কাছে সামাজিক মর্যাদা। কারও কাছে সুযোগ অথবা অজুহাত। প্রজাতন্ত্রের এই কর্মচারীদের নিয়ে এমন অভিযোগ নতুন কিছু নয়।

তাহলে কি সরকারি চাকরিজীবী মানেই এ রকম। নাকি এর ব্যতিক্রমও আছে। হা পাঠক, আমি বলছি আছে। এর ব্যতিক্রম মানুষ আছে। এবং সেই সংখ্যাটিও নিতান্ত কম নয়। যাদের কাছে সরকারি চাকরি মানে ক্ষমতার দাপট নয়, যাদের কাছে সরকারি চাকরি মানেই কর্তৃত্বের বড়াই নয়।

তাদের কাছে সরকারি চাকরি মানে হল পেশাগত দায়িত্ব। তাদের কাছে সরকারি চাকরি মানে হল জনসেবা। তাদের কাছে সরকারি চাকরি মানেই হল জনগণের বন্ধু, সেবক এবং প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী।

পেশাগত দায়িত্ব পালনে তাদের কোন অজুহাত নেই । ঠিক এমনই একজন মানুষকে নিয়ে আমাদের আজকের এই আয়োজন। নিভৃতে থেকে যারা দিন রাত কাজ করে যাচ্ছে মানুষের জন্য, প্রজাতন্ত্রের জন্য।

হা পাঠক, বলছি এক মানবিক পুলিশ কর্মকর্তার কথা। বলছি, ডেপুটি ইন্সপেক্টর অব পুলিশ (ডিআইজি) বনজ কুমার মজুমদারের গল্প। গল্পে গল্পে পুলিশের ঊর্ধ্বতন এই কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমাদের বাংলা ইনসাইডারের সহ-সম্পাদক মোস্তাকিম ভুঞা

মূল সাক্ষাৎকারের শুরুতে বাংলা ইনসাইডারের পক্ষ থেকে ঊর্ধ্বতন এই পুলিশ কর্মকর্তার পেশাগত জীবনের কিছু সাফল্য তুলে ধরা হলঃ

টুরিস্ট পুলিশ

২০০৬-০৭ সালের দিকে কক্সবাজার জেলা পুলিশে ছিলেন বনজ কুমার। দায়িত্ব পালন করছিলেন জেলা পুলিশ সুপার হিসেবে। আর তখন তিনি কক্সবাজার জেলা পুলিশের অধীনেই সীমিত পরিসরে চালু করেন টুরিস্ট পুলিশ। তখন টুরিস্ট পুলিশের ধারণা ছিল একেবারেই নতুন। বর্তমানে তা পুলিশের একটি বিভাগে পরিণত হয়েছে।

নথি সংরক্ষণ

বনজ কুমার মজুমদার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) যোগ দেন ২০১৬ সালে। যোগ দেওয়ার পর, পিবিআইতে আসা মামলার নথি সংরক্ষণের জন্য তৈরি করেন নতুন এক সফটওয়্যার। আর এতে করে সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটির নথি সংরক্ষণ কাজে আসে গতিশীলতা।

ফরেনসিক ল্যাব

প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বে আসার পর, তিনি পিবিআই’র জন্য একটি অত্যাধুনিক ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন করেন। এই ফরেনসিক ল্যাবকে আরও যুগোপযোগী করতে তিনি নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। আর এর মাধ্যমে তাদের করা প্রতিবেদনগুলো আদালতে হয়ে উঠছে গ্রহণযোগ্য। অত্যাধুনিক এই ল্যাব সুবিধা বর্তমানে পিবিআইসহ জেলা ও মেট্রোপলিটন পুলিশও সমানভাবে ব্যবহার করছে।

এনআইডির ডাটা

দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনে থাকা এনআইডির ডাটা ব্যাংকে প্রবেশের ক্ষেত্রে উদ্যোগ নেন তিনি। ফলে, অপরাধ কাজের সাথে জড়িত আসামি ও ভুক্তভোগী পরিচয় শনাক্তের কাজটি সহজ হয়ে উঠেছে। এতে করে, পিবিআই’র অন্যান্য ইউনিটগুলো তাৎক্ষণিকভাবে ডাটাবেজ থেকে তথ্য যাচাইয়ের সুবিধা গ্রহণ করতে পাচ্ছে।

ফিঙ্গার প্রিন্ট

তার অধীনে দেশের ‘ফিঙ্গার প্রিন্ট আইডেন্টিফিকেশন অ্যান্ড ভেরিফিকেশন সিস্টেম’ চালু করে পিবিআই। বর্তমানে পিবিআই’র সব ইউনিট এই পদ্ধতির সফল ব্যবহার করছে। এর ফলে, অজ্ঞাত মৃতদেহ শনাক্তকরণ কাজটি সহজ হয়ে গেছে।

উদ্ভাবনী ও সৃজনশীল কাজের পাশাপাশি মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকাণ্ড, রাজধানীর সগিরা মোর্শেদ হত্যা মামলা, কর্ণফুলিতে চার নারী গণধর্ষণের ঘটনা, চট্টগ্রামের সুদীপ্ত হত্যাকাণ্ড, ময়মনসিংহের মিতু হত্যা রহস্য ইত্যাদি ছাড়াও সম্প্রতি চিত্রনায়ক সালমান শাহের আত্মহত্যা তদন্তের সাফল্য দেখান বনজ কুমার মজুমদারের নেতৃত্ব দেওয়া পিবিআই। এবার আসা যাক, মূল সাক্ষাৎকারে

বাংলা ইনসাইডারঃ কেমন আছেন?

