ঢাকা, সোমবার, ১৪ জুন ২০২১, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

রাত সাড়ে দশটায় তোফায়েল আহমেদ

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯ জুলাই ২০১৭ রবিবার, ০৯:৫৭ পিএম
রাত সাড়ে দশটায় তোফায়েল আহমেদ

১৪ আগস্ট ১৯৭৫। গণভবনে দুজন কর্মকর্তার বিদায় অনুষ্ঠান। পিএইচডি করতে বিদেশ যাচ্ছেন ড. মনোয়ার এবং ড. ফরাসউদ্দিন আহমেদ। নৈশভোজের মধ্যে দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হলো। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর বিশেষ সহকারী তোফায়েল আহমেদকে একান্তে ডেকে নিলেন। বললেন, ‘কাল সকাল সকাল বাসায় চলে আসবি। তোকে নিয়ে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাব।’ বঙ্গবন্ধুকে সালাম করে বিদায় নিলেন তোফায়েল আহমেদ। তখন ঘড়ির কাটায় রাত সাড়ে ১০টা। এটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর শেষ সাক্ষাৎ। ৪২ বছর কেটে গেছে, এখনো তোফায়েল আহমেদ, ওই মুহূর্তটা ভুলতে পারেননি। এখনো প্রতি রাতে সাড়ে ১০টায় বঙ্গবন্ধু যেন তাঁর সামনে চলে আসেন। রাত সাড়ে ১০টায় তোফায়েল আহমেদ ফিরে যান ১৯৭৫-এ। হয়তো কয়েক মুহূর্তের জন্য।

তোফায়েল আহমেদ, বঙ্গবন্ধুর শেষ শিষ্য যিনি আওয়ামী লীগের পতাকা ধরে আছেন। বঙ্গবন্ধু ছাত্রনেতাদের ভীষণ পছন্দ করতেন। সিরাজুল আলম খান, আ স ম আবদুর রব, শেখ ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক আর তোফায়েল আহমেদ। বঙ্গবন্ধুর পঞ্চপাণ্ডব। এদের মধ্যে প্রথম দুজন বিশ্বাস ভঙ্গ করেছেন বঙ্গবন্ধু জীবদ্দশাতেই। শেখ মনি শহীদ হয়েছেন, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গেই। আবদুর রাজ্জাক মারা গেছেন। হারাধনের শেষ সন্তানের মতো তোফায়েল আহমেদ এখনো আওয়ামী লীগের কাণ্ডারী। মন্ত্রী, এমপি এসব পরিচয় ছাপিয়ে তিনি ‘আওয়ামী লীগের তোফায়েল’ এই পরিচয়ে পরিচিত হতেই ভালোবাসেন।

দলের সভাপতির সঙ্গে সখ্য নেই তাঁর খুব একটা। দুজনের মাঝে অবিশ্বাসের দেয়াল। কিন্তু তোফায়েল আহমেদ আর আওয়ামী লীগ এমন ভাবে মাখামাখি করে মিশে আছে-দুটোকে আলাদা করার উপায় নেই।

তাঁর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগের তীর ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট নিয়ে। বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে স্নেহভাজন, বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে আপন। অথচ বঙ্গবন্ধুর কঠিন সংকটে কিছুই করতে পারেননি। তাঁর বাসায় থাকা নিরাপত্তা রক্ষীরাই তাঁকে গৃহবন্দী করে রাখেন। নিন্দুকেরা মনে করে, তোফায়েল আহমেদ রক্ষী বাহিনীকে নির্দেশ দিতে পারতেন। কিংবা কর্নেল জামিলের মতো আত্মত্যাগ করতে পারতেন। কিন্তু ৩৩ মাসের দু:সহ কারাবরণ আর ক্যুদেতাদের নির্মম অত্যাচার যে মৃত্যুর থেকেও ভয়ংকর এটা কেউ ভেবেছে কখনো?

আওয়ামী লীগের সবাই জানে শেখ হাসিনার আস্থাভাজন নন তিনি। কেন? এই কেন’র কোনো উত্তর নেই। দুজনের কেউই এ নিয়ে কখনো কথাও বলেননি। তবে এটা যে অধিকারের এক আবেগময় দ্বন্দ্ব তা বলাই যায়। তোফায়েল আহমেদ সব সময় মনে করেন বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে স্নেহভাজন তিনি, আত্মার আত্মীয়। আর শেখ হাসিনা হলেন বঙ্গবন্ধুর রক্ত। এটা কি কোনো মনস্তাত্বিক দ্বৈরথ? একমাত্র আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে বাকশালের বিভাজন ছাড়া আওয়ামী লীগের প্রতিটি বিভক্তি, মতদ্বৈততায় তোফায়েল আহমেদের নাম এসেছে। ডাক এসেছে দল বদলের, প্রলোভন এসেছে মন্ত্রীত্বের। জিয়া তাঁকে প্রলোভন দেখিয়েছিল, এরশাদ নিমন্ত্রণ জানিয়েছিল আর ড. কামাল তো তাঁকে নিয়ে নতুন দলের স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর রক্তের সাথে বেইমানি করতে চাননি। দলে অপাক্তেয় হয়েছেন। কখনো কখনো অবমূল্যায়নের শিকার হয়েছেন, কখনো হয়েছেন অসম্মানিত। কিন্ত ‘আওয়ামী লীগের তোফায়েল’ কখনো আওয়ামী লীগের বাইরে থাকার কথা স্বপ্নেও ভাবেন নি। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের মতো অলংকারিক পদও তাই হাসিমুখে বরণ করে নিয়েছেন। কিন্তু তাঁর মনের কোনায় কি মেঘের মতো একটু অভিমান জমে নেই? হয়তো আছে। হয়তো তার প্রকাশও আছে। দলের সভাপতির সঙ্গে তাঁর দূরত্বও আছে। কিন্তু এসব কোনো কিছুই তোফায়েল আহমেদকে আওয়ামী লীগ থেকে আলাদা করতে পারে না। তোফায়েল আহমেদ আওয়ামী লীগের এক অনিবার্য অংশ। এক সময় অনেক কিছু হতে চাইতেন। দলের সাধারণ সম্পাদক হবার জনপ্রিয় প্রতিদ্বন্দ্বিও ছিলেন। কিন্তু এখন সাঁঝের বেলা আর এসব নিয়ে ভাবেন না। তেতুলিয়া নদীর কোল ঘেঁষে ভোলার এক প্রত্যন্ত জনপদ থেকে আসা মানুষটিকে বাংলাদেশের মানুষ এক নামে চেনে, ‘আওয়ামী লীগের তোফায়েল।’ এটাই সম্ভবত তার বড় প্রাপ্তি। আওয়ামী লীগের মধ্যেই তোফায়েল বঙ্গবন্ধুকে খুঁজে পান। সে কারণেই রাত সাড়ে দশটায় একবারও কি আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেন ‘বঙ্গবন্ধু তুমি কেমন আছ?’


বাংলা ইনসাইডার


বিষয়: আওয়ামী-লীগ