বনজ কুমারঃ ভালো আছি।

বাংলা ইনসাইডারঃ আপনার পড়াশোনা ও শিক্ষা জীবন সম্পর্কে জানতে চাই... 

বনজ কুমারঃ মাধ্যমিক পর্যন্ত আমি পড়াশোনা করেছি নিজ গ্রাম জুজখোলায়। এটি পিরোজপুর সদরে অবস্থিত। উচ্চ মাধ্যমিকের পড়াশোনা সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ, পিরোজপুর। উচ্চতর পড়াশোনা শেষ করেছি রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্সে।

বাংলা ইনসাইডারঃ আপনার পরিবার নিয়ে, আমাদের পাঠকদের যদি কিছু বলতেন...

বনজ কুমারঃ পারিবারিক জীবনে আমি দুই সন্তানের জনক। আমার বড় মেয়ে পড়াশোনা করছে কানাডার টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর ছোট মেয়ে পড়াশোনা করছে গ্রেড নাইনে। একটি ইংরেজি মাধ্যমে। আর, আমার স্ত্রী পেশায় একজন চিকিৎসক।

বাংলা ইনসাইডারঃ সরকারি এই চাকরি জীবনে পুলিশিং এর জন্য কোন কোন পদক পেয়েছেন?

বনজ কুমারঃ পুলিশিং এ পেশাগত কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনবার পুলিশ পদক পেয়েছি। ২০০৮ সালে কক্সবাজার জেলা পুলিশের পুলিশ সুপার ছিলাম। তখন গৃহকর্মীদের নিয়ে কাজ করার জন্য প্রথমবারের মতো ‘রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক’ (পিপিএম) পেয়েছি। আর ২০১৯ ও ২০২০ সালে দুই বার পেয়েছি ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক’ (বিপিএম)।

বাংলা ইনসাইডারঃ আপনার কোন প্রশিক্ষণের বিষয়ে যদি কিছু বলতেন..

বনজ কুমারঃ এখন তো, পুলিশের প্রশিক্ষণ হয় রাজশাহীর সারদায়। বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমীতে। আমি ১২তম বিসিএসে যোগ দিয়েছিলাম। তখন আমাদের ব্যাচই প্রথমবারের মতো প্রশিক্ষণ নিয়েছিল ‘বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে’। তখন এটাকে বলা হত ‘ব্যাসিক মিলিটারি ট্রেনিং অব পুলিশ’। সেনাবাহিনীর ক্যাডেটদের সাথে ৬ মাস ঐ প্রশিক্ষণে ছিলাম। এরপর, মূল প্রশিক্ষণ শুরু করেছিলাম ‘বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমীতে’।

বাংলা ইনসাইডারঃ পুলিশ সম্পর্কে কোন অভিযোগটি আপনাকে কষ্ট দেয়?

বনজ কুমারঃ অকপটভাবে বললেন, পুলিশ সম্পর্কে তো মানুষের অভিযোগের শেষ নেই । দেখেন, পুলিশের কাছে সবাই খারাপ সময়ে আসে। ফলে, কোন কোন ভুক্তভোগী শোষণের শিকার হয়, বলে শোনা যায়। আবার উপকার বা সহায়তা পায় না এমনও কিন্তু নয়। মজার বিষয় হল, যারা কোন দিন আমাদের কাছে কোন সেবার জন্য আসেননি, তাদেরও এমন অভিযোগ করতে শোনা যায়। তবে, আমাদের আইজিপি স্যার এসব অভিযোগ বন্ধে অনড় অবস্থানে যাচ্ছেন।

বাংলা ইনসাইডারঃ অবসরে কি করেন?

বনজ কুমারঃ এমন প্রশ্ন শুনে একটা মুচকি হাসি দিলেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন এই কর্মকর্তা। বললেন, পুলিশের চাকরিতে খুব একটা অবসর মিলে না। যে টুকু অবসর পাই, বই পড়ি আর সিনেমা দেখি। তাছাড়া, অবসরে স্ত্রীর সাথে মেডিকেল টার্ম নিয়ে আলোচনা করি।

বাংলা ইনসাইডারঃ পুলিশ না হলে কোন পেশায় যেতেন?

বনজ কুমারঃ হেসে বললেন, প্রকৌশলী হতাম। এর বাইরে আমি আর কি হতে পারতাম। পুলিশে আসার আগেও তাই ছিলাম। প্রথমে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেছি বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদে (বিসিএসআইআর)। পরে কাজ করেছি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) তে।

বাংলা ইনসাইডারঃ আপনাকে ধন্যবাদ।

বনজ কুমারঃ আপনাকে, সেইসাথে বাংলা ইনসাইডারকেও ধন্যবাদ।